শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

ডারউইনের ৬০০ বছর আগে বিবর্তনবাদ আলোচনা করেন এই মুসলমান পণ্ডিত

ইসলামীয় স্বর্ণযুগের ইতিহাসচর্চা প্রসঙ্গেই যার নাম, যার অবদানের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে তিনি হলেন পারস্য দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী নাসির আল দীন তুসি। জনমানসে সুপরিচিত ছিলেন ‘খাজা নাসির’ নামে। প্রাচীন পুঁথি এবং গবেষণা সন্নিবিষ্ট নিবন্ধ এবং বিভিন্ন তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে লক্ষ করা যায় মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশ এবং ক্রম-উন্নয়নের চর্চায় ইসলামীয় শাসক এবং ইসলামীয় সাম্রাজ্যের পাশাপাশি, মুসলমান জনৈক ব্যক্তিবর্গের ভূমিকাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিসর থেকে বেরিয়েও বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন ক্ষেত্র যেমন-পদার্থবিদ্যা, জ্যোর্তিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা এবং চিকিৎসাবিদ্যাচর্চায় তাঁদের অবদান স্মর্তব্য… ইসলামীয় সভ্যতা সংস্কৃতি বিকাশ ধারার ক্ষেত্রে নাসির আল দীন তুসির ভূমিকাও যুগান্তকারী ভাবনার পথপ্রদর্শক বলতে পারি। বৈজ্ঞানিক এবং নৈব্যক্তিক দৃষ্টি, একইসঙ্গে যুক্তিবাদী, তার্কিক মানসিকতা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান রসদ।

চার্লস ডারউইনের ‘ন্যাচারাল সিলেকশন’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল অষ্টাদশ শতকে। কিন্তু বই প্রকাশের বহু পূর্বেই মুসলমান এই পণ্ডিত ব্যক্তি আল তুসি তাঁর মৌলিক বক্তব্য প্রকাশ করেন। ডারউইনের প্রায় ৬০০ বছর আগেই বিবর্তনবাদের মৌলিক কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন তিনি! যা যে-কোনও যুগের নিরিখেই প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। ডারউইন তার ‘অরিজিন অব স্পিসিস’ গ্রন্থে আল তুসির কাজের প্রতি কৃতজ্ঞতাও স্বীকার করেছেন, যা অধিকাংশেরই অজানা। আল তুসি তার ‘আখলাক-ই-নাসরি’ গ্রন্থে বিবর্তন নিয়ে যে আলোচনা করেছেন, তা অবশ্য ডারউইনের আলোচনার চেয়ে ভিন্ন। কেননা তিনি মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও এর বিবর্তনের উপর গুরুত্বারোপ করেন যেখানে ডারউইন আলোচনা করেছেন প্রাণীর বিবর্তন নিয়ে। কিন্তু ‘বিবর্তনবাদ’-এর প্রাথমিক এবং মৌলিক সূত্রটি ধরলে একপ্রকার নিবিড় এবং প্রাথমিক চিহ্ন অবশ্যই খুঁজে পাওয়া যায়।

তুসির মতাবলম্বনে বলতে পারি, সৃষ্টির শুরুর দিকে মহাবিশ্ব গড়ে উঠেছিল সমপরিমাণ এবং সমরূপ পদার্থ দিয়ে। কিন্তু দ্রুতই আভ্যন্তরীণ অসঙ্গতির কারণে বিভিন্ন পদার্থের মধ্যে পরিবর্তন শুরু হয়। কিছু পদার্থের পরিবর্তন দ্রুত এবং ভিন্ন উপায়ে ঘটতে থাকে। আর পরিবর্তনের এই ভিন্নতার কারণেই ভিন্ন ভিন্ন পদার্থ বিবর্তিত হয়ে খনিজ, বৃক্ষ, প্রাণী, মানুষের সৃষ্টি হয়। আর জৈবিক বিবর্তনের জন্য বংশগত পরিবর্তনশীলতার প্রয়োজনীয়তাও তিনি ব্যাখ্যা করেন। প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে প্রাণী অভিযোজিত হয়, তা নিয়েও আলোচনা করেছিলেন তুসি। ডারউইন যেখানে ‘যোগ্যতমের উদবর্ত্তন’ (survival of the fittest) প্রসঙ্গে প্রকৃতির ক্রম পরিবর্তনের সূত্রটি আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন, সেই সূত্রেরই একপ্রকার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর বহুপূর্বে আলতুসি কৃত বিজ্ঞানভিত্তিক চর্চায়।

নাসির আল দীন তুসির জন্ম ১২০১ সালে। ইরানের তুস নামক অঞ্চলে। তাঁর জন্ম শিয়া পরিবারে। অল্পবয়সেই তিনি পিতৃহারা হয়েছিলেন। হামাদান এবং তুস নামক প্রদেশে তিনি কোরান, হাদিস প্রমুখ ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি যুক্তিবিদ্যা, দর্শন এবং গণিতশাস্ত্রেও বিশেষভাবে পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। কিশোর বয়সেই তিনি নিশাপুরে দর্শন এবং গণিতশাস্ত্রে চর্চা শুরু করেন। বিশেষভাবে আকৃষ্ট ছিলেন তার্কিক এবং যুক্তিবাদী বিষয়চর্চার প্রতি। জ্ঞানচর্চার এই পর্যায়েই মঙ্গোল কর্তৃক ইরান অধীকৃত হয়। পরবর্তী সময়পর্ব থেকেই নাসির আল দীন তুসি মঙ্গোল শাসক হুলাগু খানের শাসনাধীন ইরান প্রদেশের বৈজ্ঞানিক তথা পণ্ডিত উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্যরূপে নির্বাচিত হয়েছিলেন।  নাসির আল দীন তুসির তত্ত্বাবধানেই ইরান প্রদেশে এক বিচক্ষণ ব্যক্তিবর্গ সন্নিবিষ্ট পরিষদ তৈরি হয়।

নাসির আল দীন তুসি তাঁর জ্ঞানচর্চার প্রসারক্ষেত্রে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য নজির উপস্থাপনে সমর্থ হয়েছিলেন। আর্কিমিডিস, টলেমি, হাইপেসিস এবং অন্যান্য বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিকদের গবেষণানিষ্ঠ প্রায় দেড়শোটিরও বেশি তথ্যাদির তিনি অনুবাদ করেছিলেন। তবে জ্যোর্তিবিদ্যা এবং গণিতশাস্ত্রেই তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান লক্ষ করা যায়। গণিতশাস্ত্রে তাঁরই গবেষণানিষ্ঠ সংযোজন হল ‘আল তুসি কাপল’-থিয়োরিটি। তাঁর তথ্যসন্ধানী প্রজ্ঞার অভিপ্রায় বিশেষভাবে চোখে পড়েছে ‘তাদকিরা-ফিলম-আল-হায়’ গ্রন্থমধ্যে। মধ্যযুগীয় মুসলিম মনীষীদের মধ্যে অগ্রগণ্য এই ব্যক্তিত্ব ‘ত্রিকোণমিতির জনক’ এই নামেও বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছিলেন।

অভিযোজনের প্রসঙ্গে ব্যাখ্যায় তুসি তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং পরিসরের উদাহরণের কথা উল্লেখ করেন। পশুপাখির উদাহরণ টানেন। তিনি বলেন প্রত্যেক প্রাণীরই জীবন ধারণের জন্য এবং প্রতিরক্ষার জন্য দেহে এমন কিছু অঙ্গ রয়েছে, যেগুলো প্রকৃত অস্ত্রের মতোই কাজ করে। শিং যা বর্শার মতো কাজ করে; দাঁত এবং থাবা কাজ করে ছুরি হিসেবে; খুর কাজ করে গদার মতো। আবার যেসব প্রাণীর এ ধরনের অঙ্গ নেই, প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে তাদের রয়েছে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং দ্রুত পলায়নের ক্ষমতা, যেমন শেয়াল। আবার যে সকল প্রাণীর দ্রুত পালাবার ক্ষমতাও নেই, তারা দল বেঁধে বাস করে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য, যেমন পিঁপড়ে। এইভাবে অভিযোজনগত বৈশিষ্ট্যের নানা উদাহরণ উপস্থাপনায় এবং সহজ-সরল ব্যাখ্যার নিরিখে তিনি তাঁর মতামত সাধারণ জনমানসে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস করেন।

আল তুসির মতে, পৃথিবীতে তিন ধরনের জীব রয়েছে- বৃক্ষ, প্রাণী (পশুপাখি) এবং মানুষ। মানুষকে তিনি আলাদা শ্রেণিতে স্থাপন করেছেন। কারণ তার মতে, মানুষ বিবর্তনের মধ্যভাগে রয়েছে। মানুষের বিবর্তন সম্পর্কে তার ব্যাখ্যা-

“মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য তাকে অন্য সকল জীব থেকে আলাদা করে, কিছু বৈশিষ্ট্য আবার পশুর মতো বানিয়ে দেয়, কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো বৃক্ষের বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন। এসবই প্রমাণ যে, মানুষ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং পরিপূর্ণতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। পূর্বে, পার্থক্য কেবল প্রাণীর প্রকৃতির মধ্যে ছিল। এরপর পার্থক্য গড়ে দেয় পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং জ্ঞান। একসময় পার্থক্য গড়ে দেবে আত্মিক পরিশুদ্ধিতা। মানুষ এখনো নিম্ন শ্রেণীর প্রাণীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। তবে নিজেদের প্রচেষ্টায় তারা একদিন আত্মিক পরিশুদ্ধিতা লাভ করবে, উচ্চ স্তরে পৌঁছে যাবে।”

তুসির প্রচেষ্টায় হুলেগু খান অনুপ্রেরণায় আরবাইজানে একটি মানমন্দির স্থাপিত হয়। কার্যত এই মানমন্দিরটি আজও স্বমহিমায় ভাস্বর। এই মানমন্দির থেকে তিনি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে, জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গবেষণা সন্নিবিষ্ট একটি নিখুঁত অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেবিল তৈরি করেছিলেন। তার বই ‘জিজ-ই-ইলখানি’তে তিনি গ্রহ নক্ষত্রের গতিবিধি সম্বন্ধীয় বেশ নিখুঁত একটি ছক তৈরি করেন, যা তার সময়ের সবচেয়ে নির্ভুল ছক বলে গণ্য করা হতো। তাছাড়া কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক সৌরমডেলের পূর্ব পর্যন্ত, আল তুসির সৌরমডেলই ছিল সবচেয়ে উন্নত এবং অধিক ব্যবহৃত মডেল। তাই মুসলিমদের নিকট আল তুসি ছিলেন টলেমির চেয়েও জনপ্রিয়। এছাড়াও আল তুসি সফলভাবে বিষুবরেখার বার্ষিক অয়নচলনও পরিমাপ করতে সক্ষম হন। তাছাড়া অ্যাস্ট্রোল্যাব যন্ত্রের উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন তুসি। তবে আমাদের ছায়াপথ আকাশগঙ্গা নিয়ে তুসির পর্যবেক্ষণ ছিল অসাধারণ। পরিশেষে বলতে হয় মধ্যযুগীয় পারস্য স্বর্ণযুগের ইতিহাসে এবং ডারউইনের বিবর্তনবাদের ধারায় এই মনীষার অবদান আজও স্বকীয় এবং উজ্জ্বল।

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন