জেরুজালেমের ভারতবর্ষ: আল আকসা মসজিদের পাশে এক ছোট্ট জনপদ

মধ্য প্রাচ্য Contributor
জানা-অজানা
জেরুজালেমের ভারতবর্ষ
Photo by Haley Black from Pexels

জেরুজালেমের ভারতবর্ষ, শুনতে অদ্ভুত লাগলেও আদতে তা ভীষণ ভাবে সত্যি। এতই সত্যি যে এই শহরে পা না রাখলে অনুভব করা যাবে না এর অন্তর্নিহিত অর্থ। একজন ঈমানদার মুসলমান হিসেবে জেরুজালেম দর্শন করার ইচ্ছে আমার বহুদিনের। আমার আব্বার এন্তেকালের আগে তাঁকে আমি কথা দিয়েছিলাম, তাঁর এই একটি ইচ্ছে আমি পূরণ করব। তবে, আব্বা শুধুই জেরুজালেম শহর দর্শন করার কথা বলেননি, অনেকবার আমায় মনে করিয়ে দিয়েছিলেন জেরুজালেমের ভারতীয়দের কথা। জেরুজালেমের বুকে নাকি লুকিয়ে রয়েছে ছোট্ট এক ভারতবর্ষ!

জেরুজালেমের ভারতবর্ষ ও তার খোঁজ

শহরে পা রেখে অবশ্য আমি প্রথমে একটু নিরাশই হয়েছিলাম। দোকানদার থেকে ট্রাফিক পুলিশ, কেউই জানেনা কোথায় রয়েছে জেরুজালেমের ভারতবর্ষ। শেষে আল আকসা মসজিদের এক ইমাম আমাকে সাহায্য করলেন। তাঁর নির্দেশ মত ‘শার হাপ্রাশিম’ গেট পার হয়ে আমি পা রাখলাম ছোট্ট একটি মুসলমান জনপদে। যে জনপদকে ৫৯ বছর বয়সী নাজির হুসেন আনসারি আজীবন তাঁর ঘর বাড়ি বলে জেনে এসেছেন।

আল আকসা মসজিদের পাশে এই ছোট্ট ভারতীয় মুসলমানদের জনপদ প্রায় শতাধিক বছরের পুরনো। আর শতাধিক বছর ধরে আনসারি পরিবার এই জনপদের মানুষদের দেখাশোনা করে এসেছেন।

“আমার দাদাজান ১৯২৪ সালে ভারতবর্ষ থেকে এখানে এসেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই ধীরে ধীরে এই জনবসতি গড়ে উঠেছে।” তৃপ্তির হাসি হেসে জানালেন আনসারি সাহেব। বর্তমানে এই জনপদ শুধু ভারতের কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর এখানে একমাত্র ভারতীয় নাগরিকদের থাকার অনুমতি রয়েছে।

“আমরা খাবার ও থাকার জায়গা দিই। যাতে দেশের বাইরে এসে কেউ একা না বোধ করে। আমরা ভারতীয় মুসলমানদের জানাতে চাই যে দেশের বাইরে আমরা আছি তাঁদের আপন করে নেওয়ার জন্য।” জানালেন আনসারি সাহেব, তিনি নিজে এখনও ভারতের নাগরিক। তবে, তাঁর স্থায়ী আবাস্থল জেরুজালেম।

জেরুজালেমের ভারতবর্ষ ও তার পত্তন

কথিত আছে, ১২০০ সনে সুফি সন্ত বাবা ফরিদ ভারতবর্ষ থেকে পা রেখেছিলেন পবিত্র ইসলামী শহর জেরুজালেমে। আল আকসা মসজিদের পাশে এই অংশে এক পাথরের উপর তিনি প্রায় ৪০ দিন সমাধিস্থ ছিলেন। সেই থেকে মক্কাগামী তীর্থযাত্রী ভারতীয় মুসলমানদের কাছে এটি দর্শনীয় স্থান হয়ে ওঠে। অতএব, তাঁদের থাকার জন্যই এই সরাইখানা জনপদের সূচনা।

“আমরা কিন্তু বাণিজ্যিক হোটেল নই। ভারতীয় মুসলমানরা এখানে শান্তি ও ধর্মানূভূতির জন্য আসেন। আমরা সেটাই দেওয়ার চেষ্টা করি।”

কারা থাকেন এই জনপদে?

সাধারণ ভারতীয় মুসলমান থেকে সরকারি আমলা পর্যন্ত সকলেরই এখানে অবাধ বিচরণ। তবে, সবাইকে এখানে নিজের কাজ নিজেকে করে নিতে হয়। আর সেটা মহা আনন্দের সঙ্গেই তাঁরা করে থাকেন। আনসারি ও তাঁর পরিবার এই ছোট্ট জনপদের অতিথিশালা, লাইব্রেরি, রান্নাঘর ও ছোট একটি মসজিদের দেখভাল করেন।

জনপদের সবচেয়ে আকর্ষক অংশ হল যেখানে বাবা ফরিদ ৪০ দিনের জন্য সমাধিস্থ ছিলেন। আনসারি সাহেবের মতে, তারপর থেকেই জেরুজালেমে সুফিবাদের প্রচলন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই ছোট্ট জনপদে রয়েছে যুদ্ধের স্মৃতিও…

“চারবার বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে এখানে। আর ১৯৬৭এর যুদ্ধে তো ভয়ানক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। আমার তিনজন আত্মীয় মারা গিয়েছিলেন।” খুব ধীর কণ্ঠে জানালেন ওয়াফা আনসারি, হুসেন আনসারির সুযোগ্য স্ত্রী।

“তবে, ভারত ও ইজরায়েলের কূটনীতিক সম্পর্কের উন্নতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই স্থান আবার আগের মত জমজমাট হয়ে উঠেছে।”

“বর্তমানে ভারতে ১৭২ মিলিয়ন মুসলমানের বাস, যা সারা বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ। তবে আমাদের এই ছোট্ট জনপদে কিন্তু মুসলমানের সঙ্গে সঙ্গে বহু ভারতীয় হিন্দু, শিখ ও খ্রিস্টানও থেকে গিয়েছেন। আসলে ইসলামের চোখে তফাত নেই। ইসলাম সকলকে আপন করে।” তৃপ্ত গলায় দিনের শেষে আমাদের পবিত্র ধর্মের চরম সত্যি তুলে ধরলেন জেরুজালেমের ভারতবর্ষ ও মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক নাজির হুসেন আনসারি।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.