জীবনসঙ্গী বেছে নিতে পিতা-মাতার ও সন্তানের দ্বন্দ্ব

পরিবার ০১ জুলাই ২০২০ Contributor
জীবনসঙ্গী
Fotoğraf: Nick Karvounis-Unsplash

জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার সময় পিতামাতা ও সন্তানের দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

কেউ আমাকে বিবাহের বিষয়ে পিতামাতা এবং তাদের অল্প বয়স্ক পুত্র/কন্যার মধ্যে দ্বন্দ্বের মূল পরিস্থিতি তৈরি করতে বলে তবে আমি এটিকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করবঃ

(i) পুত্র বা কন্যা এমন কাউকে পছন্দ করে যাকে তার পিতামাতা পছন্দ করেন না এবং পিতামাতার পছন্দের মধ্যে তারা জীবনসঙ্গী বেছে নিতে রাজি না।

(ii) ধর্মীয় অনুশীলন বা দৃষ্টিভঙ্গি, গোত্র, বর্ণ ইত্যাদির ভিত্তিতে সন্তান ও তার পিতামাতার পছন্দ আলাদা।

(iii) পুত্র বা কন্যা আগে থেকেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ, এবং আবারও বিবাহ করতে তারা কোনোভাবেই রাজি হয় না।

এগুলি আমার ব্যক্তিগত জ্ঞান এবং জীবনের অভিজ্ঞতা অনুসারে মুসলিম পিতামাতাদের সাথে তাদের সন্তানদের সংঘাতের প্রধান পরিস্থিতি এই জীবনসঙ্গী বিষয়েই

জীবনসঙ্গী নির্বাচনে পিতামাতার প্রতি কি শর্তহীন বাধ্যতা আবশ্যক?

পরিবারের প্রবীণরা এবং ইসলামী স্কলাররা পরামর্শ দিয়ে থাকেন যে, সমস্ত বিষয়ে তাদের পিতামাতার আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক এবং আমি সত্যই সম্মত যে, পিতামাতার অবাধ্যতা ইসলামে একটি বড় গুনাহ। তবে সব পরিস্থিতিতে বিষয়টি এমন নয়। জীবনসঙ্গী বিষয়ে আলোচনার স্থান রয়েছে। 

বিবাহের মত দীর্ঘমেয়াদী সিদ্ধান্তটি অনেক আলাদা এবং এটিকে অন্যসব বাধ্যতার মত একই শ্রেণিভুক্ত করা যায় না।

সকল প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের জন্য আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য সর্বাগ্রে।

গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হল, ইসলামের বিধি অনুসারে, যেমন একজন পুত্র বা কন্যাকে তাদের পিতামাতার অবাধ্য হতে নিষেধ করা হয়েছে, তেমনিভাবে একজন মুসলিম পিতামাতাকেও অনুমতি দেওয়া হয়নি তাদের প্রাপ্তবয়স্ক পুত্র বা কন্যাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়েতে বাধ্য করতে, বা তাদের পরামর্শ নেওয়ার আগে বা প্রথমে তাদের সম্মতি না নিয়েই তাদের বিবাহ ঠিক করে ফেলতে।

অনেক পিতামাতাই আসলে এই নিষিদ্ধ কাজটি করেনঃ তারা নিজের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য (যেমন ব্যবসা, পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালীকরণ বা সামাজিকতা রক্ষা ইত্যাদি) রক্ষার্থে নির্দিষ্ট কোনো বয়সে এবং সময়ে তাদের পছন্দের কাউকে বিয়ে করার জন্য তাদের সন্তানকে জোর করতে থাকেন এবং এটি আমি বাস্তব জীবনে বিশেষত কন্যাদের ক্ষেত্রে বেশি প্রত্যক্ষ করেছি।

