জীবনে সাফল্য লাভ বা সফল ব্যক্তির জীবনযাপনের কয়েকটি অভ্যাস 

Pions noirs, jeu injuste de la vie
© Olivier Le Moal | Dreamstime.com

 আমরা প্রত্যেকেই শান্তিপূর্ণ জীবনের পাশাপাশি জীবনে প্রত্যাশিত সাফল্য লাভ করতে চাই। কিন্তু একইসঙ্গে আমরা আর একটা বিষয়ও জানি যে সাফল্য হচ্ছে এমন একটা প্রক্রিয়া, যা কখনওই একজন মানুষ, একদিনে আয়ত্ত করতে পারে না। এটি একটি নিবিড়, দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া এবং এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত থাকে একজন মানুষের নিরসল প্রচেষ্টা এবং উচ্চাশা। তবে জীবনে সাফল্য লাভ করার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ের কথা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে এবং এই আলোচনাটিও সেই বিষয়েই।

নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী ভাবনা চিন্তা- প্রথমেই আমাদের যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তা হল, সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে হয় আমাদের ধাপে ধাপে, একটু একটু করে। সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা এবং ছক নির্মাণের মধ্যে দিয়ে। সেজন্য ছোট কিন্তু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। কেবল “আমি ক্লাসে ফার্স্ট হবো!” বা “কাজের জায়গায় আমি প্রশংসা পাব” এমন ভাবলেই তো কাজ হবে না! ফার্স্ট হতে হলে কী কী করতে হবে, কাজের ক্ষেত্রেও সাফল্য লাভ করতে গেলে ঠিক কী কী করা প্রয়োজন, সেটা ঠিক করতে হবে একইসঙ্গে। ক্লাসে পড়ার প্রতি মনোযোগী হওয়া, একইসঙ্গে প্রতিদিনের পড়াটা প্রতিদিন শেষ করে নেওয়া আবার অফিসে নিজের কাজের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া, আরও বেশি করে নিজেকে সেই কাজের মধ্যে ডুবিয়ে ফেলা। এভাবে সুনির্দিষ্ট ছোট্ট ছোট্ট লক্ষ্য পূরণ করতে করতেই একটি বড় সাফল্যের দেখা সম্ভব বলেই মনে হয়।

এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, পাবলো পিকাসোর কাছে একবার এক মহিলা একটি পোর্ট্রেট এঁকে দিতে অনুরোধ জানান। তিনি তড়িৎগতিতে ত্রিশ সেকেন্ডেই পোর্ট্রেট এঁকে নির্বিকার মুখে বললেন, “এর দাম দশ হাজার ডলার!” “বলছেন কী আপনি! এত দাম! অথচ আপনার আঁকতে তো লেগেছে মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড!” “কিন্তু এই ত্রিশ সেকেন্ডে আঁকা রপ্ত করতে যে আমার সময় লেগেছে ত্রিশ বছর! তার দাম দশ হাজার ডলার!” সুতরাং, একটা বিষয় বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে সাফল্যের প্রকাশ এমনই একনিষ্ঠ প্রক্রিয়া।

প্রাথমিকভাবে ক্লাসের সেরা ছাত্রটিকে দেখে মনে হতে পারে সে কতই না মেধাবী, কতই না ভাগ্যবান! কিন্তু এই অবস্থানে পৌঁছাতে তাকে যে কত নির্ঘুম রাত পাড়ি দিতে হয়েছে তার খবর ক’জন রাখি? ভাগ্য বলে কিছু নেই, প্রস্তুতি ছাড়া সাফল্য মেলে না।

পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা-

আমাদের প্রত্যেকের মাথাতেই অনেক অনেক বুদ্ধি গিজগিজ করছে, কিন্তু যতক্ষণ না সেটা খাটিয়ে আমরা বাস্তবে কিছু করতে পারছি ততক্ষণ পর্যন্ত আদতে আমাদের পক্ষে কোনও কাজই করা সম্ভব নয়। বাইরের মানুষ কিন্তু জানবে না আমাদের সুপ্ত প্রতিভার কথা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপচয় এই প্রতিভার অপচয়। প্রতিদিন যদি একটা চ্যালেঞ্জই না থাকে তাহলে কীসের জীবন? নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করাটাই হল আসল উদ্দেশ্য। কিছু করার সবচেয়ে ভাল সময় হচ্ছে “এখন”। তাই “কিভাবে হবে” না ভেবে এখনই নেমে পড়া কাজে। জীবনে সফল মানুষেরা ঠিক এইভাবেই তাঁদের জীবনে সাফল্যের মুখ দেখেছে।

স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস 

একইসঙ্গে বিশ্বাস করতে হবে নিজেকে, নিজের স্বপ্নকে। স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য আমাদের সেই পরিমাণ পরিশ্রম করতে হবে তাহলেই আমরা স্বপপূরণের দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে পারব। স্বপ্ন দেখে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। স্বপ্ন পূরণের জন্য অগ্রসর হন এবং শেষ পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে আপনার স্বপ্ন পূরণ করুন। সম্মান করুন নিজের মনে পুষে রাখা স্বপ্নকে। 

আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা 

সফল হওয়ার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আমাদের মনে রাখতে হবে। আর তা হল নিজেকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলা। কোনও প্রকার দোটানায় থাকা যাবে না। বলা হয়- আত্মবিশ্বাসই সফলতার মূল শর্ত। আত্মবিশ্বাসীরা নিজেদের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ব্যাকুল থাকে সবসময়। তা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার হলেও, নিজের স্বপ্নে অটুট থেকে এগিয়ে যান আপন গতিতে। “আমাকে দিয়ে হবে না, আমি পারব না, এত কঠিন কাজ আমার দ্বারা সম্ভব হবে না”- এমন নেতিবাচক সংশয় মনে কখনওই পুষে রাখতে দেবেন না। কেনই বা পারবেন না? যারা জীবনে সফল হয়েছেন তারাও তো আপনার মতোই রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। আপনি আজকে পারেন নি দেখে কাল পারবেন না এমন তো হতে পারে না, তাই নয় কি?

কথা কম কাজ বেশি

কথা কম কাজ বেশি। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছেন এটা। আক্ষরিক অর্থেই সত্যি। সফল মানুষরা কথা কম বলেন। চুপচাপ থাকলে মনের সঙ্গে সংযোগ বাড়ে, এর চেয়ে ভালো নিজের সঙ্গে কথা বলুন। আপনার কাজের মান বাড়বে। লোকে অনেক কথাই বলবে। কান দিবেন না। শুধু এটাই মনে রাখুন সময় এবং পরিস্থিতিই জানান দিয়ে দিবে অন্যদের চাইতে আপনি কতটা সফল।

ধৈর্যশীল হয়ে ওঠা

জীবনে ভাল কিছু সব সময় দেরিতেই আসে। সাফল্য ধরা দিতে সময় নেয়। তাই বলে কখনও তাড়াহুড়ো করবেন না এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে চেষ্টা করুন। নিজের খারাপ সময়গুলোকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করুন। কারণ এটাই হয়ে উঠবে আপনার জন্য সফলতার গল্প। জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য হোঁচট খাওয়া একটা শিক্ষা। হোঁচট খেলে আপনার আত্মবিশ্বাসের জায়গাটি আরও শক্তিশালী হবে। কারণ আপনি জানেন আপনি আবার নিজ শক্তিতেই উঠে দাঁড়াতে পারবেন।

আবেগের প্রতি সংযমী মনোভাব 

আবেগ নিয়ে যে চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল হয়ে থাকে। এতে করে জীবনে উন্নতিটাও অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আসে। তাই আবেগটাকে একটু নিয়ন্ত্রণে রেখে যারা লজিক দিয়ে চিন্তা করতে পারেন তারাই পান সফলতার স্বাদ।

জীবনে কখনও কখনও ঝুঁকি নিতে শিখুন

আপনি যদি জীবনে সঠিক সময়ে ঝুঁকি নিয়ে না জানেন তবে আপনার সফলতা একটু দেরিতেই আসবে। কারণ আপনি যে সুযোগের অপেক্ষা করছেন তা আপনি নিজে তৈরি করে না নিতে পারলে কেউ করে দেবে না। বরং সুযোগ একেরপর এক হারাতেই থাকবেন।

এইভাবেই হার না মানা অভিপ্রায় অনুশীলনের মধ্যে দিয়েই আপনি সাফল্যের লক্ষ্যে খুব সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন।