ট্যাক্সি চালিয়ে অনাথ শিশুদের পড়াশোনা করাচ্ছেন একদা ভিক্ষুক জালালুদ্দিন

kolkata taxi
ID 141852172 © Ajijchan | Dreamstime.com

ইসলামীয় সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার প্রসঙ্গে আমাদের আলোচনায় এসেছে প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং সামাজিকভাবে প্রসিদ্ধ বিভিন্ন ব্যক্তির কথা। কখনও সেই আলোচনার তালিকাতে এসেছে প্রভাবশীল সম্রাট এবং বাদশাহদের কথা, কখনও আবার ইসলামীয় সাম্রাজ্যে প্রসিদ্ধ বিভিন্ন জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের কথা। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমাদের কোনও আলোচনাতেই আমরা সাধারণ ব্যক্তিদের কথা বলিনি। তবে, তাঁরা কিন্তু ‘সাধারণ’ হলেও অসাধারণ ব্যক্তিসত্তার পরিচয় দিয়েছেন। মানবিকতার শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্তের উপস্থাপনে তাঁদের ভূমিকার কথা অবশ্যই বলতে হবে।

এই প্রসঙ্গে গাজি জালালুদ্দিনের কথা আমরা বলতে পারি। ইতিহাসের পাতা থেকে হয়তো আমরা তাঁর সম্পর্কে জানতে পারি না কিন্তু মনুষ্যত্বের ইতিহাস সৃজনে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। প্রতিবেদনটি পড়তে পড়তে অনেক মানুষের মনেই স্বভাবতই কৌতূহল জাগতে পারে, কে এই গাজি জালালুদ্দিন? খুব সহজ এবং সংক্ষিপ্ত পরিসরে বলতে গেলে তিনি হলেন একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার…

গাজি জালালুদ্দিন তাঁর ছেলেবেলা থেকেই লেখাপড়াতে ছিলেন অত্যন্ত তুখর। কোনও কোনও বিষয়ে তিনি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন, ক্লাসের পরীক্ষাতে প্রথম হওয়া সত্ত্বেও ভাগ্যের ফেরে লেখাপড়া বেশিদূর চালাতে পারেননি। ক্লাস টু-এর পরে লেখাপড়ার পাঠ এতপ্রকার চুকে যায়, কারণ অবশ্যই পারিবারিক দৈন্য, অনটন, জীবিকা এবং বেঁচে থাকার লড়াই। জীবিকার তাড়নাতে একপ্রকার বাধ্য হয়েই অনাথ এই ছেলেটি পশ্চিমবঙ্গের জয়নগরের ঠাকুরচক এলাকা থেকে চলে এসেছিল কলকাতার এন্টালির ফুটপাতে। করতে হয়েছিল ভিক্ষা। কিন্তু বেঁচে থাকার লড়াইগুলো লড়তে লড়তে হারিয়ে ফেলেনি লেখাপড়ার প্রতি অগাধ ভালবাসাটুকু। নিজের অসমাপ্ত ইচ্ছেটুকু পূরণ করতে বেছে নিয়েছে নিজের পরবর্তী জীবিকাক্ষেত্রকেই।

কলকাতা শহরের বুকে তো অনেক ধরনের ট্যাক্সি এবং অ্যাপ ক্যাব ঘুরে বেড়ায়। এক-একটি এক-একরকম… তবে গাজি ড্রাইভারের স্বপ্নের সফরসঙ্গী কিঞ্চিৎ আলাদা,  তাঁর ট্যাক্সির পিছনে লেখা রয়েছে ‘The earning by this taxi is used for the students of Sunderban Orphanage School. I urge traffic police not to register any case against this taxi. Regards, taxi driver Gazi Jalaluddin.’ অর্থাৎ ‘এই ট্যাক্সি দ্বারা প্রাপ্ত সমস্ত টাকা সুন্দরবনের অনাথ শিশুদের পড়াশোনায় খরচ করা হবে। ট্রাফিক পুলিসকে এই ট্যাক্সির বিরুদ্ধে কোনও মামলা না দায়ের করার অনুরোধ। ধন্যবাদন্তে, ট্যাক্সি ড্রাইভার গাজি জালালুদ্দীন।’ বলাই যায় যে, অসামাপ্ত স্বপ্নটুকু নিজের কাছে সারাজীবনই অধরা থেকে গেছে, সেই স্বপ্নপূরণ করতে আর একজন শিশু যাতে কখনও বঞ্চিত না হয়, তারই জন্য এই অভিনব প্রয়াস।

