ডেভিড ডোর: সুমহান ইসলামের ঐতিহ্য বুঝতে অক্ষম হয়েছিলেন তিনি

পর্যটন ২৮ ফেব্রু. ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
ডেভিড ডোর
Photo by Simon Berger from Pexels

১৮৫৩ সালের কোনও এক বসন্তে, দক্ষিণ প্যালেস্টাইনের মরুভূমি বেশ বিরক্তি নিয়ে দেখেছিলেন এক আফ্রিকান আমেরিকান পর্যটক। শুধু দেখেছিলেন বললে সম্পূর্ণ বলা হয়না, লিখে রেখেছিলেন নিজের চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরিতে। যা অনেক পরে এক অন্যরকম ভ্রমণকাহিনী হিসাবে আমাদের কাছে পরিচিত হয়। ডেভিড ডোর অবশ্য তখন ভাবেননি তাঁর এই খেয়াল খুশি লেখার খাতা একদিন বিশ্বের কাছে প্রকাশ পাবে।

ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের মধ্য প্রাচ্য ভ্রমণ কাহিনীর কথা বলতে গেলেই প্রথমে নাম উঠে আসবে মার্ক টোয়েনের। তাঁর বই ‘দ্য ইনোসেন্টস অ্যাব্রড’ থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি আধুনিক পাশ্চাত্য শিল্প সংস্কৃতি মহলে জল্পনা শুরু। টোয়েনের লেখা অসম্ভব কুশলী ও মজাদার। তুলনায়, ডেভিড ডোরের লেখা অনেক বেশি রুক্ষ ও বিরক্তিপূর্ণ।

মার্ক টোয়েনের ভ্রমণকাহিনীর প্রায় বছর দশেক আগে প্রকাশিত এই ভ্রমণকাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের আসল রূপ একেবারেই তুলে ধরতে পারে না। তবে, তুলে ধরে ডেভিডের নিজের জীবনের অনুষঙ্গ ও তাঁর মানসিকতা। বইয়ের নাম থেকেই তা স্পষ্ট, ডেভিড নিজের বইয়ের নাম রেখেছিলেন, ‘আ কালারড ম্যান রাউন্ড দ্য ওয়র্লড’। নামটি আসলে গভীর পরিহাস, তার কারণ ডেভিড নিজেই।

ডেভিড ডোর-এর জীবন

ডেভিড ডোরই একমাত্র আফ্রো-আমেরিকান মানুষ, যিনি জেরুজালেম পর্যন্ত নিজের চোখে দেখে এসেছেন। কিন্তু, সেই দেখা তাঁর মনে বিশেষ দাগ কাটেনি।

কহানি মে টুইস্ট এটাই যে তিনি এই পর্যটন ঠিক স্বেচ্ছায় করেননি। ডেভিডের জন্ম নিউ অরলিয়ানসে, ১৮২৭ সালে। সেখান থেকেই যুবক বয়সে তাঁকে কর্নেলিয়াস ফেলোজ নামক এক ব্যবসায়ী দাস হিসাবে কিনে নেয়। ডেভিড ছিলেন “কোয়াড্রুন”, তৎকালীন আমেরিকায় এই অ্যাখ্যার মাধ্যমে এমন মানুষদের বোঝানো হত যাদের বাবা সাদা চামড়ার, কিন্তু মা আফ্রিকান আমেরিকান। ডেভিড অবশ্য নিজের বাবা ও মাকে সেভাবে কখনওই পাননি।

ডেভিড অবশ্য তাঁর লেখায় জানিয়েছেন যে নিঃসন্তান কর্নেলিয়াস তাঁকে নিজের সন্তানতুল্য মনে করতেন। এবং বেশ খানিকটা স্বাধীনই ছিলেন তিনি। তবে, তৎকালীন আমেরিকার দাস প্রথার কথা মাথায় রেখে, এই কথা বিশ্বাস করা একটু কঠিন।

১৮৫১ সালে কর্নেলিয়াসের অধীনে ডেভিডের ভ্রাম্যমাণ জীবন শুরু হয়। প্রথমে তাঁদের গন্তব্য ছিল ব্রিটেনের লিভারপুল। সেখানে ব্যবসায়ীক কাজকর্ম মিটিয়ে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, জার্মানি হয়ে তাঁরা পৌঁছন গ্রিস। সেখান থেকে তুরস্ক হয়ে ডেভিডের মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটনের সূচনা। এই ভ্রমণে তিনি মিশর, প্যালেস্টাইন, সিরিয়া ও লেবানন অবধি ভ্রমণ করেছিলেন।

১৮৫৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর, ফ্রান্স থেকে আমেরিকার ফিরতি জাহাজে ডেভিড বাড়ি ফিরে আসেন। বাড়ি অর্থাৎ নিউ অরলিয়ানস। সেখানে এসে কর্নেলিয়াসের কাছে মুক্তি প্রার্থনা করেন ডেভিড। বিশ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তখন তাঁকে সমৃদ্ধ ও অভিজ্ঞ করে তুলেছে। কর্নেলিয়াস মুক্তি দিতে সম্মত না হলে তিনি লুকিয়ে নিউ অরলিয়ানস থেকে ওহাইয়ো শহরে চলে আসেন। ওহাইয়োতে দাস প্রথা তখন নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়েছে। ডেভিড করণিকের চাকরি যোগার করে টাকা জমিয়ে নিজের ভ্রমণকাহিনী প্রকাশ করেন। ১৮৭২ সালে, সিভিল ওয়ারের সময় যুদ্ধে তাঁর মৃত্যু হয়।

তাঁর মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ

ঠিক কী কারণে কর্নেলিয়াস ও ডেভিড মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের এত লম্বা ভ্রমণ করেছিলেন, তা জানা যায় না। কিন্তু এটা বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ডেভিডকে এক পরিবর্তিত মানুষ করে তুলেছিল। কিন্তু ইউরোপ ভ্রমণে ডেভিডের মানসিকতা ছিল কৌতূহলী। যেই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে তিনি পা রেখেছিলেন, তাঁর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ অন্যরকম। তাঁর লেখা থেকে বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ ও পরিবেশ তাঁর পছন্দ হয়নি। তিনি অটোমান সুলতান আব্দুল মেজিদকে দুর্বল শাসক হিসাবে অভিহিত করেছেন। এমনকি, মিশরের আলেকজান্দরিয়ার খাবার তাঁর বিন্দুমাত্র পছন্দ হয়নি। যদিও, কায়রো তাঁর মন জয় করেছিল। কিন্তু সেখানেও, নীলনদে নৌকো বিহারের সময় স্থানীয় আরব ও মিশরীয়দের সঙ্গে তাঁর কথা কাটাকাটি হয়।

কিন্তু তাঁর মানসিকতা পরিবর্তিত হতে থাকে পিরামিড দেখার পর। হঠাