শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

জুম’আর খুতবা: সমৃদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী হবেন কী উপায়ে?

63860719 - religious muslim man praying inside the mosque

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আমরা  জুম’আর খুতবাই, এই বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও আলোচনার সম্মুখীন হয়েছি। একজনের ধর্মীয় অনুশীলন কীভাবে জনগণের আচরণ পরিবর্তনে ভুমিকা রাখে, কিভাবে অন্যের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়, কোন কোন কাজ আমাদের বুদ্ধিতে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করে প্রভৃতি। 

তবে আজ যে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, তা মনুষত্বের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ গুণ। যদিও আপাতদৃষ্টিতে এটি সহজ এবং সুস্পষ্ট,  কিন্তু এই গুণটিই নিজের মধ্যে প্রকাশ ঘটানো সবচেয়ে কঠিন হতে পারে। এটি الصدر سعة নামে পরিচিত, যার অর্থ “সমৃদ্ধ হৃদয়” বা “মুক্ত হৃদয়” বা “নরম হৃদয়”। যদিও অর্থগুলোর মধ্যে অতি সূক্ষ্ম তারতম্য রয়েছে, তবে “সমৃদ্ধ হৃদয়” অর্থটাই আরবি শব্দটির অধিক নিকটবর্তী।

ইসলামের মৌলিক নীতিমালার মধ্যে একটি হল আপনি যদি কোনো ব্যক্তির আসল পরিচয় জানতে চান তবে সে কত বেশি নামাজ পড়ে বা কতটা রোযা রাখে সেদিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই, আপনি শুধু এটুকু দেখুন যে, মানুষের সাথে লোকটির আচরণ কেমন। এটিই সমৃদ্ধ হৃদয়বান হওয়ার আলামত।

সমৃদ্ধ হৃদয় সম্পর্কে কুরআনে বর্ণিত আছে-

১। “এবং মু’মিনদের মধ্য থেকে যারা আপনার অনুসরণ করে তাদের সাথে আপনি বিনম্র ব্যবহার করুন”। (আল কুরআন-২৬:২১৫)

এ থেকে বোঝা যায় যে নম্র, সদয়, নরম ও করুণাময় হওয়া আমাদের কর্তব্য।

২। “হে নবী! আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমলচিত্ত হয়েছিলেন। যদি আপনি রূঢ় ও কঠোর হৃদয় হতেন, তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে যেত। তাই আপনি তাদের ক্ষমা করুন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। কাজেকর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন, কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করুন। যারা আল্লাহর ওপর নির্ভর করে তাদের তিনি ভালবাসেন।” (আল কুরআন -৩:১৫৯)

এই আয়াত আমাদেরকে এটি জানায় যে, কোমল হৃদয়যুক্ত হওয়া – কঠোর হৃদয়ের না হওয়া, যা আল্লাহ তাআলার কাছ পক্ষ থেকে আসে এবং তাই এটি আল্লাহর কাছে আমাদেরকে চাইতে হবে যাতে আমাদের হৃদয় আলোকিত হয়। কঠোর হৃদয়যুক্ত না হওয়া এবং কোনো ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনার মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে, যা আমরা শীঘ্রই আলোচনা করব।

সমৃদ্ধ হৃদয় থাকার উপকারিতা-

ক) অন্য কোনো মানুষের ভুল সহ্য করার ক্ষমতা থাকে

খ) আপনি যে দুর্ব্যবহার বা অসুবিধার সম্মুখীন হন তা তুচ্ছজ্ঞান করতে সহায়তা করে

গ) যেকোনো পরিস্থিতিতে নমনীয় এবং সহনশীল হতে আপনাকে সহায়তা করে

ঘ) আপনার নরম প্রকৃতির মাধ্যমে অন্যকে সংস্কার করতে সহায়তা করে

ঙ) অন্যের প্রতি সহানুভূতি গড়ে তোলা এবং যেভাবে তারা তাদের ধর্মের অনুশীলন করে সেটার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে সহায়তা করে