জালালুদ্দিন বড় হয়ে ১২ বছর প্রথমে শুরু করল রিক্সা চালাতে। ধীরে ধীরে রিক্সা থেকে উত্তরন ঘটল ট্যাক্সিতে। সেই শুরু, যাত্রীদের থেকে অনুদান চেয়ে, নিজের রোজগারের একটা বড় অংশ ব্যয় করে সে সুন্দরবন এলাকার ঠাকুরচকে গড়ে তুলল দু’দুটো স্কুল। কারও থেকে সাহায্য না পেয়ে নিজের জন্য বানানো দু’কামরার বাড়ির একটা ঘরে বাইশজন ছাত্রছাত্রী নিয়ে শুরু হওয়া সেই স্কুল এখন দুটো স্কুলে পরিণত হয়েছে যেখানে প্রায় ষোলজন শিক্ষক শিক্ষিকা আর চারশ ছাত্রছাত্রী। স্কুল দুটোর নাম শোনার ইচ্ছে নিশ্চয় সবার মধ্যেই জাগছে? নাম হল ‘সুন্দরবন শিক্ষায়তন মিশন’ আর ‘ইসমাইল ইসরায়েল ফ্রি প্রাইমারি স্কুল’।

কিন্তু কিছুদিন পরে, তখন অবশ্য প্রৌঢ়ত্বের ছোঁয়া গাজি জালালুদ্দিন এড়িয়ে যেতে পারেননি, তিনি দেখলেন বেশ কিছু বাচ্চা পড়তে চাইলেও তাদের উপায় নেই, কেননা তারা যে তাঁর মতই অনাথ। এবারও হেরে গেলেন না তিনি, ২০১৬ সালে গড়ে উঠল ‘সুন্দরবন অরফ্যানেজ মিশন’। যেখানে অনাথ বাচ্চাদের দেখাশোনা করা হয়। কিন্তু শুধু লেখাপড়া শিখলেই তো হবেনা, তার পাশাপাশি উপযুক্ত কর্মসংস্থানও প্রয়োজন। এবারও তাঁর একান্ত উদ্যোগে তৈরি হল সুন্দরবন ড্রাইভিং সমিতি, যেখানে অঞ্চলের বেকার যুবকদের বিনাপয়সায় গাড়ি চালানো শেখানো হয় এই মর্মে, যে তারা পরে সমিতিতে অন্যদের গাড়ি চালানো শেখাবে এবং স্কুল ও অনাথাশ্রমের জন্য নিজের রোজগারের একটা অংশ ব্যয় করবে। বর্তমানে অলিগলিকলিকাতার আনাচে কানাচে প্রায় চারশ যুবক ট্যাক্সি চালান যাঁরা এই সমিতির সদস্য।

প্রতিবেদনটি লিখতে লিখতেও আমার স্থির বিশ্বাস গাজি জালালুদ্দিন থেমে থাকবেন না। তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য হল নিজের স্কুলগুলোকে হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে পরিণত করা, সেই লক্ষ্য পূরণে তিনি অবশ্যই জয়ী হবেন। শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের যে উড়ান একদিন তাঁর জীবনে হঠাৎ করেই থেমে গিয়েছিল সেই স্বপ্নের পূরণ হবে অনাথ, অসহায় শিশু-কিশোরদের হাত ধরে, আগামী প্রজন্মের হাত ধরে।