ডিজিটাল আসক্তির যুগে বিরাজ করছে উন্মত্ততা

ID 154742015 © Pop Nukoonrat | Dreamstime.com
ID 154742015 © Pop Nukoonrat | Dreamstime.com

আমাদের প্রিয় নবীগণ ও যুগে যুগে আগত জ্ঞানী লোকেরা একাগ্রতা চেয়েছিলেন এবং মননের অনুশীলন করতেন। তবে আজকের আধুনিক বিশ্বে এই অনুশীলনটি হারিয়ে যাচ্ছে মনে হয়, লোকেরা বিভিন্ন বাজে জিনিসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে এবং এর ফলে তারা নানাভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে।

এই সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে এড়িয়ে চলা কঠিন। আমাদের বেশিরভাগ মানুষই তা চায় না। অন্যদিকে, কম্পিউটারের মাধ্যমে আমরা দারুণ সব কাজ খুব সহজেই করতে পারি: যেমন আমরা বিশ্বের যে কোনও জায়গায় লোকের সাথে যোগাযোগ করতে পারি, আমাদের বন্ধুদের এবং পরিবারের সাথে সর্বদা যোগাযোগ রাখতে পারি, অচেনা একটি শহরের পথঘাট চিনে নিতে পারি, বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী জানতে পারি এবং কেনাকাটা করতে পারি।

এর খারাপ সমস্যাগুলি তখনই শুরু হয় যখন আমরা নিজেদেরকে ভার্চুয়াল জগতে হারিয়ে ফেলি এবং বিভ্রান্ত হই। আমরা অদ্ভুত এক চিন্তাধারার জগতে বাস করতে থাকি। অনলাইনে থাকা ভার্চুয়াল জগতের বন্ধুদের সাথে এত ব্যস্ত থাকা হয় যে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক গুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। তথ্য খোঁজার মাধ্যম গুলো যখন আমরা ব্যবহার করি তখন সেগুলো আমাদেরকে একটি নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে ফেলে। আমরা কেনাকাটায় আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং অনলাইনে প্রচুর সময় নষ্ট করি।

সমস্যার রূপরেখা

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক এজেন্ডা (আইসিএমপিএ) এর নেতৃত্বে এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রতি তীব্র আসক্ত হয়ে পড়েছে এবং দিন দিন তাদের মাঝে উদ্বেগ ও হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইন্টারনেটের ব্যবহার হয়তো তাদের জন্য আবশ্যক কিন্তু এই ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি তাদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি করে।

পাঁচটি মহাদেশের দশটি দেশের প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীকে ২৪ ঘন্টা ধরে সবগুলো অনলাইন প্লাটফর্ম থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছিল এবং এই বিরত থাকার প্রভাব পরিলক্ষিত হল। সমীক্ষায় দেখা গেল যে, তারা জানত না যে এই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গুলো তাদেরকে সামাজিক সম্পর্ক থেকে কতটা দূরে রাখত। তারা মনে করতো এটাই একমাত্র মাধ্যম যা ব্যবহার করে তারা তাদের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারে। ২৪ ঘন্টায় এর থেকে দূরে থাকার ফলে তারা খানিকটা অস্থিরতা বোধ করলো কিন্তু সবচেয়ে ভালো দিক হলো তারা তাদের পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে বেশ ভালো সময় কাটাতে পেরেছিল। তাই তারা বুঝতে পেরেছিল অনলাইন প্লাটফর্ম গুলোর প্রভাব তাদের উপরে কতটুকু।

যুক্তরাজ্যের ডার্বি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী জাহির হুসেন স্মার্টফোনের আসক্তি সম্পর্কে একটি গবেষণা থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের মধ্যে মানসিক রোগ তৈরি করতে পারে। এই সমীক্ষায় দেখা গেছে যে এর অংশগ্রহণকারীদের ১৩% তাদের ফোনে ভীষণভাবে আসক্ত ছিল এবং এটা ব্যাবহার করার জন্য তারা দিনে গড়ে সময় ব্যয় করেন দিনে ৩.৬ ঘন্টা। অন্যদিকে, অত্যধিক আত্মতুষ্টিতে ভোগা এবং বদমেজাজ, হিংসা, এবং একাকীত্ব সহ নেতিবাচক ব্যক্তিত্ব স্মার্টফোনের আসক্তির সাথে সরাসরি যুক্ত ।

একাধিক কার্য সম্পাদনকারী নাকি বিভ্রান্ত ব্যক্তি?

ডিজিটাল আসক্তির যুগে বিভ্রান্তি এক ভয়াবহ ফল। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা একই সময়ে বিভিন্ন কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখি। এটা সত্যি যে এর ফলে আমাদের সময় ও বাঁচে এবং কাছে গতি ও আসে। কিন্তু এই সুবিধার বিনিময়ে আমরা কি হারাচ্ছি তা কি কেউ ভেবে দেখেছি? নিয়মিত এই প্রযুক্তির সাথে নিজেকে জড়িত রাখার ফলে আমরা এর উপর অনেক নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায় যে এই নির্ভরশীলতা আমাদের মাঝে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।
একই সময়ে একাধিক কাজ করাটাকে মাল্টিটাস্কিং বা সুইচটাস্কিং বলা হয়। মাঝেমধ্যে এটা ভীষণ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। ধরুন আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন এবং এক সময় আপনি আপনার ফোনটিও ব্যবহার করছেন। এর ফলে আপনি খুব সহজে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন।
তাই পরিশেষে বলা যায় যে, ডিজিটাল প্রযুক্তির পরিমিত ব্যবহারই আমাদের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে।