জেদি সন্তান সামলাবেন কীভাবে

সন্তান মহান রাব্বুল আলামিনের কাছ থেকে বড় নিয়ামত। যখন মা-বাবার কোলে সন্তান হেসে ওঠে সেই হাসিমুখ দেখার আনন্দ অনুভূতিটা পুরোটাই স্বর্গীয় হয়ে থাকে। পরম মমতায় আদরে বুকে আগলে রেখে প্রতিটি পিতা-মাতা তার সন্তানকে বড় করে তোলে। তবে সময়ের সাথে সাথে ও বিভিন্ন কারণে সন্তান জেদি হয়ে উঠতে পারে।

সাধারণত কৈশোরের সময়টি আবেগপ্রবণ হয়ে থাকে। নতুন নতুন বিষয় ও তার প্রতি কৌতূহল প্রবণতা আর স্বাধীনচেতা মনোভাব এর কারণে সবকিছুকেই নিজের ইচ্ছামত পেতে এবং জানতে ইচ্ছে করে। এই সময়টাতে অভিভাবকদের কখনো কখনো অতিরিক্ত কঠোর শাসন আবার অতিরিক্ত প্রশ্রয়ের কারণে সন্তানের জেদি মনোভাব তৈরি হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে যদি সন্তান জেদি হয়েই যায় তাহলে কিভাবে সামলানো যায়।

কেন জেদ করেঃ

প্রথমেই বের করার চেষ্টা করুন সন্তান কেন যে করছে। কখনো কখনো শারীরিক সীমাবদ্ধতা, বা মানসিক কষ্টের কারণেও সন্তান জেদ করে থাকতে পারে। আবার মানসিক অস্থিরতার কারণেও হতে পারে। যদি প্রথমেই জানা যায় কি কারনে সন্তান জেদ করছে তাহলে তার সমাধান করার পথ সহজ হয়ে যায়।

জেদকে উপেক্ষা করাঃ

যে আচরণ মনোযোগ বা প্রশ্রয় পায়, সেটা বেড়ে যাবে। আর যে আচরণ উপেক্ষিত হবে, সেটি ধীরে ধীরে কমে যাবে। এটা মনোবিজ্ঞান একটি সূত্র। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি সন্তান যখন কোন বিষয়ে জেদ করে তখন তাকে বকা দেওয়া বা অতিরিক্ত বোঝানোর চেষ্টা করা অথবা তার প্রয়োজন পূরণের মাধ্যমে আমরা তার জেদ কে প্রশ্রয় বা মনোযোগ দিয়ে থাকি। এর ফলে সে বারবার সেই একই কাজ করতে থাকে। কারণ সে জানে এই আচরণ দিয়েই সে তার চাহিদা পূরণ করতে পারবে। সুতরাং সন্তানের জন্য তার অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ গুলোকে উপেক্ষা অর্থাৎ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না। যখন সন্তান নিজেই বুঝতে পারবে তার এই আচরন টি কোনভাবেই এটেনশন পাচ্ছে না তখন সে নিজে থেকেই এ আচরণ বন্ধ করে দেবে। তবে মনে রাখতে হবে সব সময় সন্তানের প্রতি মমতা পূর্ণ আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির রাখতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।

সন্তানের প্রতি মনোযোগ প্রদানঃ

প্রতিটি সন্তানই চায় তার পিতা-মাতা যেন সবসময়ই তার প্রতি মনোযোগী হয়। এ কারণে আপনার সন্তানের যেকোনো ভালো কাজে তাকে উৎসাহিত করুন। এমনকি যেকোনো বিপদে বা মন্দ কাজ করে ফেলল তার প্রতি মমতা পূর্ণ পোষণ করুন। সন্তান যেন বুঝতে পারে আপনি তার প্রতি পরিপূর্ণ মনোযোগ প্রদান করছেন। তাহলে সন্তানের আপনার প্রতি মমত্ববোধ তৈরি হবে।

সন্তানের আদর্শ হয়ে উঠুনঃ

সন্তান ছোটবেলা থেকেই মূলত দেখে শেখে। আর আপনার সন্তান জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আপনাকেই দেখতে থাকে। তাই নিজেকে এমনভাবে তৈরি করুন যাতে সন্তান তার আদর্শ হিসেবে আপনাকেই গ্রহণ করে। আপনি যদি নিজেই রেগে যান, মন্দ কথা বলেন , মিথ্যা গীবত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করেন, তাহলে খুব স্বাভাবিক ভাবে আপনার সন্তান সেটাই শিখবে। তাই নিজেকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করুন যাতে আপনার সন্তান একজন পরিশুদ্ধ আদর্শবান মানুষ হিসেবে আপনাকেই অনুসরণ করতে পারে।

নেতিবাচক আচরণ করবেন না

সন্তানের সাথে কখনোই নেতিবাচক আচরণ করবেন না। সন্তানের অথবা পরিবারের অন্য কারো গায়ে হাত তোলা, অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা সহ যে কোনো নেতিবাচক আচরণ থেকে সন্তানকে দূরে রাখুন। কখনও কখনও অভিভাবকরা সন্তানদের প্রতি বিরূপ আচরণ বা ধারণা পোষণ করেন। যেমন তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, অন্যের সাথে বারবার তুলনা করা সহ বিভিন্ন ধরনের কটু কথা বলে থাকে। এই ধরনের নেতিবাচক আচরণের ফলে সন্তানের ভেতরে ভালোবাসার অভাব বোধ তৈরি হতে পারে। সে নিজেকে একাকী আবিষ্কার করবে এবং হীনমন্যতায় ভুগতে থাকবে। ফলে তার আচরণ জেদি হয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকবে

এছাড়াও আরো বেশ কিছু বিষয় আছে যা সন্তানের ব্যাপারে আপনি অনুসরণ করতে পারেন।

* সন্তানের কে যে আপনি ভালবাসেন সেটা আচরণ এবং মুখে প্রকাশ করুন।

* সন্তানকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিন।

* তারও ব্যক্তিগত জীবন রয়েছে এই বিষয়টি উপলব্ধি করুন।

* যেকোন ব্যর্থতায় সন্তানকে তিরস্কার না করে তাকে পরবর্তীতে ভালো করার জন্য উদ্বুদ্ধ করুন। আপনি যে তার উপরে ভরসা করছেন এটি তাকে বুঝিয়ে দিন।

* সন্তানের সাথে কোয়ালিটি সময় কাটান। সন্তানকে পাশে নিয়ে মোবাইল, টিভি এগুলোতে সময় না দিয়ে যখন তাকে সময় দিবেন তখন শুধু তার প্রতি পরিপূর্ণ মনোযোগ দিন।

* তার শারীরিক, মানসিক, আবেগজনিত যেকোনো পরিবর্তনে তার সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করুন।

মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআন শরীফে বলেছেনঃ “ তোমাদের ধনসম্পত্তি ও সন্তানসন্ততি তো তোমাদের জন্যে পরীক্ষাস্বরূপ। আর তোমাদের জন্যে আল্লাহর কাছেই রয়েছে মহাপুরস্কার! ” (সূরা তাগাবুন, আয়াত -১৪) । সুতরাং সন্তান লালন পালনের সময়টিতে সচেতন থাকুন এবং ধৈর্য সহকারে, মমতায় পরিপূর্ণ অন্তর দিয়ে তার পরিচর্যা করুন। রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে এই পরীক্ষায় বেশ ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ দান করুন।