জীবনে পজিটিভ থাকুন ১০ অব্যর্থ উপায়ে

মানসিক স্বাস্থ্য ০৮ মার্চ ২০২১ Contributor
মতামত
জীবনে পজিটিভ
Photo by Bekka Mongeau from Pexels

জীবনে পজিটিভ হওয়ার মানে কী? লকডাউনের মধ্যেই চাকরি চলে গিয়েছিল সফিনের। এরপরেই ডিপ্রেশনে চলে যেতে শুরু করে ও। মনখারাপ, কোনও কিছু না করতে পারার যন্ত্রণা এবং বাস্তব ও আশা-আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ফারাক সফিনকে ডুবিয়ে দিচ্ছিল হতাশায়। রোজ সকালে উঠে কোনও কাজেই উদ্যম পেত না সে, সারাদিন শুয়ে থাকত। এমনকী, নতুন কাজ খোঁজার চেষ্টাটুকুতেও যেন মন সায় দিত না। তার উপরে আত্মীয়স্বজনের নানারকম কথা এবং পারিপার্শ্বিক চাপ তো রয়েছেই! ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে শেষে জোর করে ইতিবাচক থাকার অভ্যেস করতে শুরু করে।

মাসখানেকের থেরাপির পর সফিন নিজেকে আবিষ্কার করে সম্পূর্ণ অন্যভাবে! সে বুঝতে পারে, জীবনে হাজার ঝামেলা আসলেও আসলে সবকিছুকেই নিতে হবে পজিটিভভাবে। আর তাহলেই জীবনে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা যাবে! কিন্তু কী এই পজিটিভিটি? হতাশা, নেগেটিভিটি কাটিয়ে কীভাবেই বা নিজের মনকে সারাক্ষণ পজিটিভ রাখবেন? সে কথা বুঝতে পারেন না অনেকেই।

কীভাবে থাকবেন পজিটিভ?

সফিনের মতো মনখারাপ, স্ট্রেস, ব্যর্থতা, হতাশায় ভুগি কমবেশি আমরা অনেকেই। তারই মধ্যে কেউ সাহস করে সে কথা বলতে পারি, আবার কেউ বা পারি না! আসলে পরিস্থিতি যাই আসুক না কেন, আমাদের জীবনকে কিন্তু চালনা করি আমরা নিজেরাই। আর এই চালনা করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আমাদের ভাবনা। আমরা কোন পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করব, সেক্ষেত্রে এই ভাবনার অবদান অপরিসীম। নিজের ভাবনাচিন্তাগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে শেখার ক্ষমতাই আদতে আমাদের আমরা যা হতে চাই, তাই বানিয়ে তোলে।

এটি কিন্তু একদিকে যেমন জোরের জায়গা, তেমনই আর একদিকে ভয়েরও! একথা সকলেই জানেন যে, আমাদের ভাবনাগুলির পিছনে আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, সংস্কৃতির অবদান অনস্বীকার্য। এই পরিস্থিতি বা সংস্কৃতি যদি ক্রমাগত আমাদের পিছনে নিয়ে যেতে থাকে, তা যদি বিষাক্ত হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে আমাদের ভাবনার উপরও তার প্রভাব পড়ে। এটি যাতে না হয়, তার জন্য আমাদের সর্বদা খারাপ চিন্তা দূরে সরিয়ে ভাল, ইতিবাচক কথা ভাবা জরুরি। কিন্তু এই ইতিবাচক থাকা বা সবসময় পজিটিভ চিন্তাভাবনা করা নেহাত সহজ কাজ নয়! এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘদিনের অভ্যেস। কীভাবে করবেন সেই অভ্যেস? আজ আমরা সেই নিয়ে আলোচনা করব।

১. নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসুন

পজিটিভ থাকার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে ভালবাসুন। মানুষ স্বভাবতই সারাক্ষণ অন্যদের থেকে ভ্যালিডেশন চায়। কেরিয়ারে দারুণ কিছু একটা করে ফেললেন বা দারুণ জাঁকজমক সহকারে শাদি করলেন, কিছু না কিছু কারণে সারাক্ষণই অন্যদের থেকে প্রশংসা পেতে আপনার ভাল লাগবে। আর এই প্রশংসা পাওয়ার লোভে আমরা বেশিরভাগ সময়েই অনেকেসময় নিজেকেও ছাপিয়ে যেতে চাই, আমরা যেটা না, সেটা হয়ে উঠতে চাই! এটি করবেন না। মনে রাখবেন, আপনার কোন কাজে অন্যে কে কী বলল, তাতে কিছু এসে যায় না। আপনার খুশি থাকাটাই আসল। তাই অন্যকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের মনের কথা শুনুন, নিজেকে ভালবাসুন। কারণ একমাত্র আপনি আর আল্লাহ ছাড়া আপনাকে ভাল আর কেউ চেনে না। আল্লাহ এবং নিজের উপর ভরসা রাখুন, তাহলেই দেখবেন পারিপার্শ্বিক নেগেটিভিটিকে আপনি দূরে সরিয়ে রাখতে পারছেন।

২. নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন

সমাজ প্রকৃতিগতভাবেই আমাদের তার নিজস্ব ছকে বেঁধে ফেলতে চায়। এই ছক হতে পারে আপনার জাতিগত বা সংস্কৃতিগত। আমরা অনেকেই এই ছকের বাইরে গিয়ে অনেককিছু করতে চাইলেও শেষমেশ করে উঠতে পারি না। কিন্তু এই নির্দিষ্ট ছকের বাইরেও বড় পৃথিবী পড়ে রয়েছে। তাই নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন আর নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে ছড়িয়ে দিন। গড়পড়তা চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে ভাবার চেষ্টা করুন। যা ভাল লাগে তাই করুন, নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে ঝুঁকি নিন। দেখবেন, তাহলে এমন অনেককিছু করতে পারছেন, যা আপনি আগে কোনওদিন করবেন বলে ভাবতেও পারেননি।

৩. আপনার অনুভূতি, কাজের জন্য কেবল আপনিই দায়ী

এমন অনেক পরিস্থিতিই আসে যে অন্যে কী ভাববে সেই ভেবে আপনি আপনার কাজ করেন। কিংবা অন্যের খারাপ লাগবে ভেবে নিজের খারাপ লাগাটা চেপে রাখেন। দেখুন, আপনি যাই করুন, আশপাশের সবাইকে খুশি রাখতে পারবেন না। ফলে অতিরিক্ত ভাবনা বন্ধ করুন। মনে রাখবেন, আপনার আবেগ, অনুভূতি বা আপনার কাজের জন্য আপনিই কেবল দায়ী থাকবেন, সেই দায় অন্য কারওর নয়। তাই সেই অনুযায়ী কাজ করুন। তবে কারওর মনে দুঃখ দেবেন না। অন্যের কথায় প্রভাবিত না হয়ে চলতে চেষ্টা করুন। তাহলেই দেখবেন ভাল থাকছেন।

৪. আপনার শরীর কিন্তু আপনারই!

এটা অনেকেই মনে রাখেন না! কোনও আত্মীয় বা বন্ধু তাই আমাদের মোটা বললে বা বডিশেমিং করলেই আমাদের মনখারাপ হয়ে যায়। আপনি কী খাচ্ছেন, কোন চেহারায় কী পরলে আপনাকে ভাল লাগবে, আপনার এই ব্যক্তিগত বিষয়গুলিতে এবার অন্যদের নাক গলানো বন্ধ করুন। নিজেকে, নিজের শরীরকে শ্রদ্ধা করুন। মনে রাখবেন, আপনি যেরকম, সেরকমই। অন্যদের কথায় তাই নিজেকে পালটে ফেলার বা মনখারাপ করে বসে থাকার কোনও মানে হয় না। নিজের পছন্দে বাঁচুন, নিজের ইচ্ছেমতো খান বা পোশাক পরুন। তবে আপনাকে যেমন কেউ বডিশেমিং করলে আপনার খারাপ লাগে, তেমনই অন্যকেও বডিশেমিং করাটা বন্ধ করুন।

৫. ক্ষমা করতে শিখুন

ক্ষমা পরম ধর্ম। আল্লাহ মহান, তিনি সবাইকে ক্ষমা করে দেন। আমাদের পবিত্র ধর্মানুযায়ী, এই মহান গুণটি আমাদের অনুকরণ করতে শেখানো হয়। যদিও যাদের থেকে আপনি কষ্ট পেয়েছেন, তাঁদের ক্ষমা করা অনেকসময়েই কঠিন হয়ে ওঠে, কিন্তু সত্যি-সত্যিই ক্ষমা করে দিতে পারলে মনে অনেক শান্তি পাওয়া যায়। সকলকে ভালবাসুন, সকলের সব দোষ ক্ষমা করুন, সেইসঙ্গে নিজেকেও ক্ষমা করুন। এটি মানসিকভাবে অনেক বেশি সাহস যোগাতে পারে।