আসুন এখন আমরা কীভাবে সমৃদ্ধ হৃদয় অর্জন করতে পারি এবং কীভাবে সেটা ধরে রাখতে পারি তা দেখব। “সমৃদ্ধ হৃদয়” বলতে কি বোঝায় এবং এর ইতিবাচক প্রভাবগুলো কী তা সহজবোধ্য করার জন্য আমরা উপরের পয়েন্ট (ঘ) এর মতো একটি শক্তিশালী উদাহরণ প্রদান করব।

শায়েখ হামজা ইউসুফ তাঁর এক বক্তৃতায় মক্কায় থাকাকালীন এক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রতিদিন সকালে নামাজের জন্য হোটেল ত্যাগের সময়, তিনি একই দরজা দিয়ে বের হতেন এবং প্রতিদিন সকালে দরজার বাইরে একই প্রহরী বসে থাকতেন। প্রথম সকালে বের হতেই তিনি প্রহরীকে ‘আসসালামু আ’লাইকুম!’ বলে অভিবাদন জানালেন, তাতে প্রহরী বিরক্তভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বললেন, ‘ও্য়া আলাইকুমুসসালাম’। দ্বিতীয় সকালেও তিনি প্রহরাকে প্রফুল্লভাবে শুভেচ্ছা জানালেন ‘আসসালামু আ’লাইকুম!’ এবং প্রহরী একটু কম বিরক্তভাবে বললেন ‘ও্য়া আলাইকুমুসসালাম’। তৃতীয় দিনের অভিবাদনটি ‘ও্য়া আলাইকুমুসসালাম’ এর সাথে একটি ছোট্ট হাসির মাধ্যমে গৃহীত হয়েছিল। চতুর্থ দিন তিনি আবার আসসালামু আ’লাইকুম!’ দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন এবং শেষ পর্যন্ত প্রফুল্লভাবে উত্তর পেয়ে গেলেন ‘ও্য়া আলাইকুমুসসালাম’।

চার দিন সময় লেগেছিল কিন্তু অবশেষে গার্ডের পুরো আচরণই বদলে গেল! এটা কখনও আমরা বুঝতে চাই না যে, মানুষের হৃদয় মূলত বরফের মত, যাকে শুধু গলানোর প্রয়োজন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্যে ভালবাসা বাড়াতে এত উত্সাহিত করেছিলেন যে, তিনি এটিকে জান্নাতের মাধ্যম হিসাবে নিশয়তা দিয়ে বলেছেন:

তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার না হবে, তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য স্থাপন করবে। আমি কী তোমাদের এমন বিষয়ের কথা বলব না, যার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হবে?” সাহাবিরা বললেন, “নিশ্চয় বলুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ!” তিনি বললেন, “তোমাদের মধ্যে বহুল পরিমাণে সালামের প্রচলন ঘটাও”।

উপরে উল্লেখিত হয়েছে যে,কঠোর হৃদয়যুক্ত না হওয়া, মানুষকে ক্ষমা করা, এমনকি আল্লাহর কাছে মানুষের জন্য ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে। ক্ষমা করা এবং তারপরে তার জন্য আবার ক্ষমা চাওয়া এটাই প্রমাণ করা যে, ঐ ব্যক্তির জন্য তাঁর হৃদয়ে কোনো বিরক্তি নেই।

অন্যের প্রতি আমাদের সমৃদ্ধ হৃদয়ই অন্যের কাছে থেকে আমাদের সম্মান প্রাপ্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় যে, মুসলিমরা একে অপরকে সম্মান করতে না পারলে অমুসলিম দেশ বা সরকারগুলি মুসলিম বিশ্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে তা কখনও আশা করা যায় না। সমৃদ্ধ হৃদয় পরস্পরের মধ্যে শক্তিশালী যোগাযোগ মাধ্যম তৈরি করতে এবং ভাঙা বন্ধনগুলি জোড়া লাগাতে খুবই সহায়ক।

ইনশা’আল্লাহ, এই কথাগুলো অনুশীলন করতে আল্লাহ আমাদের সহায় হউন।

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন