ডায়েট এবং মানবিক আচরণ: আমাদের খাবারের মধ্যেই কি দোষ লুকিয়ে রয়েছে?

এক গবেষণার জন্য তরুণ ও বয়স্ক বন্দীদের খাদ্যতালিকা মাল্টিভিটামিন, খনিজ এবং প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড দ্বারা পরিপূর্ণ করা হল। গবেষকরা দেখতে পেলেন তাদের অসামাজিক আচরণ, সহিংসতা এবং আগ্রাসী মনোভাব অনেক কমে গেছে। এর থেকে বুঝা যায়, খাবারের সাথে আমাদের মানবিক আচরণ সরাসরি যুক্ত এবং খাবার আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করে।

যখন অ্যাটেন্শন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার (এডিএইচডি) আক্রান্ত শিশুরা বিভিন্ন ধরনের ওষুধ খেয়েও সুস্থ হচ্ছিল না, তখন তাদেরকে ছয় মাস ধরে নিয়মিত ভাবে ফ্যাটি এসিড দেয়া হলো। পরবর্তীতে দেখা গেল তারা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গিয়েছে।

উপরোক্ত উদাহরণগুলিকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এক বিস্ময়কর প্যাটার্ন দেখায় যা আমাদের দৈনন্দিন আচরণে খাবারের প্রভাব অনেক: কিশোর ও তরুণদের সহিংস এবং আগ্রাসী মনোভাব; বাচ্চাদের অস্থিরতা এবং পড়ালেখায় দূর্বলতা; এর সবগুলোতে খাবারের প্রভাব রয়েছে।
কেউ অস্বীকার করতে পারে না যে এই আচরণগুলি জটিল ধরনের মানসিক এবং সামাজিক সমস্যা যা খুব দ্রুত সমাধান করা উচিত। আর এর সমাধানের সূত্র হিসেবে আসতে পারে পরিমিত ডায়েটের কথা।

সুন্দর মানসিক এবং সামাজিক আচরণের জন্য খাদ্য বিজ্ঞানীরা যথাযথ পুষ্টি গ্রহণের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সাধারণত এই সময়ের খাবারগুলো বেশিরভাগই হয় প্রক্রিয়াজাত। এর ফলে খাবার গুলোতে ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং আশের পরিমাণ থাকে কম। অন্যদিক, এই খাবারগুলোতে শর্করা এবং চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে। এই খাবারগুলো আমাদের দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে এগুলো আমাদের কর্ম ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, মেজাজ খিটখিটে করে তোলে এবং আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক আচরণ হয়ে ওঠে বাজে ধরনের। তাই আমাদের নিয়মিত এমন সকল খাবার খাওয়া উচিত যাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ এবং আশ।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, শাকসবজি ও ছোট ছোট মাছ থেকে আমরা ওমেগা -৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পেতে পারি। এটি আমাদের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, ক্রোধ নিয়ন্ত্রণএবং সামাজিক আচরণ উন্নত করতে দারুনভাবে কার্যকর। যখন আমরা আমাদের মেজাজের উঠানামা, উদ্বেগ এবং বিরক্তি লক্ষ্য করি তখন এর জন্য দায়ী হতে পারে রক্তে শর্করার মাত্রা। মনে রাখতে হবে যে হাইপোগ্লাইসেমিয়া (নিম্ন বিএসএল) এবং হাইপারগ্লাইসেমিয়া (উচ্চ বিএসএল) উভয়ই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক। প্রথমটি আমাদের শক্তি হ্রাস এবংমেজাজ খিটখিটে করে; অন্যদিক, উচ্চ বিএসএল আমাদের স্থূলত্বতা এবং ডায়াবেটিসের কারণ হতে পারে।
যখন আমাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ কম থাকে, তখন তখন আমরা সাধারণত চিনিযুক্ত খাবার খেয়ে থাকি। রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির জন্য চকলেট অথবা মিষ্টি খাই। অনেক ক্ষেত্রে আমরা ইনসুলিন ও ব্যবহার করে থাকি। তবে এগুলো কিন্তু ভালো সমাধান নয়। পরিমিত ডায়েট এর মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখাটাই ভালো উপায়। অন্যদিকে, ক্যাফেইন ও নিকোটিন যেন আমাদের শরীরে প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এর জন্য অতিরিক্ত কফি খাওয়া এবং ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।

ভিটামিন ও খনিজ দেহ গঠন ও দেহের অভ্যন্তরীণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। অস্থি, দাঁত, এনজাইম ও হরমোন গঠনের জন্য এগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনেক। অন্যদিকে, এইগুলো স্নায়ু উদ্দীপনা ও পেশি সংকোচন নিয়ন্ত্রণ করে, দেহের জলীয় অংশে সমতা রক্ষা করে ও বিভিন্ন এনজাইম সক্রিয় রাখে। উদাহরণ সরূপ আমরা বলতে পারি অ্যামিনো অ্যাসিডের কথা। আমাদের মেজাজ এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অ্যামিনো অ্যাসিডের ভূমিকা প্রশংসনীয়।

পরিশেষে, প্রাচীন এক খাবারের কথা বলব যার নাম তালবিনা। তালবিনা হল একটি পাতলা স্যুপ যা যব বা বাার্লি দিয়ে তৈরি করা হয় এবং এর সাথে দুধ মেশানো হয়। অনেক সময় এতে মধু ও দেওয়া হয়। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, “যদি রাসূলের পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে তিনি তালবিনা খেতে পরামর্শ দিতেন।” [সহীহ সুন্নাহ ইবন মাজাহ (৩৪৪৫), হাদীস হাসান]। এটি আমাদের শরীরকে সুস্থ করে তোলে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে।