‘জেনে রেখো, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ।’

© Qin123 | Dreamstime.com

আলোচ্য আয়াতে আমরা দেখতে পাচ্ছি মহান রাব্বুল আলামীন বলেছেনঃ ‘সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। (এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে) তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে মহাপুরস্কার রয়েছে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ২৮)
সম্পদ ও সন্তানের প্রতি ভালোবাসা মানুষের এক চিরাচরিত স্বভাব।  এ স্বভাব যুক্তির সীমার ভেতরে থাকলে  ভালো।  কিন্তু যখন এই যৌক্তিক সীমা পার হয়ে যায় তখনই বিপর্যয় নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। খেয়াল রাখতে হবে যে এ মোহ,  ভালোবাসা যেন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার থেকে কখনোই বেশি না হয়। আর এই সম্পদ ও সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। এ আয়াতে সন্তান ও সম্পদের চেয়েও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধি-নিষেধ কে অধিক পরিমাণে প্রাধান্য দেয়ার গুরুত্ব বলা হয়েছে।

পৃথিবীতে বর্তমানে যে সংঘাত অবস্থান করছে তার অন্যতম একটি প্রধান কারণ হলো প্রাচুর্যের প্রতি অর্থাৎ সম্পদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি এবং এর থেকে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া।   অঢেল  সম্পদের আসক্তিতে মানুষ নিজেকে দানবে পরিণত করে  তোলে।  যেকোনো উপায়ে হোক অর্থ সম্পদ উপার্জন করতেই হবে। নিজের লোভ লালসার কারণে অন্যের বৈধ অধিকার ছিনিয়ে নিতে বিবেকে বাধে না।  শুরু হয় ধনী-গরিবের লড়াই।  আর এই ধনী গরিবের পার্থক্য দিনে দিনে বাড়তে থাকে।  একদিকে ক্ষুধার্ত, পীড়িত ও নিপীড়িতের গগনবিদারী হাহাকার, অন্যদিকে বিলাসিতা, মাদকতার চরম উপভোগ্য নৃত্যধ্বনি শোনা যায়। বড় বড় অট্টালিকার পাশেই বস্তি  দেখা যায়। আল্লাহ বলেন, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের মোহাচ্ছন্ন রাখে; যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও। এটি সংগত নয়; শিগগিরই তোমরা তা জানতে পারবে।’ (সুরা তাকাসুর : ১-৩)। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষাবিশেষ; আর আল্লাহ, তাঁরই কাছে আছে মহাপুরস্কার।’ (সুরা তাগাবুন : ১৫)।  অর্থাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের আসক্তি তা মানুষকে ভেতর থেকে অমানুষ করে তুলে।  এবং এই  সম্পদ যে মহান রাব্বুল আলামিনের কাছ থেকে যে একটি পরীক্ষা তা বেমালুম ভুলে গিয়ে আসক্তিতে ডুবে থাকে।

সন্তান মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এক  বড় নেয়ামত।  এই পৃথিবীতে অসংখ্য দম্পতি রয়েছে যারা সন্তানের জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে।  মা ডাক বাবা ডাক শোনার জন্য তারা ব্যাকুল হয়ে আছে। যার সন্তান নেই তিনি জানেন সন্তান আল্লাহর কত বড় নেয়ামত।  আল্লাহ এই নেয়ামতের কথা  পবিত্র কোরআন শরীফে বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর আধিপত্য আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা তা-ই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন অথবা দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা করে দেন বন্ধ্যা; তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। (সুরা শুরা : ৪৯-৫০)। ছোট বয়স থেকেই সন্তানদের সঠিক ভাবে পরিচালনা করার চেষ্টা করতে হবে।  সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।  যেহেতু সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা,  তাই সন্তানকে আল্লাহর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী,  অর্থাৎ ইসলামের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে মানুষরূপে গড়ে তুলতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘উত্তম আদব তারবিয়াত প্রদানের চেয়ে বড় আর কিছু নেই, যা মাতা-পিতা সন্তানের জন্য করতে পারে।’ (তিরমিজি)। তিনি আরো বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সম্মানিত করো। তাদের সুন্দর আদবসমূহ শিখিয়ে দাও।’ (ইবনে মাজাহ)

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আদম সন্তান যখন মৃত্যুবরণ করে তার সব আমলের সমাপ্তি ঘটে, কেবল তিনটি আমল ছাড়া। সেগুলো হচ্ছে : এক, সদকায়ে জারিয়া বা চলমান দান। দুই, এমন জ্ঞান, যা থেকে লোকেরা উপকৃত হতে থাকে এবং তিন, নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করতে থাকে। (মুসলিম : ১৬৩১)
যেহেতু মহান রাব্বুল আলামীন নিজেই স্পষ্ট করে বলছেন যে সম্পদ ও সন্তান আমাদের জন্য  পরীক্ষাস্বরূপ,  তাই আমাদেরকে সম্পদ অনুসন্ধান,  অর্জন,  ব্যয় সহ দিকেই রাব্বুল আলামিনের নির্দেশনা অনুযায়ী আয় ও ব্যয় করতে হবে।  আর  সন্তানের মোহে  আবেগ গ্রস্থ না হয় তাকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।
আর এই পরীক্ষা থেকে ভালোভাবে পাস করতে পারলে মহান আল্লাহর কাছ থেকে রয়েছে মহাপুরস্কার।

মহান রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে তার রহমতের ছায়ায় রাখুন।