শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

জ্ঞানের কাবা মিশরের আল আজহার

al azhar mosque and university
ID 17003830 © Rkaphotography | Dreamstime.com

ইসলাম আধুনিক সভ্যতার জনক।  পৃথিবী আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ নিয়ে গৌরব করে ইসলামের হাতেই তার সূচনা হয়েছিলো।  তার সাক্ষ্য বহন করছে পৃথিবীর প্রাচীন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অথচ বর্তমানে বিশ্বের সেরা ২০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আরব বিশ্বের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে মরক্কোর ফেজে।

মুসলিম বিশ্বের প্রাচীন যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও টিকে আছে তার মধ্যে আল আজহার অন্যতম। এটি শুধু মুসলিম বিশ্বের নয়; বরং পৃথিবীরও অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। মিশরের রাজধানী কায়রোতে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান শিয়া ধর্মাবলম্বী ফাতেমি শাসকগণ। মূলত বাগদাদের সুন্নি মতাদর্শী শাসকের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক বিজয়ের জন্য ৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে আল আজহারে সূচনা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে হয় নি। শিয়া ইসমাইলি ইমাম ও ফাতেমি খলিফা আল মুয়িজ বিল্লাহ-এর নির্দেশে ফাতেমি সেনাপতি জাওহার কায়রো একটি মসজিদ নির্মাণ করেন ৯৭০ সালে। পরবর্তী সব ফাতেমি খলিফা ও মিসরের শাসকগণ এ মসজিদের সম্প্রসারণ করেন।

মিশরের বিশ্বব্যাপী ইসলামকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য আল আজহার এখন কাজ করছে। মিশরের ইসমাইলি শিয়া ফাতেমি বংশের শাসক আল আজহার মাদরাসা বানিয়েছিলেন। এ বংশে ফাতেমা রা:, আল্লাহর রাসূলের সা: কন্যা ও আলী রা:-এর স্ত্রী, ফাতেমা আজ জাহার (আলো, আলোর ছটা, আলোর বিকিরণ)-এর নামে ডাকা হতো। ফাতেমি খলিফারা সবসময় এখানে লেখাপড়া ও ধর্মীয় আলোচনা করাকে উৎসাহ জুগিয়েছেন। বলা হয়, আল আজহারকে এমন করে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে সমাজ গঠনে ইসলামের প্রভাব সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয় এবং মানবাধিকার ও উদারতাবাদের চরিত্র সঠিকভাবে বোঝা যায়।

আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, আরবিতে ‘জামিয়াহ আল আজহার’ এখন সুন্নি ইসলামের সেরা শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বিবেচ্য। আল আজহার মসজিদকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তিত করা হয় ৯৭৫ সালে। শায়খ সাইয়েদ আল ফারিদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান শায়খ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সূচনাকালে আল আজহারে বিভাগ ছিলো ৫টি। তাহলো, ইসলামি ধর্মতত্ত্ব, আইন, আরবি ভাষা ও সাহিত্য, ইসলামিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইসলামিক দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা। খ্রিস্টীয় বারো শতকে সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবি মিশর বিজয় করার পর আল আজহারকে শিয়া প্রভাবমুক্ত করেন। সেই থেকে আজ পযন্ত আল আজহার আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মতাদর্শের অনুসারী।

বর্তমানে এখানে সেক্যুলার বিষয়াদিও কারিকুলামে সন্নিবেশিত। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, পাঠ্যসূচি সংশোধন করা প্রয়োজন ও গুরুত্বপূর্ণ। আল আজহারকে ‘লিবারেলিজমের’ ধাঁচে ফেলার চেষ্ট চলেছে বিভিন্ন সময়। এ কারণেও শিক্ষার সার্বিক মান কমে গেছে বলে পশ্চিমা শিক্ষাবিদেরা মনে করেন। তবে ধর্মীয় শিক্ষাও এ অভিযোগ থেকে বাদ যায়নি।

ইসলামি স্কলার বা ওলামা আল আজহার থেকে ধর্মীয় মতামত বা ফতোয়া দিয়ে থাকেন। বিশ্বব্যাপী সুন্নি মুসলমানেরা এই মতামত গ্রহণ করে থাকেন। মিশরের সরকার কর্তৃক নিয়োজিত দায়ী ও ঈমামদের প্রশিক্ষণও আল আজহার দিয়ে থাকে, দাওয়াহ-এর কাজও করে। এসব কাজ করতে গিয়ে আল আজহারকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। যেমন সাবেক স্বৈরতন্ত্রী শাসক হোসনি মোবারক এই প্রতিষ্ঠানকে সন্ত্রাসী বানানোর কেন্দ্র বলেছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন পুস্তকও প্রকাশ করে থাকে। দুর্লভ পাণ্ডুলিপিগুলো অনলাইনে দেয়া হয়েছে যা এখন পর্যন্ত মোট সাত মিলিয়ন পাতা!

মিশরের আলোচিত প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের ১৯৬১ সালে আল আজহারকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করেছিলেন এবং অনেক সেক্যুলার বিষয়ও এর অন্তর্ভুক্ত হয়। যেমন- ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, ফার্মেসি, মেডিসিন, প্রকৌশল, কৃষি ইত্যাদি। মিসরের বাইরে গাজা এবং কাতারের দোহায় আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা রয়েছে। মিসরের গ্রান্ড মুফতি সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। মিসরের সীমানা ছাড়িয়েও তার মর্যাদা। বতর্মানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৯টি ফ্যাকাল্টি রয়েছে, যা এক কথায় অনন্য। ছাত্র ৫৪ হাজার এবং শিক্ষক ও স্টাফ পাঁচ হাজারের বেশি। শুধু মহিলাদের জন্য এখানে আটটি অনুষদ রয়েছে। এটি এখন সুন্নি মুসলমান ও আরব বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র হলেও ভ্যাটিক্যানের মতো হতে পারেনি। কেননা এর কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। জামাল নাসের ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করেন এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পোস্টিং দেন। তারপরও আল আজহারের জ্যোতি মলিন হয়নি।

এখানে শিক্ষকেরা বিশেষ বিষয়ের ওপর আবার অধ্যয়ন করার সুযোগ পেয়ে গবেষণায় নিয়োজিত হন। পুরনো পাণ্ডুলিপিগুলোকে সঠিকভাবে অনুবাদ করে উপস্থাপনা, সম্পাদনা ও গবেষণা করা হয়। এর ফসল যেন বিদেশী ভাবধারা দ্বারা দূষিত না হয় সেদিকে বেশি দৃষ্টি দেয়া হয়। ফলে এ অঞ্চলে ও আফ্রিকায় অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তা ছাড়া মুসলিম ব্যক্তি ও গোষ্ঠীপর্যায়ে কোনো ফেতনার উদ্ভব হলে এখানকার মাশায়েখরা তা মতামত প্রদান করেন লেখনীর মাধ্যমে। যুক্তি ও তথ্যাবলি দিয়ে তারা প্রবন্ধ লিখেন ও ফতোয়া দেন। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং ইন্টারনেটে তা প্রচারিত হয়। ছাত্রদের শিক্ষা দেয়া হয় ‘ইনশা’ রচনা।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সৌদি আরব থেকে অনেকে লেখাপড়া করতে আসেন। মিশরীয়রা বলে থাকেন, ইসলাম ধর্মের কাবা মক্কায়, জ্ঞানের কাবা মিশরের আল আজহারে। বর্তমানে আল আজহারের ১৫১৫৫ শ্রেণি কক্ষে ৩০ হাজার শিক্ষক পাঠদান করেন। তাদের কাছ থেকে পাঠগ্রহণ করেন ৫ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের ২০ ভাগ বিদেশি। বর্তমানে ১০২টি দেশের শিক্ষার্থী আল আজহারে লেখাপড়া করছে। শিক্ষকসহ আল আজহারের কর্মচারি ও কর্মকর্তাদের সংখ্যা প্রায় ১৩১০০০ জন। তবে আল আজহারের অধীনে মিশরের প্রায় ৪ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। এ হিসেবে আল আজহারের বর্তমান শিক্ষার্থী ২০ লাখ প্রায়। মিশরে ঘোরাফেরা করলেই দেখা যাবে বিশেষ ডিজাইনের টুপিপরিহিত আলেমদের। তারা আল আজহারের গ্র্যাজুয়েট। ডক্টরেটদের রয়েছে অন্য ধরনের টুপি। মিশরের মসজিদে বা বাজারে গেলেই এমন আলেমদের দেখা পাওয়া যায়। মিশরীয় সমাজে এদের রয়েছে বিশেষ কদর।

আধুনিক আল আজহারের যাত্রা শুরু হয়েছে ১৯৬১ সালে। মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসের আল আজহারের হাজার বছরের অবকাঠামো ও ঐতিহ্য ভেঙ্গে তাকে একটি সেকুল্যার বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেন। তিনি আধুনিক অনেকগুলো বিভাগ ও অনুষদ যুক্ত করেন। যেমন, ব্যবসায় অনুষদ, অর্থনৈতিক অনুষদ, বিজ্ঞান অনুষদ, ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ ও কৃষি অনুষদ ইত্যাদি। জামাল আবদুন নাসেরই সর্বপ্রথম আল আজহারে নারী শিক্ষক ও অনুষদের ডিন নিযুক্ত করেন। বর্তমানে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদগুলো তিনটি ইউনিটে ভাগ করা হয়েছে। তাহলো, ইসলামিক ও আরবি, বিজ্ঞান ও মানবিক। প্রত্যেক ইউনিটে রয়েছে একাধিক অনুষদ ও বিভাগ। আল আজহারে মোট ৮৭টি অনুষদ রয়েছে। যার ৪০ মেয়েদের জন্য এবং ৪৭টি ছেলেদের জন্য।

মিসরের মসজিদগুলোতে আসর ও মাগরিব নামজের পর ক্বারীরা সুললিত কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শোনান। মুসল্লিরা তা শোনার জন্য বসে থাকেন। তারা মিসররের সেরা ক্বারী। তারা বিশেষ ব্যবস্থাপনায় এক মসজিদ থেকে আরেক মসজিদে অনুষ্ঠান করে থাকেন। কোনো কোনো সময় বড় বড় গবেষকেরা তাদের গবেষণালব্ধ তথ্য মাগরিবের নামাজের পর বয়ান করেন। কায়রোর মসজিদগুলো সবসময় রমরমা। এখানে শুধু নামাজ পড়ানো হয় না, সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রতিদিন আলোচনা হয়, সব মসজিদের আওতাধীন এলাকায় জন্ম-মৃত্যু, বিয়ে, গরিবদের লেখাপড়া, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান মসজিদ কমিটি আঞ্জাম দেয়। বিত্তবানেরা মসজিদের বিভিন্ন ফান্ডে নিয়মিত টাকা দান করেন। সে তহবিল দিয়েই যাবতীয় কর্মকাণ্ড চালানো হয়। সে তুলনায় আমাদের দেশের মসজিদগুলো অনেকটা মৃতপ্রায়।

পশ্চিমাদের অভিযোগ, আইএস বিষয়ে আল আজহারের অবস্থান সঠিকভাবে নির্ধারিত হয়নি। কেননা, আল আজহার এখনো আইএসকে অমুসলিম বা এ জাতীয় কোনো বিশেষণে ভূষিত করেনি। বিশ্ব মুসলিমের অনেক দেশের ধর্মীয় নেতা আইএসের কর্মকাণ্ডকে ‘ইসলাম বহির্ভূত’ বলে অভিমত দিয়েছেন।

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন