ঠিক কী কারণে প্রাচীন মামলুক গালিচা ছিল এত জনপ্রিয়?

সংস্কৃতি ২৫ ফেব্রু. ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
মামলুক কার্পেট

যদিও ক্যাথলিক পোপ ও কায়রো, গ্রানাডা ও জেরুজালেমের মুসলমান শাসকদের মধ্যে কখনওই বনিবনা ছিল না, কিন্তু একটি বিষয়ে তাঁদের পচ্ছন্দ ছিল একইরকম! সেই বিষয়টি হল নকশা কাটা মামলুক গালিচা বা কার্পেট! ইতালিয় ও আরবিয় ঐতিহাসিকদের মতে, এই গালিচাগুলি ছিল অসম্ভব সুন্দর ও অন্যধরনের।

মামলুকদের তৈরি গালিচার ইতিহাস

অদ্ভুতভাবে, ঊনিশ শতকের শেষোর্ধর আগে পর্যন্ত কেউ কিন্তু এই সাদৃশ্যের কথা জানত না। শুধু তাই নয়, মামলুক রাজত্ব যে এত সুন্দর এক হস্তশিল্প দিয়ে গিয়েছে ইসলামী সভ্যতাকে, সেটাও কারোর জানা ছিল না। কিন্তু ঊনিশ শতকের শেষে কিছু ঐতিহাসিকের কৌতূহলের ফলেই এই গালিচার কথা জানা যায়। ইতালির এক পুরনো প্রাসাদের সামগ্রী নিলাম হচ্ছিল, সেখান থেকেই অজস্র চোখ ধাঁধানো সুন্দর কারুকাজ করা এই মামলুক গালিচা ঐতিহাসিকদের হাতে আসে। যদিও তখন বোঝা যাচ্ছিল না গালিচাগুলি কোন সময়ের তৈরি। তাও কিছু কিছু পণ্ডিত পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের মামলুক সাম্রাজ্যের সঙ্গে এর সংযোগের কথা বলেছিলেন।

বিশেষ করে, আবিষ্কৃত কার্পেটগুলির মধ্যে অনেকগুলিরই গায়ে ‘ব্লাজন’ নামক একটি চিহ্ন রয়েছে। সেই চিহ্ন থেকেই জানা গিয়েছে যে গালিচাগুলি মূলত মামলুক সুলতানদের বিলাস ব্যসনের জন্য তৈরি করা হত। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে কায়রো অটোমান তূর্কীদের দখলে আসে, তার আগে পর্যন্ত এই গালিচা উৎপাদিত হয়েছে।

ব্লাজন চিহটির মাধ্যমে বিভিন্ন মামলুক সুলতানের সময়কাল চিহ্নিত করা হত।

শুধু তাই নয়, পঞ্চদশ শতকের ভ্যাটিকানের পোপ ছিলেন অষ্টম ইনোসেন্ট। তাঁর জন্য কায়রো থেকে সাতটি গালিচার বরাত দেওয়া হয়েছিল ১৪৮৯ সালে। দাম পড়েছিল আজকের মূল্য অনুসারে প্রায় ১৮ লক্ষ মার্কিন ডলার।

মামলুক সুলতানদেরর বিলাস ব্যসনের দৃষ্টান্ত কখনওই বিরল ছিল না। তাঁদের জাঁকজমক ও বিলাসের অভ্যাস তাঁরা গালিচার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন পৃথিবীর বুকে।

মামলুক গালিচা-র কার্যকারীতা

মূলত ধর্মীয় কারণে প্রথমে মামলুকরা এই গালিচা তৈরি করতে শুরু করেন। ক্রমে বাড়িতে বানানোর জন্য আলাদা গালিচা উৎপাদন করা শুরু হয়। এই গালিচা ঘরে পাতলে নাকি ঘর আলো হয়ে যেত সৌন্দর্যে। পায়ের দিলে মনে হত বেহেস্তের ঘাসের মত নরম।

