জ্যামিতিক নকশায় সমাদৃত ইসলামী শিল্পকলা

Inside Pattern of Dome of Taj Mahal
AGRA, INDIA - APRIL 10: Pattern on Taj Mahal on April 10, 2012 in Agra, India. Taj Mahal is widely recognized as the jewel of Muslim art and one of the universally masterpieces of the world. ID 72757576 © Saiko3p | Dreamstime.com

মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ বিধান হওয়ার কারণে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই ইসলামের পদচারণা বিদ্যমান। সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ইসলাম তার স্বতন্ত্রতার ভিত্তিতে নিজস্ব এক অবস্থান করে নিয়েছে। মুসলিম বিশ্বের সর্বত্রই শিল্প ও স্থাপনার মধ্যে এই স্বতন্ত্র সংস্কৃতির অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। খ্রিস্টীয়, ইহুদি এবং বৌদ্ধ শিল্পকলার সাথে তুলনা করে ইসলামী শিল্পকলা সম্পর্কে বলা যায়, এ সকল শিল্পকলা যেখানে শুধুই ধর্ম আশ্রিত, সেখানে ইসলামী শিল্পকলা ধর্ম এবং জাগতিক উভয় প্রয়োজনকেই পূরণ করেছে।

ইসলামের প্রথম আর্বিভাবের পর তার শিল্পকলায় কিছু বাইজান্টাইন ও পারসিক প্রভাব থাকলেও পরবর্তীতে এই প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে ইসলামী শিল্পকলা সম্পূর্ণ নতুন একধারার উদ্ভাবন করে। উমাইয়া খেলাফতকে বিবেচনা করা হয় ইসলামী শিল্পকলার প্রারম্ভিক যুগ। স্থান-কাল ভেদে ইসলামী শিল্পকলার বৈচিত্র্যময় বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। তথাপি তাদের মধ্যে কিছু সাধারণ সাদৃশ্য রয়েছে, যা তাদের অনন্য পরিচিতির প্রকাশ করেছে। মুসলিম শিল্পীরা এই অনন্যতা অর্জন করেছেন জ্যামিতি ব্যবহারের মাধ্যমে। অন্যান্য সংস্কৃতিতে মানুষ বা যেকোনো ধরনের প্রাণীর অবয়ব আঁকা বৈধ হলেও ইসলামি সংস্কৃতিতে তা বৈধ নয়। চিত্রকর বা শিল্পীর কল্পনা থেকে যদি সকল প্রকার প্রাণী বাদ যায়, তাহলে শৈল্পিকতার অনেক কিছুই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। তবে মুসলিম শিল্পীরা এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠেছেন অন্য একটি দিক থেকে। দিকটি হচ্ছে শিল্পকলায় জ্যামিতির ব্যবহার। এই সাদৃশ্যপূর্ণ পরিচিতিমূলক বৈশিষ্ট্য ইসলামের সেই মৌলিক শিক্ষার পরিচায়ক, যা সমাজ ও সংস্কৃতির ভিন্নতা সত্ত্বেও মুসলমানদের মাঝে ঐক্যের বন্ধন হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।

অন্যান্য ধর্ম বা সংস্কৃতির শিল্পের সাথে ইসলামি শিল্প একটা দিক থেকে মোটা দাগে আলাদা। তারা এই দিকটিকে এতটাই শিল্পমণ্ডিত করে তুলে যে তাদের অভাব ও সীমাবদ্ধতাগুলো পরিণত হয় অনন্য শক্তিতে। মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার, কবরখানা, প্যালেস, রাজপ্রাসাদ, ইসলাম প্রভাবিত কোনো স্থাপনা, ইসলামি মনোভাব সম্পন্ন ব্যক্তির বাড়িঘর প্রভৃতিতে চমৎকার ইসলামি শিল্পের দেখা পাওয়া যায় যেখানে জ্যামিতির প্রয়োগ ব্যাপক হারে লক্ষণীয় ।

