জেনে নিন পবিত্র মুহাররম মাসের ফজিলত

5612 © Shams Faraz Amir | Dreamstime.com

আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত পবিত্র মুহাররম মাস একটি বরকতময় ও গুরুত্বপূর্ণ মাস। এটি হিজরি ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস এবং আল্লাহ যে চারটি মাসকে পবিত্র বলেছেন এটি তার মধ্যে একটি।

আল্লাহ বলেন, “আসমান-যমীন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কিতাবে (লৌহ মাহফুজে) মাসগুলোর সংখ্যা হল বার। তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটা হল সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। কাজেই ঐ সময়ের মধ্যে নিজেদের উপর যুলম করো না। মুশরিকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে। জেনে রেখ, আল্লাহ অবশ্যই মুত্তাকীদের সঙ্গে আছেন।” (আল কুরআন-৯:৩৬)

হজরত আবু বাকরা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তা’আলা যেদিন আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন যেভাবে সময় নির্ধারিত ছিল তা ফিরে এসেছে। ১২ মাসে এক বছর। এর মধ্যে ৪ মাস নিষিদ্ধ ও সম্মানিত। ৩ মাস পরপর; জিলক্বদ, জিলহজ্জ্ব ও মুহাররম এবং মুজারের মাস রজব যা জমাদিউস সানি ও শাবানের মধ্যবর্তী মাস।” (বুখারি, মুসলিম)

পবিত্র মাসে অন্যায় লিপ্ত হয়ো না

মুহাররম মাস বছরের অন্য মাস থেকে আলাদা এবং এটি চারটি পবিত্র মাসের অন্যতম। এ কারণে মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন, “… সুতরাং ঐ সময়ের মধ্যে নিজেদের উপর যুলুম করো না…” যার অর্থ এই পবিত্র মাসে নিজেকে অন্যায় কাজে, পাপ কাজে লিপ্ত করো না। কারণ এই মাসের গুনাহ অন্যান্য মাসের চেয়েও মারাত্মক।

ইবনে আব্বাস রাযিঃ থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, অন্য সকল মাসের মধ্যে এই চারটি মাস পবিত্র এ কারণে এই মাসসমূহে গুনাহসমূহ আরও গুরুতর হয় এবং নেক আমলগুলি আরও বেশি পুরষ্কারের উপযুক্ত হয়।

কাতাদাহ রহঃ এই আয়াত সম্পর্কে বলেছেন যে, পবিত্র মাসগুলিতে কৃত অন্যায় অন্য যে কোনো সময় কৃত অন্যায় অপেক্ষা আরও বেশি গুরুতর এবং এতে গুনাহও অধিক।

নিঃসন্দেহে যে কোনো সময় আল্লাহর হুকুমের অবাধ্য করা গুরুতর বিষয়, তবে আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা অনুপাতে যেকোনো বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেন।

আল্লাহ তাঁর সকল সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে মনোনীত করেছেন এবং মানুষের মধ্যে নবীদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানূষ হিসেবে মনোনীত করেছেন।

অনুরূপভাবে, সকল আমলের মধ্যে আল্লাহ তাঁর যিকিরকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে মনোনীত করেছেন, সকল দিনের ভিতর জুমার দিনকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে মনোনীত করেছেন, সকল রাতের ভিতর লাইলাতুল ক্বদরকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে মনোনিত করেছেন।

একইভাবে সকল মাসের ভিতর আল্লাহ চারটি মাসকে সম্মানিত করেছেন। তাঁর মধ্যে একটি হল পবিত্র মুহাররম মাস। এই মাসের আমলের অনেক ফজিলত হাদিসে বর্ণিত আছে। তেমনি এই মাসের গুনাহগুলোও মারাত্মক আকার ধারণ করে।

মুহাররম মাসে নফল রোজা পালনের ফজিলত

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “রমজানের পর রোযা পালনের জন্য সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররম মাসের রোজা।” (মুসলিম)

মুহাররম মাস এত ফজিলতপূর্ণ যে, এই মাসটির শুরুতে ‘আল্লাহর মাস’ শব্দটুকু বর্ধিত করে রাখা হয়।

এই হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ক্বারী বলেছেন, “উপরোক্ত হাদীসটি থেকে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে, সমগ্র মুহাররম মাসব্যপীই রোজা রাখা উচিত। তবে এটি সকল উলামাদের নিকট প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান ব্যতীত আর কোনো মাসেই সমগ্র মাসব্যপী রোজা রাখেননি। সুতরাং এই হাদীসটি দ্বারা সমগ্র মাসব্যপী রোজা রাখার কথা বোঝায় না; বরং মুহাররম মাসে বেশি থেকে বেশি নফল রোজা রাখার কথা বোঝায়।

এছাড়া বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাবান মাসেও বেশি বেশি রোজা রাখতেন। তিনি এ মাসে রোযা রাখার দ্বারা মুহারমমের শিক্ষারই প্রতিফলন ঘটাতেন। আর রমযানের পূর্বে শাবান মাসে রোজা রেখে তিনি রমযানকে স্বাগত জানাতেন যাতে কোনো রোগশোক বা সমস্যা রমযানের রোজার মাঝে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে না পারে।” (ইমাম নববী কর্তৃক মুসলিম শরিফের ব্যাখাগ্রন্থ)

সুতরাং, একজন সত্যিকারের মুসলিমের উচিত মুহাররমের এই বরকতময় দিনগুলির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর নিকট থেকে যতটা সম্ভব পুরষ্কার পাওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা।

আল্লাহ তা’আলাই সকল বিষয় সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত।