জীবনে অত্যন্ত সফল এবং সৎ ব্যবসায়ী ছিলেন নবীজি (সাঃ)

© Yusuframzad | Dreamstime.com

আরবে ওই সময় আবহাওয়া এতটাই রুক্ষ ও বৈরী ছিল যে, কোন কিশোরকে সেসময় বাণিজ্য যাত্রায় সাথে নেয়া হতো না। কিন্তু নবীজি যেহেতু স্বাবলম্বী হওয়ার অদম্য আগ্রহের ছিলেন তাই তিনি চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়ার পথে বাণিজ্য মেলায় অংশ নিলেন। তিনি এই বাণিজ্য কাফেলা অংশ অংশগ্রহণ নিলেন তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২। পথে বুসরার কাছে খ্রিষ্টান দরবেশ বাহিরা এই বাণিজ্য কাফেলার সবাইকে আমন্ত্রণ জানালেন তার আস্তানায়। নবীজিকে পশুপালনের দেখভালের দায়িত্ব দিনে সবাই আমন্ত্রণে সাড়া দিতে গেলেন। বাহিরা তখন জিজ্ঞেস করলেন , কাফেলার আরেকজন কোথায়? তারপর নবীজিকে তার সামনে উপস্থিত করা হলো । নবীজিকে দেখেই তিনি তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে শনাক্ত করলেন। বাহিরা আবু তালেবকে বললেন, অনেক বড় ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে এই বালকের জন্যে। আমাদের কিতাবে বর্ণিত কিছু লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি তার মধ্যে। তিনি তাকে এও বললেন যে, আপনি একে নিয়ে সিরিয়া যাবেন না। কারণ ওই  খানে অবস্থিত রোমান ও ইহুদিরা যদি তাকে শনাক্ত করতে পারে, তবে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, তারা তার ক্ষতি করবে। আবু তালিব এ কথা শোনার পরে তিনি নবীজিকে একজন দাসের সাথে মক্কায় ফেরত পাঠালেন। নবীজির নিরাপত্তার ব্যাপারে, সুরক্ষার ব্যাপারে তিনি তার জীবনের সব সময় আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।

নবীজি যখন ২০ বছরের তরুণ তখন থেকেই তিনি চাচা আবু তালিবের ব্যবসায়ীক ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠলেন। নবীজির শেখার আগ্রহ, মনোযোগ তোমার কারণে তিনি তার চাচার প্রিয়ভাজন হয়ে উঠলেন। তার চাচার দেখলেন, নবীজির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা প্রবল। এবং এই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এতই প্রবল যে যে কোন কিছু তিনি দ্রুত শিখে নিতে পারেন। চাচার বলার আগেই তিনি বুঝে নিতেন চাচার কি প্রয়োজন। নবীজি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ব্যবহারের বিভিন্ন দিক গুলো খুব স্বাচ্ছন্দে সাথে আয়ত্ত করতে থাকলেন। কোন পণ্যের চাহিদা বেশি, পণ্যের গুরুত্ব, ওজন, মান, মূল্য, এর থেকে মুনাফার ধরন, ক্রেতা বিক্রেতার পছন্দ-অপছন্দ, পরিবহণ ব্যবস্থা, যাত্রাপথের সুযোগ ও বাধা সম্পর্কে তিনি গভীর জ্ঞান অর্জন করলেন।

ওই সময় সুগন্ধি আতর ও আগুন ছিল বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে লাভজনক। যা সহজে বহনযোগ্য করা যেত । সংগৃহীত হতো ইয়েমেনের পার্বত্য এলাকা, সোমালিয়া ও আবিসিনিয়ার (বর্তমান ইতিওপিয়া-ইরিত্রিয়া) দুর্গম পাহাড় থেকে। এর ক্রেতা ছিল অভিজাতরা। বাইজেন্টাইন ও পারস্য সাম্রাজ্যের অভিজাত ও ধর্মীয় মহলে এর কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই সময়কার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত তখনকার এই বিশাল বাণিজ্য। কুরাইশদের নিয়ন্ত্রণে তখন মিশর, প্যালেস্টাইন, সিরিয়া, ইরাক-ইয়েমেন জুড়ে পুরো আন্তঃবাণিজ্যই ছিল। আর এই সুদূর এলাকায়ও ছিল মক্কার অভিজাতদের বাগানবাড়ি, ফলবাগান, কৃষিখামার। যুবক মুহাম্মদ তার সততা, বুদ্ধিমত্তা, বিনয় ও আমানতদারির কারণে মক্কার অভিজাত ব্যবসায়ী মহলের আস্থাভাজন হয়ে উঠলেন।

আমরা যদি নবীজির পরবর্তী জীবনের দিকে তাকাই তাহলে আমরা দেখতে পাই তিনি তার জীবনে অত্যন্ত সফল এবং সৎ ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি ব্যাপক পরিসরে ব্যবসা করেছেন। এবং তার এই সততার শহীদ ব্যবসার ঘটনাগুলি আমাদের জন্য অনুসরণীয় হয়ে রয়েছে। তাছাড়া কুরআন ও হাদীসে ব্যবসায়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এই বিষয়ে একটি হাদিস হচ্ছে, ‘সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সত্যবাদী ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯)

নবীজি তার ব্যবসায়িক বৈশিষ্ট্যের জন্য অনুকরণীয় হয়ে রয়েছেন। তার ব্যবসায়িক সততা ছিল সব সময়। তিনি পণ্য কেনার সময় ন্যায্য মূল্য প্রদান করতেন। আর বিক্রি করার সময় ভালো পণ্য প্রদান করতেন। সময় মত অর্থ পরিশোধ করতে। তিনি নিজের জন্য আলাদা গোপন বখরা রাখতেন না, যখন তিনি অন্যের ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তার কাছে যদি কেউ অর্থ বা কোন পণ্য দ্রব্য গচ্ছিত রাখতেন তবে তিনি তা যথাযথভাবে ফিরিয়ে দিতেন। সবার প্রতি তাঁর ছিল আন্তরিক সমমর্মিতা। তাই ব্যবসায় লাভের প্রায় পুরোটাই তিনি অভাবীদের মাঝে বিতরণ করে দিতেন। এটাই ছিল ব্যবসায়ী মুহাম্মদ এর বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ আমাদেরকে নবীজির জীবন দৃষ্টান্ত অনুসারে ব্যবসা করার তৌফিক দিক।