আসলে, এই গালিচা ছিল মামলুকদের কাছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ও আরামের প্রতীক। এর সঙ্গে মিশে গিয়েছিল সৌন্দর্যবোধ। বিশেষ করে বিলাসী সুলতানরা রাস্তাতেও এই গালিচা বিছানোর আদেশ দিতেন।

ঐতিহাসিক হিট্টির মতে, আল-নাসির নামক এক মামলুক সুলতানের শহরের বাইরে থেকে কায়রো দুর্গে ফিরে আসার পথে কর্মচারীরা তাঁর নির্দেশে প্রায় ৪০০০ হাত গালিচা বিছিয়ে দিয়েছিলেন। আরেকটি ঘটনা থেকে জানা যায়, যে পথে বিছানো গালিচা যাতে কেউ তুলে না নেয়, তাই জন্য সুলতানরা নাকি পথের দুই পাশে স্বর্ণমুদ্রা বর্ষণ করতেন।

গালিচার সাত সতেরো

কথিত আছে, একটি মামলুক গালিচা নাকি আলাদা আলাদা করে দুটি তাঁতে বোনা হত। তারপর মধ্যবর্তী অংশে জুড়ে দেওয়া হত। এই কারণেই এক একটি গালিচার আকার হত এত বৃহৎ।

মূলত, অপ্রতিসম বুনন ও বিশেষ ধরনের পশম দিয়ে এই গালিচা বোনা হত। তবে, মামলুক গালিচার সবচেয়ে উল্লেখ্য বিষয় হল তার নকশা। জ্যামিতিক ও ক্যালিগ্রাফির নকশাই সাধারণত দেখা যায় এই গালিচায়। এর সঙ্গে নজর কাড়ে লাল, ঘন বাদামি বা মেরুন, নীল, হলুদ ও সবুজের রঙের ব্যবহার। ইসলামী শিল্প ও সংস্কৃতির গবেষক কার্ট আর্ডমানের মতে মামলুক গালিচাগুলিকে নকশা অনুসারে দুই ভাগে ভাগ করা যায়,

প্রথমটিতে গালিচার চারটি কোনে মূলত জ্যামিতিক নকশা থাকে। সেই নকশা ধীরে ধীরে গালিচার ধার বরাবর ছড়িয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়টিতে গালিচার মধ্য অংশ থেকে মূলত গোলাকার বা তীর্যক নকশা শুরু হয়। সেটি আস্তে আস্তে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

অনেকক্ষেত্রে গালিচাগুলির ধারে খেজুর গাছ বা খেজুর পাতার আকারে নকশা দেখা যায়। বিশেষ করে চোখে পড়ে আটটি কোণ বিশিষ্ট তারার নকশা।

তবে, সমস্ত নকশার মধ্যে গভীরভাবে ছড়িয়ে রয়েছে ইসলামের ইতিহাস।

মামলুক গালিচা-র কারিগর

ঐতিহাসিকদের মতে, মামলুকদের গালিচার মধ্যে ভীষণভাবে মধ্য প্রাচ্যের প্রভাব বর্তমান। বিশেষ করে ইরান ও মধ্য এশিয়ার নকশার সঙ্গে এই গালিচার নকশার ভীষণ মিল। সুতরাং, অনেকেই মনে করেন মামলুক ও অটোমানদের সংঘর্ষের ফলে ইরান ও আনাতোলিয়া থেকে যে সমস্ত মুসলমান কায়রোতে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের হাত ধরেই এই গালিচার যাত্রা শুরু।

বর্তমানে মামলুক গালিচা-র নানা নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে দেশ বিদেশের সংগ্রহশালায়। এর মধ্যে বিশেষ করে উল্লেখ করা যায় ‘সিমোনেতি’ গালিচার কথা। নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটান সংগ্রহশালায় থাকা এই গালিচাটি ১৫০০ শতকের একটু পরে তৈরি। ছোট ছোট গোলাকৃতি মেডালিয়ন ও জ্যামিতিক নকশা সমন্বিত এই ঘন লাল রঙের গালিচা সাক্ষী দেয় পৃথিবীর বুকে জাঁকজমক সহকারে রাজত্ব করা মামলুক সাম্রাজ্যের।