বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে পাতলা হচ্ছে চুল? জেনে নিন টাক পড়ার কারণ

স্বাস্থ্য ২৪ মার্চ ২০২১ Contributor
জ্ঞান-বিজ্ঞান
টাক পড়ার কারণ
© Catherinelprod Catherine | Dreamstime.com

টাক পড়ার কারণ কী, তা নিয়ে মানুষের একাধারে দুশ্চিন্তা ও গবেষণার শেষ নেই! কারও ক্ষেত্রে দেখা যায় টাক নিতান্ত বংশগত ব্যাপার। ফলে আব্বা, চাচা বা পরিবারের কারওর মাথায় টাক থাকলে যে আপনারও টাক পড়বে, এ আপনি আন্দাজ করে নিতেই পারেন। কারওর ক্ষেত্রে আবার দেখা যায়, আচমকাই একসময় চুপিসাড়ে মাথা ফাঁকা হতে শুরু করে। বয়স ৪০ কি ৫০-এর কোঠা পেরতে না পেরতেই চুলে চিরুণি দিলেই গোছা-গোছা উঠে আসতে থাকে চুল। তারপর আস্তে-আস্তে কখন যে দিব্যি চকচকে একটা টাক সকলের নজর কেড়ে নিতে শুরু করে, সে বোঝাই যায় না! তখন অনেক দামি শ্যাম্পু করে বা মাথায় তেল ম্যাসাজ করেও আটকানো যায় না টাক পড়া। কিন্তু টাক কেন পড়ে, সে কথা অনেকেরই অজানা। আজ আমরা টাক পড়ার কারণ নিয়ে আলোচনা করব।

টাক পড়ার কারণ: নতুন গবেষণা

আমাদের হেয়ার ফলিকলে অবস্থিত স্টেম কোষ বা স্টেম সেল থেকে মাথায় চুল গজায়। স্বাভাবিকভাবে দেখা যায়, কোনও কারণে চুল পড়ে গেলে সেখানে আবার নতুন চুল গজায়। এটি একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া। কিন্তু বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে চুল পড়ে গেলেও নতুন চুল গজানোর ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে, ফলে মাথার চুল আস্তে-আস্তে ফাঁকা হতে থাকে ও শেষমেশ টাক পড়ে। কিন্তু নতুন চুল উৎপাদনের ক্ষমতা হ্রাস পায় কীভাবে? সম্প্রতি সেই নিয়ে গবেষণা করেছেন টোকিয়ো মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল ইউনিভার্সিটি (টিএমডিইউ) এবং ইউনিভার্সিটি অফ টোকিয়ো-র গবেষকরা।

আমাদের মাথার মধ্যে থাকে অজস্র হেয়ার ফলিকল। আর এই ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র হেয়ার ফলিকল থেকে নতুন চুল গজায়। এই নতুন চুলের উৎপাদন ও বৃদ্ধির পিছনে থাকে হেয়ার ফলিকল স্টেম সেল (এইচএফএসসি)-এর গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়া। এই হেয়ার ফলিকলের স্টেম কোষগুলি চক্রাকারে সুষম (সিমেট্রিক সেল ডিভিশন- এসসিডি) ও বিষম (অ্যাসিমেট্রিক সেল ডিভিশন- এসিডি) কোষ বিভাজনের মধ্যে দিয়ে যায়। স্টেম কোষের সুষম কোষবিভাজনের ফলে একইরকম দেখতে দু’টি কোষ উৎপন্ন হয়, যাদের পরিণতিও একই হয়। কিন্তু স্টেম কোষের বিষম বিভাজনের ফলে উৎপন্ন কোষ দু’টি সমান হয় না এবং এরা নিজেরাই অন্য নতুন কোষের জন্ম দিতে শুরু করে। এই চক্রাকার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্টেম কোষের উৎপাদন অব্যাহত থাকে। কিন্তু এটি বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে কীভাবে হেয়ার ফলিকলের স্টেম কোষের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়? সে নিয়ে গবেষকরা এখনও অন্ধকারেই রয়েছেন।

বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে কমে নতুন চুল গজানোর হার!

“টিসুগুলির যথাযথ কাজের জন্য সুষম ও বিষম, দুই ধরনের কোষ বিভাজনের ক্ষেত্রেই সাম্য বজায় থাকা প্রয়োজন,” জানালেন এই গবেষণাপত্রের লেখক এমি নিশিমুরা। তাঁর মতে, “স্টেম কোষ যদি কোনও কারণে এই দুই ধরনের কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে, তখনই সমস্যা শুরু হয়। বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে নতুন চুল গজানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে এই স্টেম কোষের বিভাজন কীভাবে সম্পর্কযুক্ত, এই গবেষণায় আমরা সেটাই দেখানোর চেষ্টা করেছি।”

এর জন্য গবেষকরা একটি কমবয়সী ও একটি বয়স্ক ইঁদুরের হেয়ার ফলিকল স্টেম সেলের ক্ষেত্রে কোষ বিভাজনের প্রক্রিয়াটি দু’টি পৃথক পরীক্ষার সাহায্যে পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁরা কোষের পরিণতি দেখেন এবং কোষ বিভাজনের অক্ষটি বিশ্লেষণ করেন। প্রথমটির ক্ষেত্রে, এইচএফএসসি-কে একটি ফ্লুরোসেন্ট প্রোটিনের সাহায্যে চিহ্নিত করা হয়, যাতে তাদের পরবর্তীকালে খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, এইচএফএসসি বিভাজনের কোণটি পরিমাপ করা হয়। গবেষকরা দেখেন যে, কমবয়সী ইঁদুরটির হেয়ার ফলিকল স্টেম সেল নতুন হেয়ার ফলিকল তৈরির ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সুষম ও বিষম কোষ বিভাজন হচ্ছে। কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে তাদের স্টেম কোষের ক্ষেত্রে বিষম কোষ বিভাজন দেখা যাচ্ছে!

বয়স বাড়াই কি টাক পড়ার কারণ?

কিন্তু বয়স বাড়াই কি তাহলে টাক পড়ার কারণ? এর উত্তর খুঁজতে হলে দেখতে হবে বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে কোষ বিভাজন প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটি। এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য গবেষকরা হেমিডেসমোজোমস নামে একধরনের প্রোটিনের দিকে মনোযোগ দেন। এই হেমিডেসমোজোমস প্রোটিন কোষকে এক্সট্রাসেলুলার ম্যাট্রিক্স (সেল পোলারিটি প্রোটিন, কোষকে ঘিরে থাকা প্রোটিন বা ইসিএম)-এর সঙ্গে যুক্ত করে। কোষ ও ইসিএম-এর এই সংযোগই কোষগুলিকে তাদের নিজস্ব পৃথক বৈশিষ্ট (সেল পোলারিটি) সম্পর্কে অবগত করে, যার ফলে কোষগুলি নির্দিষ্ট প্রোটিনের ক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের ‘স্থানিক নির্দিষ্টতা’ বুঝতে পারে! গবেষকরা দেখেছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে হেমিডেসমোজোম ও সেল পোলারিটি প্রোটিন তাদের স্থিতিশীলতা হারিয়ে ফেলায় হেয়ার ফলিকল স্টেম সেলের বিভাজনের সময় অসামঞ্জস্য দেখা যায়। যার ফলে হেয়ার ফলিকলের স্টেম কোষগুলি ক্ষয়ে যায়, তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে মাথার চুল পাতলা হতে শুরু করে। আর এটাই হল টাক পড়ার কারণ।

এই গবেষণার প্রথম লেখন হিরোয়ুকি মাৎসুমুরার মতে, “এটি থেকেই বোঝা যায় সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে হেয়ার ফলিকলগুলি থেকে নতুন চুল উৎপন্ন হওয়ার প্রবণতা কীভাবে কমতে থাকে! তবে টাক পড়ার কারণ সংক্রান্ত তাঁদের গবেষণালব্ধ ফলাফল যে পরবর্তীকালে বয়স সংক্রান্ত নানা রোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে, সে নিয়ে আশাবাদী তিনি।