ইতিহাস সাক্ষী, শিল্পকলায় প্রথম জ্যামিতিক নকশার প্রচলন মুসলমানদের হাতেই সূচিত হয়। ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত আট কোণাকার তারকা এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দেওয়ালে মোজাইক বা কাঠের কাজের মাধ্যমে এই নকশা অঙ্কিত হতো। বিশেষ এই সংস্কৃতির চর্চা শুরু হয় ৮ম শতকে ইসলামের ইতিহাসের শুরুর দিকে। ইতিহাসের এই অংশটি ছিল ইসলামি সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ। ইসলামের প্রভাবে প্রভাবিত তৎকালীন আরবরা তাদের পূর্ববর্তী উন্নত সভ্যতার অনেক কিছু আত্তীকরণ করে নিয়েছিল এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আরব গণিতবিদদের কাছে জ্যামিতি ছিল চরম আগ্রহের বিষয় এবং তারাই ইসলামী শিল্পকলায় জটিল জ্যামিতিক নকশার বহুল প্রচলন করেন। ইসলামী বিশ্বের সর্বত্রই বিভিন্ন স্থাপনার অলঙ্করণে জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পাশা পাশি সেইসময় বিজ্ঞানে অনেক মৌলিক আবিষ্কার-উদ্ভাবনও হয়েছিল।  অবস্থা এমন ছিল যে আরবকেন্দ্রীক একটি শক্তিশালী জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারা তৈরি হবার জোর সম্ভাবনা ছিল। ইসলামে প্রভাবিত আরবদের তৎকালের চর্চা যদি পরবর্তীতেও বিদ্যমান থাকতো তাহলে আজকে তারাই থাকতো পৃথিবীর সেরা হিসেবে। কিন্তু কোনো এক বা একাধিক কারণে সেটি হয়নি।

জ্যামিতিক নকশার মতই বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ ও ফুল-পাতার নকশাও ইসলামী শিল্পকলায় খুবই সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। ইসলামী শিল্পকলায় এরূপ নকশার এক নতুনতর ধারার উদ্ভব ঘটে, যেটি ‘আরাবেস্ক’ নামে পরিচিত। বিবিধ বস্ত্রখন্ড যথা পোশাক, মাদুর, কার্পেট, গালিচা প্রভৃতিতে এই প্রকার নকশার বহুল ব্যবহার হতে থাকে। নকশাগুলো এমন চমৎকার যে, একটির সাথে আরেকটি মিলিত হলে তারা যে জয়েন্ট তা অনুধাবন করা যায় না এবং মিল দিয়ে দিয়ে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত করা যায়। এমন গুণাবলী শুধু একটি দুটি নয়, হাজার হাজার প্যাটার্নের বেলায় প্রযোজ্য।

যেমন ভারতের আগ্রায় অবস্থিত তাজ মহল। যমুনা নদীর তীরে ভারতের আগ্রা শহরে নির্মিত এই সমাধি সৌধটি মুঘল-পারসিক স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণে নির্মিত। ১৬৩২ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহলের ইন্তেকালের পর সম্রাট তার কবরের উপর এই সমাধি সৌধটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। উস্তাদ আহমদ লাহোরী এবং উস্তাদ ঈসার নকশা ও তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই সমাধি সৌধটির কাজ ১৬৪৮ সালে সমাপ্ত হয়। এর ছাদে অন্যান্য বেলে পাথরের ইমারতের মতই নকশা করা আছে সুন্দর সুন্দর জ্যামিতিক আকৃতি। এর সমাধি, চারটি মিনার, মসজিদ এবং জাওয়াব ও প্রবেশ দরজার গায়ে অসাধারণ কারুকার্য সেকালের শিল্পীদের জ্যামিতিক প্যাটার্ন অঙ্কনের দক্ষতার প্রমাণ বহন করে চলেছে।