যখন পিতামাতা আল্লাহকে ভয় না করে সামাজিকতাকে ভয় করে এবং তাদের সন্তানদেরকে জোরপূর্বক তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিবাহ দেয় তখনই পরিবারে কলহ-বিবাদ ও অশান্তি শুরু হয় এবং এই সন্তানের বৈবাহিক জীবন নষ্ট হয়।

আমি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে এই কথাটি অনেকবার বলেছি – পিতামাতাদের উচিত শৈশবকাল থেকেই তাদের সন্তানদের তরবীয়তের দিকে পূর্ণরূপে খেয়াল রাখা। আপনি হয়ত এটা মনে করছেন যে, আপনার সন্তানকে ছোটকাল থেকে তাদের মনমত চলতে দিবেন, সহশিক্ষা ব্যবস্থায় তাদেরকে লালিতপালিত করবেন আর বিয়ের সময় হলে সে মাথানত করে আপনার পছন্দকে মেনে নিবে।

না জনাব। বিষয়টি কখনও এমন হবে না।

বাস্তবে, আপনি যেমন বপন করেন তেমনই ফসল কাটবেন।

পিতামাতা এবং সন্তানঃ জীবনসঙ্গী বিষয়ে কার তাকওয়া বেশি?

আমি সত্যই সেই পুত্র বা কন্যার প্রতি বেদনা অনুভব করি যার পিতামাতা তাকে এমন কারও সাথে বিয়ে দিতে চান যার প্রতি সে কোনো ঝোঁক অনুভব করে না। আমি এ জাতীয় ছেলে বা মেয়েকে পরামর্শ দিয়ে বলতে পারি যে, তারা ইস্তেখারার নামাজ আদায় করতে পারে এবং এরপর যেদিকে তার ঝোঁক অনুভূত হয় সেদিকেই তার যাওয়া উচিত, যদিও এতে তার পিতামাতা কষ্ট পায়।

তবে একই সঙ্গে, আমি সেই দুঃখিত পিতামাতার প্রতিও বেদনা ও উদ্বেগ অনুভব করি, যারা তাদের সন্তানদেরকে সুখী হিসেবে দেখতে চান তবে এটিও মনে করেন যে, সন্তানকে নিজের পছন্দমত বিবাহ করতে দিলে তারা হয়ত বৃদ্ধবয়সে তাঁদেরকে ঠিকমত দেখাশোনা করতে পারবে না।

এ ধরনের উভমুখী পরিস্থিতিতে আমি সত্যই দ্বিধার মধ্যে পড়ে যায় যে, এই দ্বন্দের মধ্যে কে আসলে সঠিক পথে আছে।

আমার সেরা পরামর্শটি নিম্নে সংক্ষিপ্ত আকারে দেওয়া হলঃ

পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে যে অধিক ধার্মিক, আল্লাহভীরু, ইসলামী শিক্ষায় জ্ঞানবান, এবং ব্যবহারিক জীবনে ইসলামিক বাধ্যবাধকতাগুলির অনুগত এই জটিল পরিস্থিতিতে তার মতামতই প্রাধান্য পাবে।

যারা হারাম রিলেশনে জড়িয়ে আছে তাদের এটা মনে রাখতে হবে যে, তারা যেমন পিতামাতাকে অসন্তুষ্ট করছে তেমনি তারা আল্লাহকেও অসন্তুষ্ট করছে। তাই সাংসারিক জীবনে তাদের বরকত না হওয়াটাই স্বাভাবিক।

অপরদিকে সন্তান যদি ধার্মিক, আল্লাহভীরু, ইসলামী শিক্ষায় জ্ঞানবান, এবং ব্যবহারিক জীবনে ইসলামিক বাধ্যবাধকতাগুলির অনুগত হয় তবে পিতামাতার উচিত সন্তানের মতকে প্রাধান্য দেওয়া এবং তার পছন্দেই তার জীবনসঙ্গিনী বাছাই করতে দেওয়া। কারণ এ অবস্থায় পিতামাতার বোঝা উচিত, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং বরকত তাদের সন্তানের পছন্দের দিকে থাকাটাই স্বাভাবিক।