SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

ডায়েট পিল মানেই ওজন কমানোর বিনিময়ে শরীরের অপূরণীয় ক্ষতি

স্বাস্থ্য ০৩ ফেব্রু. ২০২১
মতামত
ডায়েট পিল
© Dimasobko | Dreamstime.com

ছোট থেকেই শবনম একটু গোলগাল। আম্মি আদর করে গ্ল্যাক্সো বেবি বলে ডাকতেন। কিন্তু কলেজে বন্ধুদের কাছে তার নাম হয়ে গিয়েছে ফুলো। বন্ধুরাও মজা করে ডাকে, কিন্তু শবনমের তাতে মন খারাপ হয়। রাতারাতি গোলগাল চেহারা কমিয়ে স্লিম ও ট্রিম হয়ে যেতে চায় সে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইনফ্লুয়েন্সারদের স্টাইলিং দেখে আবিদেরও খুব ইচ্ছে করে সেরকম পোশাক পরতে। কিন্তু আয়নার দিকে তাকালেই পেটের চর্বি সেই ইচ্ছেয় একরাশ পানি ঢেলে দেয়। শবনম বা আবিদের মত রয়েছেন অজস্র মানুষ, যারা নিজেদের ওজন নিয়ে খুশি নন। রাতারাতি কোনও জিন-পরী তাঁদের যদি রোগা করে দেয় তাহলে যেন তাঁদের সব ইচ্ছেপূরণ হয়। আর সেই জন্যই বাজারচলতি ডায়েট পিল-গুলিকে তাঁরা নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করেন।

ডায়েট পিল কাকে বলে?

ইন্টারনেটে বা ম্যাগাজিনে অনেকসময়ই ওজন কমানোর নানাবিধ বিজ্ঞাপন দেওয়া থাকে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন থাকে ডায়েটিং পিল বা পাওডারের। এই বিজ্ঞাপনগুলিতে বলা হয় এই পিল বা পাওডার খেলে একমাসের মধ্যে ওজন কমে আপনি রোগা হয়ে যাবেন। এর কিন্তু কোনও বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি নেই, বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই বাজারচলতি রাসায়নিক ট্যাবলেট আপনার স্বাস্থ্যের সমূহ ক্ষতি করতে পারে।

ডায়েট পিল ও পাওডারের ব্যবহার কেন অনুচিত?

সম্প্রতি ইন্টারপোল বিশ্বজুড়ে ডায়েটিং পিলের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেছে, শুধু তাই নয় , বিশেষ কিছু পিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি পিল নিয়মিত খাওয়ার ফলে ব্রিটেনের এক কলেজছাত্রীর মৃত্যু ঘটে, তারপরেই ইন্টারপোল এই সিদ্ধান্ত নেয়।

ইউ এন এবং ইন্টারপোলের এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ এই ডায়েটিং পিলে এক বিশেষ ক্ষতিকারক রাসায়নিকের উপস্থিতি। ২,৪ ডাইনাইট্রোফেনল বা ডিএনপি নামক এই পদার্থটি মানুষের শরীরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেশিরভাগ ডায়েটিং পিল ও সাপ্লিমেন্টে এই রাসায়নিকের ব্যবহার প্রচলিত। এর কারণ, ডিএনপি আমাদের মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়ার হার বাড়িয়ে খুব তাড়াতাড়ি শরীরের মেদ কমিয়ে ফেলে। কিন্তু, এই বিপাকহার মাত্রাতিরিক্ত বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আসে বিপদ।

২০১৩ সালে, ব্রিটেনের এক বিখ্যাত কলেজের ছাত্র হঠাৎই মারা যায়। তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। ডাক্তাররা এই অস্বাভাবিক মৃত্যু খতিয়ে দেখতে গিয়ে জানতে পারেন সে ওজন কমানোর জন্য নিয়মিত ডায়েটিং পিল খেত। সেই শুরু, তারপর আরও তদন্ত করে জানা যায় গত দশকে শুধু ব্রিটেনেই ডায়েট পিল খেয়ে মারা গিয়েছে ষোল জন।

অন্যদিকে, ২০১১ সালে আমেরিকান কলেজ অফ মেডিকেল টক্সিকোলজির প্রকাশিত এক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, সেদেশে মোট ৬২ জন মারা গিয়েছে ডায়েট পিলের বিষক্রিয়ায়।

দুঃখের ব্যাপার হল, রোগা হওয়ার এক অসুস্থ নেশা সারাবিশ্বের সব বয়সের মানুষকে ছেয়ে ফেলেছে। এরফলেই ডায়েট পিল জাতীয় ক্ষতিকারক জিনিসের এত রমরমা।

ডায়েট পিল-এর ফলে কী কী ক্ষতি হয়?

চটজলদি ওজন কমানো যে আদতে শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক সেই বিষয়ে জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবার নিয়মিত প্রচারের পরেও বহু মানুষ ডায়েট পিল খেয়ে ওজন কমানোর কথা ভাবেন। যেহেতু এই ধরনের পিল মেডিকেল ড্রাগের আওতায় পড়ে না, তাই এগুলোর বিক্রির উপর ডাক্তারি নিষেধাজ্ঞা চাপানো যায় না। আইনের ফাঁক হিসাবে এই পিলের প্রস্তুতকারক কোম্পানি অনেকসময়ই ওজন হ্রাসের কথাটা বিজ্ঞাপনে লেখে না। কিন্তু নিয়মিত এই ডিএনপি বিশিষ্ট পিল খেলে শরীর স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙ্গে পড়ে। এর অন্যতম উপসর্গ হল,

১। তীব্র জ্বর ও মাথা যন্ত্রণা

২। ডিহাইড্রেশন ও বমিভাব

৩। অনিয়মিত হার্টবিট ও হার্টবার্ন

৪। শ্বাসকষ্ট, অত্যন্ত বেশি ঘাম হওয়া

৫। চিন্তাভাবনার অসংলগ্নতা

৬। সম্ভাব্য মৃত্যু

তবে এই উপসর্গ শুধু ডিএনপি রয়েছে এমন ডায়েট পিল ব্যবহার করলেই যে হয় তা নয়। যে সমস্ত পিলে এফিডারিন, ক্যাপসাইসিন ও অত্যধিক মাত্রায় ক্যাফিন রয়েছে সেগুলিও একই রকম ক্ষতিকর।

হার্বাল ডায়েট সাপ্লিমেন্ট আসলে একটি মিথ

ডায়েট পিলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হার্বাল ডায়েটের প্রবণতা। এই ডায়েটে নাকি প্রাকৃতিক সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে ওজন কমানো হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় র‍্যাস্পবেরি কিটোন সাপ্লিমেন্টের কথা। যেকোনো মেডিকেল শপে বিনা প্রেসক্রিপশনেই এটি পাওয়া যায়। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে এর মধ্যে আদতে রয়েছে উচ্চমাত্রায় ক্যাফিন! গত বছর, এই সাপ্লিমেন্ট অতিরিক্ত খেয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৪ বছরের এক তরুণীর। সুতরাং, কোনওরকম বোতল বন্দি ওজন কমানোর দ্রব্য, তা যতই হার্বাল তকমা লাগাক না কেন, বিপদ মুক্ত ও স্বাস্থ্যকর নয়।

চটজলদি রোগা হতে চাওয়ার পিছনে রয়েছে সামাজিক প্রভাব

বর্তমান পৃথিবীর মানসিকতাই হল যে যত রোগা সে তত সুন্দর। এই ভুল ধারণার ফলে বহু মানুষ, বিশেষ করে যুবক যুবতীরা অস্বাস্থ্যকর ভাবে রোগা হওয়ার ফাঁদে পা দেয়। রোগা হওয়া আর স্বাস্থ্যকর ভাবে ওজন কমানোর মধ্যে বেশ স্থূল একটা ফারাক রয়েছে, এটা মনেই রাখাই শ্রেয়। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ৬৬ শতাংশ যুবতী ও ৩১ শতাংশ যুবকের মধ্যে চটজলদি রোগা হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। বাদ নেই বয়স্করাও, বিশেষ করে চল্লিশ অতিক্রম করলেই রোগা হয়ে নিজের বয়স লুকোনোর একটা প্রয়াস দেখা গিয়েছে অনেকের মধ্যে।

অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে ছিপছিপে ও স্বাস্থ্যকর থাকা অবশ্যই ভাল প্রয়াস, কিন্তু সেটার জন্য চটজলদি কোনও উপায় নেই। নিয়মিত পুষ্টিকর খাদ্য ও ব্যায়ামের মাধ্যমেই আস্তে আস্তে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। এই সত্য যতদিন মানুষ মেনে নিতে পারবে না, ততদিন পর্যন্ত ডায়েট পিলের ক্ষতির শিকার হবে অনেকেই।