জেনে নিন ইসলাম ও ভাইকিং সংস্কৃতির যোগাযোগের ইতিহাস

ইউরোপ Contributor
ফিচার
ইসলাম ও ভাইকিং
© Simon Hack | Dreamstime.com

অষ্টম শতাব্দী থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাসে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং বৈজ্ঞানিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার সময়, এই সময়কে ইতিহাসের পাতায় ইসলামের স্বর্ণযুগ বলা হয়। আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে এই স্বর্ণযুগ উজ্জ্বুলতর হয়ে ওঠে। সারা পৃথিবীর নানা জাতি, নানা মানুষের সঙ্গে ইসলামের যোগাযোগের সূচনা হয়।

পূর্বাংশে ভারতীয় সংস্কৃতি ও চৈনিক সংস্কৃতির সঙ্গে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের যে যোগাযোগ ছিল তার প্রমাণ আমরা ইতিহাসে পাই। এছাড়াও পশ্চিমে বাইজান্টিয়ান সভ্যতার সঙ্গেও প্রভূত আদান প্রদান ঘটেছে ইসলামের। সেখান থেকেই এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য ও সংস্কৃতির আদান প্রদান শুরু হয়েছে। কিন্তু উত্তরে কোনও সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামের যোগাযোগ হয়েছিল কিনা, সে বিষয়ে প্রাথমিকভাবে কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি, কিছু ঐতিহাসিকের গবেষণা থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে যে সম্ভবত ওই সময় ইসলামের সঙ্গে স্ক্যান্ডিনেভিয় ভাইকিং জাতিরও যোগাযোগ ছিল ভালোরকম। বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার নানা অংশ থেকে আরবের নানা প্রকার শিল্পকর্ম খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, এটি দুই সংস্কৃতির যোগাযোগের এক সুদৃঢ় প্রমাণ।

মূর রাজনীতিবিদ ও কবি আলি গজলের লেখায় পাওয়া গিয়েছে তৎকালীন স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও ভাইকিং-দের জীবন যাপনের নানা বিবরণ। খাদ্যাভ্যাস থেকে জীবনযাপন প্রত্যেকটি বিষয়ের বিবরণ এত জীবন্ত ও তৎকালীন স্ক্যান্ডেনেভিয়ার ইতিহাসের সঙ্গে মিলে যায় যে এটা স্পষ্ট যে আলি গজল নিজে বেশ কিছুটা সময় ওই দেশে ওই সংস্কৃতিতে কাটিয়েছেন।

ভাইকিং ইতিহাস

স্ক্যান্ডেনেভিয়া মূলত উত্তর ইউরোপের নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক দেশগুলিকে একত্রে বলা হয়। ভৌগলিক ভাবে এটি শীত প্রধান দেশ। এই দেশের মাটি ভয়ানক রুক্ষ অনুর্বর।

‘ভাইকিং’ শব্দটির উৎপত্তি স্ক্যান্ডেনেভিয়ান শব্দ ‘ভিক’ থেকে, যার অর্থ উপসাগর। এর থেকেই বোঝা যায় ভাইকিং দের সঙ্গে সাগরের একটি যোগাযোগ রয়েছে। জমির অনুর্বরতার কারণে কৃষিকাজে সক্ষম না হওয়ায় ভাইকিং জাতি ধীরে ধীরে সমুদ্রপথে বাণিজ্য শুরু করে। ক্রমে বাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে সূচনা হয় জলদস্যুতার।

এরা শারীরিকভাবে ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও উন্নত মেধার অধিকারী। যদিও, লেখাপড়ার বিশেষ চল ছিল না ভাইকিং দের মধ্যে। সেই কারণে তাঁদের সেরকম কোনও লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় না। তারা ছিল বিভিন্ন প্রকার নৌযান তৈরির সেরা কারিগর, আর সমুদ্রপথ তাদের মত আর কেউ চিনত না। সমুদ্রপথে তারা ছিল অজেয়। নিজেদের নানা প্রকার কৌশল অবলম্বন করে তারা নানা দেশ আবিষ্কারে বেরিয়ে পড়ত। অ্যাডভেঞ্চারের নেশা ছিল তাদের রক্তে। কম্পাস ছাড়াই মাইলের পর মাইল সমুদ্রযাত্রা করতে পারত ভাইকিংরা। আকাশের নক্ষত্র ও সমুদ্রস্রোতের সাহায্যে পথ চিনত তারা।

ভাইকিং ধর্ম

প্রথমদিকে ভাইকিংরা ছিল পৌত্তলিক। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে তারা নানা প্রকার দেব দেবীর উপাসনা করে। তাদের প্রধান দেবতার নাম ছিল ওডিন। তারা অগ্নি উপাসনার মাধ্যমে ওডিনের পূজা করত। এছাড়াও থর, টাইর, লোকি, ফ্রেয়া প্রভৃতি দেব দেবীর উপাসনাও করত তারা। পরবর্তীতে তারা খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তবে, সম্প্রতি আবিষ্কৃত ভাইকিং ও ইসলামের যোগাযোগ সূত্র থেকে এটা স্পষ্ট যে ভাইকিংরা ইসলামের প্রতিও আকৃষ্ট হয়েছিল।

ইসলাম ও ভাইকিং সম্পর্ক

আবিষ্কৃত পুঁথিসমূহ থেকে জানা যায় যে করডোবার চতুর্থ আমির, দ্বিতীয় আবিদ আল রহমান ভাইকিং দের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যাপারে উৎসাহ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি রাজনৈতিক আল গজলকে ‘মাজুস’-এর রাজার কাছে দূত হিসাবে পাঠিয়েছিলেন। অগ্নি উপাসকদের আরবিতে মাজুস বলা হয়, অতএব বোঝা যাচ্ছে এক্ষেত্রে মাজুস অর্থাৎ ভাইকিঙদের কথাই বলা হচ্ছে। আল গজলের লেখায় এই মাজুস দেশের বিবরণ রয়েছে একটি সামুদ্রিক দ্বীপ রাষ্ট্র হিসাবে, যে রাষ্ট্রের রাজার নাম প্রথম হরিক। যাকে আবার ড্যানিশদের রাজা হিসাবেও স্বীকৃতি দেওয়া আছে।

অপর এক পণ্ডিত আল তারতুশি ৯৭০ সালে ভাইকিঙদের বিষয়ে লিখিত বিবরণ রেখে যান। তিনি ছিলেন ভ্রামণিক, উত্তর ইউরোপের কাছে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় ভাইকিঙদের। তিনি ‘শ্লেসউইগ’-এর বিষয়ে বিশদে লিখে গিয়েছেন। ‘শ্লেসউইগ’ ভাইকিঙদের অন্যতম বড় বাণিজ্য শহরের নাম হিসাবে ইতিহাসে জানা যায়।

এছাড়া ইবন খোরাদাবাদে ও ইবন ফড়লানের লেখায় আমরা ভাইকিং-দের বিবরণ পাই। ৮৪৪ সালে ইবন খোড়াদাবাদে ভাইকিঙদের ‘রুস’ হিসাবে উল্লেখ করেন এবং জানান যে এরা মূলত দাসব্যবসা, পশুচামড়া ও ফারের ব্যবসা এবং অস্ত্রের ব্যবসার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। ইবন ফড়লানের লেখা পড়লে জানা যায় রুসরা শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী, লম্বা ও তাঁদের চামড়ার রঙ ছিল সাদা, চোখের রঙ নীল।

ইসলাম ও ভাইকিং-দের যোগাযোগের প্রমাণ

বিভিন্ন প্রকার ইসলামী শিল্পদ্রব্য আহরিত হয়েছে স্ক্যান্ডেনেভিয়ার নানা অংশ থেকে। তার মধ্যে তামা ও ব্রোঞ্জের পাত্র, আরবিয় পোশাক, কাচের পাত্র, কাচের পুঁতি ইত্যাদি প্রধান। এছাড়া উৎকৃষ্ট প্রমাণের মধ্যে পড়ে আরবিয় মুদ্রা, কুফিক মুদ্রা ও তুলাযন্ত্র।

কিন্তু ইসলাম ও ভাইকিং-দের যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায় সুইডেনের বিরকার কাছে একটি সমাধিতে। সমাধিটি এক নারী ভাইকিং যোদ্ধার। আনুমানিক দশম শতকে তিনি মারা গিয়েছিলেন। তাঁর সমাধিতে যে সমস্ত শিল্পদ্রব্য রাখা রয়েছে এবং যেভাবে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছে তাতে বোঝা যায় তিনি অত্যন্ত উচ্চপদস্থ যোদ্ধা ছিলেন। আপাদমস্তক স্ক্যান্ডেনেভিয় পোশাকে আবৃত এই নারী সৈনিকের হাতে কাচ ও রূপো দিয়ে তৈরি একটি আংটি রয়েছে। সেই আংটিতে কুফিক আরবিতে লেখা রয়েছে, ‘আল্লাহর জন্য’।

এর থেকেই বোঝা যায় ভাইকিং ও ইসলামের অত্যন্ত গভীর যোগাযোগ ছিল। কিন্তু, সেই যোগাযোগ কি শুধুই বাণিজ্যিক? আত্মিক যোগাযোগ কি একেবারেই নেই? এর উত্তর পাওয়ার জন্য অপেক্ষা শুধু সময়ের। যখন ইতিহাসের আরও কিছু অজানা পাতা আমাদের চোখের সামনে প্রকাশিত হবে।