৬. ভয়কে জয় করুন

আমরা ভয় পাই, তাই আমাদের জীবনে অর্ধেক কাজই করা হয়ে ওঠে না! কোনটা হলে কী হবে, আর সেটা না হলেই বা কী হবে, এই নিয়ে সারাক্ষণ ভয় পেতে-পেতে দেখা যায়, আমরা নিজের ইচ্ছেমতো বাঁচতেই ভুলে যাই। ঝুঁকি

নিতেও ভয় পাই। তাই ভয়কে জয় করুন। যে-বিষয়টি আপনি ভয় পান, সেটি অস্বীকার না করে মেনে নিন, তারপর পরবর্তী কাজ করুন। দেখবেন কাজে জোর পাচ্ছেন।

৭. কোন কাজটা করবেন?

অনেকেই কোন কাজটা কখন করবেন, তা বুঝে উঠতে পারেন না। সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। মনে রাখবেন, আপনি যখন যে কাজটাই করুন না কেন, সেটি কিন্তু মন দিয়ে করতে হবে, কারণ আপনার মূল্যবান সময় এবং এনার্জি, দু’টিই আপনি সেখানে ব্যয় করছেন। এই সহজ কথাটি বুঝে ফেললে কিন্তু কোন কাজে মন দেবেন, এই সিদ্ধান্ত নিতে আর দেরি হওয়ার কথা নয়! ফলে সেটি আগে বুঝুন। গুরুত্ব অনুযায়ী কাজ স্থির করুন, তারপর তাতে মন দিন।

৮. নিজে যা, তাতেই খুশি থাকুন

নিজেকে নিয়ে খুশি না থাকলে কিন্তু মুশকিল। অনেকেরই অনেক ইচ্ছে পূরণ হয় না, তাই নিয়ে তাঁরা সারাক্ষণ আল্লাহর কাছে নালিশ জানাতে থাকেন। এটা একেবারেই করবেন না। নিজেকে ভালবাসুন, নিজেকে নিয়ে খুশি থাকুন। মনে জানবেন, আপনি যা পেয়েছেন, সেটুকুও অনেকে পান না। তাই কৃতজ্ঞ থাকুন। ইসলামিক ঐতিহ্য সর্বদাই আমাদের কৃতজ্ঞ থাকার শিক্ষা দেয়। কারণ, “…যে কৃতজ্ঞ, সে তার নিজের লাভের জন্যই তা করে…” (৩১:১২)। এই কৃতজ্ঞতা জানানো মানেই যাবতীয় নেতিবাচক চিন্তাভাবনাকে সরিয়ে রেখে পজিটিভ থাকা।

৯. নিজের যত্ন নিন

এটি কিন্তু অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনার খেয়াল কিন্তু আপনার চেয়ে ভাল কেউ রাখতে পারবে না। তাই নিজেই নিজের প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠুন, নিজের ভাবনাচিন্তা, মনের দিকে খেয়াল রাখুন। নিজের যত্ন নিন, নিজের যা ভাল লাগে করুন। তাহলেই দেখবেন, আপনার কথা কেউ ভাবছে না বলে মনখারাপ কম হবে।

১০. আপনার যেখানে থাকার, সেখানেই রয়েছেন

মনে রাখবেন, আল্লাহই সব। ফলে এখন আপনি যা করছেন, যেখানে রয়েছেন, সেটি তাঁর ইচ্ছানুসারেই সম্ভব হচ্ছে। তাই নিজের আশপাশের এবং নিজের পরিস্থিতির খারাপ দিকগুলি না দেখে ভাল দিকগুলি দেখুন। কী করলে আরও ভাল হবে, সেটি ভাবুন। তাহলেই দেখবেন নেতিবাচক চিন্তাগুলিকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে রাখতে পারছেন।

এই ১০টি উপায় মেনে চলুন, দেখবেন অন্য সকলের চেয়ে আপনি অনেক বেশি ভাল থাকছেন, পজিটিভ থাকছেন। আর পজিটিভ থাকলে আখেরে লাভ কিন্তু আপনারই, কারণ এই পজিটিভিটিই আপনার মনকে শান্ত রেখে ভাল মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করবে।