জামাল নজরুল ইসলাম: বাংলাদেশের উজ্জ্বল বিজ্ঞানী

সমাজ Contributor
জামাল নজরুল ইসলাম বিজ্ঞানী
ID 138534565 © Pop Nukoonrat | Dreamstime.com

জামাল নজরুল ইসলাম, মৌলিক বিজ্ঞানে বাংলাদেশীদের ভেতরে তার অবদান সবচেয়ে বেশি। তাইতো বিশ্ব বিজ্ঞানের তাঁর সমাদর ও খ্যাতির কোন কমতি ছিল না। উনার সম্পর্কে এ কথাও প্রচলিত আছে যে, তিনি স্টিফেন হকিং এর চেয়েও মেধাবী ও বড় মাপের বিজ্ঞানী ছিলেন। ১৯৩৯ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ শহরে জামাল নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন।

জামাল নজরুল ইসলামের শিক্ষাজীবন

তার বাবা তখন সে শহরের মুন্সেফ (বর্তমানে সহকারী জজের সমতুল্য) ছিলেন। তার বাবা কলকাতায় বদলি হন যখন তার বয়স মাত্র এক বছর। কলকাতার মডেল স্কুলে তিনি ভর্তি হন। এর পর চট্টগ্রামে চলে আসেন এবং এখানে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য পরীক্ষা দেন। অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমের ফলাফলস্বরূপ তিনি ভর্তি পরীক্ষায় বিশেষ কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এই জন্য তাকে ডবল প্রমোশন দিয়ে সরাসরি ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করে নেয়া হয়। অবশ্য এই স্কুলে তিনি নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছিলেন। এই স্কুলে পড়ার সময় গণিতের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।

সিলেবাসের বাইরে আরো অনেক অতিরিক্ত জ্যামিতি সমাধান করতেন তিনি। তার পরিবার পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যায় যখন তিনি নবম শ্রেণীতে ওঠেন। পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে লরেন্স কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকেই তিনি সিনিয়র ক্যামব্রিজ ও হায়ার সিনিয়র ক্যামব্রিজ পাশ করে ( সে সময় সিনিয়র কেমব্রিজ বলতে বর্তমানের ও-লেভেল এবং হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজ বলতে বর্তমানের এ-লেভেল বোঝাতো)। হায়ার সিনিয়র ক্যামব্রিজে তিনি একাই গণিত পড়ছিলেন। কারণ এটা উচ্চ পর্যায়ের গণিত হওয়াতে সবাই দিতে চাইতো না। এই গণিত পড়াশোনার সময় তিনি গণিতের প্রতি আরও দুর্বল হয়ে পড়েন। লরেন্স কলেজ শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়তে যান। এখান থেকেই তিনি বিএসসি অনার্স করেন। বিএসসি শেষে ১৯৫৭ সালে ইসলাম কেমব্রিজে পড়তে যান। কেমব্রিজের প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান থেকে আবারও স্নাতক ডিগ্রি (১৯৫৯) অর্জন করেন। তারপর এখান থেকেই মাস্টার্স (১৯৬০) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পিএইচডি।

জামাল নজরুল ইসলামের কর্মজীবন

১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ডে ডক্টরাল-উত্তর ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন জামাল নজরুল ইসলাম। ইসলাম, কেমব্রিজের ইনস্টিটিউট অফ থিওরেটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমিতে (বর্তমানে ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোনমি) কাজ করেন ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। ১৯৭১ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে ভিজিটিং সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনের কিংস কলেজে ফলিত গণিতের প্রভাষক ছিলেন।

১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি কলেজ, কার্ডিফ (বর্তমানে কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়) এর সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিলে ফেলো ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটিতে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরে রিডার পদে উন্নীত হন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটনে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিতে ১৯৬৮, ১৯৭৩ ও ১৯৮৪ সালে ভিজিটিং সদস্য হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৪ সালে ইসলাম বাংলাদেশে ফিরে এসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পদার্থবিদ্যা বিভাগে অধ্যাপক কোটা খালি না থাকায় তিনি গণিত বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং গড়ে তোলেন উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণাগার আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান গাণিতিক ও ভৌতবিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র বা রিসার্স সেন্টার ফর ম্যাথম্যাটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্স (আরসিএমপিএস)।

দেশের প্রতি তাঁর ভালবাসা

ব্যক্তিগত জীবনে মেধাবী এই মানুষটির ছোটবেলা থেকেই ক্যালকুলেটর ব্যবহারে ছিল অনীহা। তিনি গণিতের হিসাব গুলো নিজে নিজেই করতে পছন্দ করতেন।

আর এসব কারণেই সম্ভবত তার কম্পিউটার ব্যবহার করতেও খুব একটা ভালো লাগতো না।

দেশকে ভালোবাসতেন প্রচন্ডভাবে। সামাজিক উন্নতি, দারিদ্র্য দূরীকরণ নিয়ে তিনি ভাবতেন। নিজেরই কিছু অর্থ জমিয়ে দরিদ্র ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। এমনকি ১৯৭১ সালে তৎকালীন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি একটি চিঠি লেখেন।

যার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ বন্ধ করা।

তিনি দেশকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৮৪ সালে প্রফেসর ইসলাম তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন।

পশ্চিমের উন্নত দেশে ৩০ বছরের অভ্যস্ত জীবন, সম্মানজনক পদ, গবেষণার অনুকূল পরিবেশ, বিশ্বমানের গুণীজন সাহচর্য এবং আর্থিকভাবে লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে দেশে এলেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে যোগ দিলেন মাসিক তিন হাজার টাকা বেতনে।

শিক্ষক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল দেশে ফেরার আগে তার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি তাকে দেশে ফেরার ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করেছিলেন।

তাঁর লিখিত রচনাবলি

● দি আল্টিমেট ফেইট অফ দি ইউনিভার্স (১৯৮৩) – কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়।

প্রকাশের পর বিজ্ঞানীমহলে বিশেষ সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়। জাপানি, ফরাসি, পর্তুগিজ ও যুগোস্লাভ ভাষায় অনূদিত হয়।

● ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৪) – ডব্লিউ বি বনোর এর সাথে যৌথভাবে সম্পাদনা করেন।

● রোটেটিং ফিল্ড্‌স ইন জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৫) – কেমব্রিজ থেকে প্রকাশিত।

● অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি (১৯৯২)

● কৃষ্ণ বিবর – বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত।

● মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ – রাহাত-সিরাজ প্রকাশনা

● শিল্প সাহিত্য ও সমাজ – রাহাত-সিরাজ প্রকাশনা

● স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ – কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস। স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত

● দ্য ফার ফিউচার অফ দি ইউনিভার্স – এনডেভারে প্রকাশিত।

পুরস্কার ও সম্মাননা

বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী ১৯৮৫ সালে তাকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। ১৯৯৪ সালে তিনি ন্যাশনাল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি মেডেল পান।

১৯৯৮ সালে ইতালির আবদুস সালাম সেন্টার ফর থিওরিটিকাল ফিজিক্সে থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমি অফ সায়েন্স অনুষ্ঠানে তাকে মোডাল লেকচার পদক দেয়া হয়।

তিনি ২০০০ সালে কাজী মাহবুবুল্লাহ এন্ড জেবুন্নেছা পদক পান।

২০০০ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন।

পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ২০১১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর রাজ্জাক-শামসুন আজীবন সম্মাননা পদক লাভ করেন।

তিনি ২০১৩ সালের ১৬ই মার্চ মধ্যরাতে ৭৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.