টিপু সুলতান কীভাবে আটকেছিলেন ইংরেজদের ?

ইতিহাস Tamalika Basu
টিপু সুলতান সামরিক

মুসলিম শাসকরা যে শুধু ভারতের বিজ্ঞান চর্চায় উৎসাহ দিয়েছিলেন তা-ই নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার প্রয়োগও করেছিলেন।

মহীশূরের সুলতান হায়দার আলি, এবং তাঁর প্রথম পুত্র টিপু সুলতান।

এই দু’জনের আমলে আধুনিক যুদ্ধের সরঞ্জামের প্রয়োগ ছিল চোখে পড়ার মতো।

সোজা পথে টিপুকে পরাস্ত করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত কৌশল প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছিল ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

টিপু সুলতান নিজের ছিলেন সামরিক বিদ্যায় পারদর্শী।

টিপু সুলতান ও মহীশূরের রকেট চালনাঃ

মহীশূরে রকেট চালনাকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত কীভাবে রকেটের সিলিন্ডারের ব্যাস এবং লক্ষ্য থেকে দূরত্ব নির্ধারণ করে কীভাবে নির্দিষ্ট একটি কোণে অস্ত্র নিক্ষেপ করতে হবে।

এছাড়াও, তারা যুদ্ধে যে ধরনের রকেট লঞ্চার ব্যবহার করত তা প্রায় একই সাথে পাঁচ থেকে দশটি রকেট উৎক্ষেপণ করতে পারত।

রকেটের পার্থক্যঃ

রকেট বিভিন্ন আকারের হতে পারে, তবে মহীশূরের রকেটে সাধারণত নরম লোহার একটি টিউব থাকত।

যার ব্যাস হত প্রায় ৪ ইঞ্চি (২০ সেমি) লম্বা এবং ১.৫ থেকে ৩ ইঞ্চি (৩.৮ থেকে ৭.৬ সেমি)।

এক প্রান্ত বন্ধ করা অবস্থায় তা বাঁশের একটি খাদে আটকে দেওয়া হত যা প্রায় ৪ ফুট (১ মিটার) দীর্ঘ হত।

লোহার টিউবটি জ্বালানি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত, এবং এর মধ্যে ভরা থাকত ভালো মানের জ্বালানি।

প্রায় এক পাউন্ড জ্বালানি বহনকারী একটি রকেট প্রায় এক হাজার গজ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারত। টিপু সুলতান ও তাঁর নেতৃত্ব ছিল এমনই।

অপর দিকে, ইংরেজদের রকেটগুলি লোহার কেসযুক্ত না হওয়ার ফলে, বড় চেম্বারের চাপ নিতে পারত না এবং ফলস্বরূপ, এত দূরত্ব অতিক্রম করতে পারত না।

টিপু সুলতান ও তাঁর পিতা হায়দার আলিঃ

হায়দার আলির বাবা ছিলেন বুড়িকোটের নায়েক বা চিফ কনস্টেবল। তিনি আরকোটের নবাবের জন্য ৫0 জন রকেট চালনাকারীকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

মাইসোর বা মহীশূরের সেনাবাহিনীতে নিয়মিত রকেট বাহিনী ছিল, হায়দার আলির সময়ে প্রায় ১২০০ জন নিয়ে এই বাহিনী শুরু হয়েছিল।

পলিলুরের যুদ্ধে টিপু সুলতানঃ

পলিলুরের যুদ্ধে (১৭৮০), দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সময়, কর্নেল উইলিয়াম বেলি যেখানে সমস্ত গোলাবারুদ মজুত করে রাখতেন।

সরাসরি সেখানে আঘাত করেছিল হায়দার আলির একটি রকেট।

তার ফলে যে বিশাল বিস্ফোরণ হয়েছিল তা সেই যুদ্ধে ব্রিটিশদের অবমাননাকর পরাজয়ের জন্য দায়ী ছিল বলে মনে করেন বহু ঐতিহাসিক।

View from the Palace of Tipu Sultan - Srirangapatna

 

টিপু সুলতান ও তাঁর অস্ত্র ও প্রযুক্তিঃ

টিপুর মৃত্যু তথা শ্রীরঙ্গপত্তনমের পতনের পরে, ৬০০ টি রকেট লঞ্চার, ৭০০টি তৈরি রকেট ও ৯,০০০ খালি রকেট উদ্ধার হয়েছিল। কিছু রকেটে ছিদ্রযুক্ত সিলিন্ডার বসানো ছিল, যাতে তার মধ্যে দিয়ে আগুন বেরোতে পারে।

আবার কয়েকটি রকেটের খোলার সাথে বাঁশের দিয়ে লোহার সূঁচ বা স্টিলের ব্লেড আটকানো ছিল। এই ব্লেডগুলি রকেটে সংযুক্ত থাকার ফলে রকেট যখন লক্ষ্যের খুব কাছে পৌঁছত তখন এই ব্লেডগুলি আর রকেটের গায়ে আটকে থাকতে পারত না, বরং সেগুলি ছিঁটকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই শত্রু সেনার গায়ে গিয়ে বিঁধে যেত উত্তপ্ত এই লৌহ শলাকা কিংবা স্টিলের ব্লেড। ফলে মুহূর্তে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত শত্রুপক্ষ।

সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণাঃ

এই ধরনের উন্নত মানের সামরিক প্রযুক্তি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এর উপরে ভিত্তি করে ১৮০১ সালে রয়্যাল উলউইচ আর্সেনাল সামরিক রকেট নিয়ে গবেষণা শুরু করে। তারা প্রথম কঠিন-জ্বালানীযুক্ত রকেটের প্রদর্শনীর আয়োজন করে ১৮০৫ সালে এবং তার পরে কিছু পরে ১৮০৭ সালে উইলিয়াম কংগ্র্রেভ প্রকাশ করেন এই সংক্রান্ত একটি বই, আ কনসাইস অ্যাকাউন্ট অফ দ্য অরিজিন অ্যান্ড প্রসেস অফ দ্য রকেট সিস্টেম।

স্ক্রু কামান: পাহাড়ের চূড়ায় ভারী কামান সহজে বহন করার জন্য, কামানটি টুকরো টুকরো করে তৈরি করা হত এবং পাহাড় চূড়ায় পৌঁছনোর পরে তা একত্রিত করে পূর্ণাঙ্গ কামান গঠন করা হত। পর পর ১৭টি ব্যারেল দাগার জন্য মাল্টি-ব্যারেলড কামান তৈরি করা হয়েছিল। এই ধরনের কামানগুলির পৃষ্ঠে জিঙ্ক এবং টিনের মিশ্রণ-সহ তামার প্রলেপ দেওয়া থাকত, আর তার সলতে তৈরি করা হত সোনা, রূপোর মতো ধাতু দিয়ে, যা দিয়ে বস্ত্রশিল্পে জরির সুতো তৈরি করা হত। আবার বিভিন্ন পণ্য ও ওষুধে ব্যবহারের জন্য সোনার ও রৌপ্য পাতা তৈরি করা হত। ধাতববিদ্যার আর একটি মাত্রা ছিল স্বর্ণ, রৌপ্য এবং তামার মুদ্রা উৎপাদন।

ভারতে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র তৈরি করা হত। তখনও জিঙ্ক বা দস্তার ব্যবহার সম্পর্কে ইউরোপে পরিচিত ছিল না তবে ভারতে এই ধাতু ব্যাপক ভাবে উত্তোলন করা হত। অস্ত্র তৈরির জন্য নানা ধাতুর মিশ্রণ তৈরি করা হত- লোহা, ইস্পাত, পিতল, ব্রোঞ্জ ব্যবহার করে। কারখানা নামে স্থানে মূলত ধাতব অস্ত্রগুলি তৈরি করা হত। কামান দাগার বিস্তারিত বিবরণ বাবরনামা এবং আইন-ই-আকবরীতে পাওয়া যায়।
মহীশূর যেভাবে সামরিক প্রযুক্তিকে আপন করে নিয়েছিল সেটা বহু দেশীয় রাজাই করেননি। বরং তাঁরা সনাতনী পদ্ধতির যুদ্ধরীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। ফলে পুরোনো সামরিক প্রযুক্তি নির্ভর ভারতকে পরাজিত করে নিজেদের শাসন স্থাপন করতে বেশি সময় লাগেনি ইংরেজদের। কারণ তারা সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করে দ্রুত নিজেদের সেনাবাহিনীকে আধুনিক করে তুলেছিল।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.