জিনের রহস্যভেদী তুরস্কের বিজ্ঞানী আজিজ সানজার

ID 21602222 © Martinmark | Dreamstime.com
ID 21602222 © Martinmark | Dreamstime.com

জীবনে এমন কিছু সময় আসে যেখানে একটা সিদ্ধান্ত বদলে দেয় অনেক কিছু। ষাটের দশকে তুরস্কের মারদিন জেলার সাভুর অঞ্চলে এরকমই এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এক কিশোর যা পরবর্তী দশক গুলিতে পাল্টে দেয় আণবিক জৈবরসায়ন ডিএনএর ইতিহাস। আজিজ সানজার তখন এক কিশোর ছিল যে ভবিষ্যতে ফুটবলার হতে চেয়েছিল। ছোটো থেকেই ফুটবল খেলতে চাওয়া ছেলে কেন যে হঠাৎই ইস্তানবুলে ডাক্তারী পড়তে চলে গেল তা পরিবারের লোকেও বুঝতে পারেনি।

এরপর ১৯৬৯ সালে সানজার প্রথম বিভাগে পাশ করে ডাক্তার হয়ে বেরোলেন। প্রথমে জন্মস্থান সাভুরেই একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে কাটালেন দুবছর। তারপরেই এলো প্রথম বড় সুযোগ, টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় এবং জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক এলো, তিনি ন্যানো টুবিটাক স্কলারশিপ পেয়েছেন। 

ডালাসে থাকাকালীন তাঁর গাইড ছিলেন ক্লড রুপার্ট, সেখানেই প্রথমবার জিনের জটিল রহস্যভেদের গবেষণা শুরু করলেন। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংএর মাধ্যমে আঘাতপ্রাপ্ত ডিএনএকে পুনরায় ঠিক করতে সমর্থ হলেন সানজার। এই আবিষ্কার তাঁকে এনে দিন পোস্টগ্র্যাজুয়েট এবং ডক্টরেট ডিগ্রী, আজিজ সানজার হলেন ডঃ আজিজ সানজার। 

এরপরের ইতিহাস শুধুই উন্নতির। তুরস্কের অজানা কোনো এক প্রদেশের ছেলে চষে বেড়াতে লাগলেন আমেরিকার নাম করা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে, বক্তৃতা দিলেন

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের সম্মেলনে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডঃ আজিজ সানজার হয়ে উঠলেন একটি অতিপরিচিত নাম। 

টেক্সাস থেকে পরবর্তী যাত্রা হয় ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানে কাজ শুরু করলেন নিউক্লিওটাইড নিয়ে এবং ডিএনএ মেরামতি নিয়ে তাঁর কাজ আকাশছোঁয়া খ্যাতি

পেতে শুরু করল সেই সময় থেকে। এরপর তিনি কার্যক্ষেত্রকে আর একটু প্রসারিত করে জৈবরসায়ন এবং জীবপদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

ডঃ সানজারের গবেষণা এবং বিজ্ঞান জগতে তাঁর অবদান এককথায় অনবদ্য। ছোটো করে বললে দাঁড়ায়, মানবদেহে ক্রমাগত ঘটে চলা কোষেদের কার্যপ্রণালী, বয়ঃবৃদ্ধি এবং ক্যানসারের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা নিয়েই তিনি মূলত কাজ করেছেন। সানজার নিউক্লিওটাইডকে কাজে লাগিয়ে এনজাইমের সাহায্য আঘাতপ্রাপ্ত স্থানকে বিচ্ছিন্ন করে তার মেরামতির পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এই পদ্ধতির নাম দিয়েছেননিউক্লিওটাইড এক্সিসন রিপেয়ার।

৭৩ বছর বয়সি এই বিজ্ঞানী সারাটা জীবনই বিজ্ঞানের নামে উৎসর্গ করেছেন, পুরষ্কারও পেয়েছেন যথাযথ। ২০১৫ সাল, ডাক এল স্টকহোম থেকে, তিনি রসায়নে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়ে থমাস লিনডাল পল মড্রিচের সাথে একটা তুরস্কের ছেলে মাথায় তুলে নিল বিজ্ঞানের সেরা শিরোপা। 

পশ্চিমের বিজ্ঞান জগতের গণ্যমান্য ব্যক্তি হয়ে ওঠার পূর্বের আজিজ সানজার মুখোমুখি হয়েছিলেন বহু সমস্যার। মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমি জীবনযাপনের ফারাক যে কতটা তা টেরপেয়েছিলেন প্রতি মুহূর্তে। তাই ভাবতে শুরু করলেন এমন কিছু করতে হবে যাতে পরের আজিজ সানজারগুলো যেন হারিয়ে না যায় পৃথিবীর ব্যস্ততম কোণায়। 

যেমন ভাবা তেমন কাজ, ২০০৭ তুরস্ক থেকে আসা ছেলেদের সুবিধার জন্য বানালেন টার্কিশ হাউস। নর্থ ক্যারোলিনায় বানানো এই প্রতিষ্ঠান কোনোরকম ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়, নিছকই একজন বিজ্ঞানী এবং তার শুভানুধ্যায়ীদের দানেই চলছে এটি। এখানে আমেরিকা সম্বন্ধে নবাগতদের অবগত করতে সব ব্যবস্থাই করেছেন তিনি, কম খরচে প্রাথমিক থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন আবার স্কলারশিপ এবং পরবর্তী উচ্চশিক্ষায় যাতে তাদের অসুবিধা না হয় সে খেয়ালও রাখছেন প্রফেসর ডঃ সানজার।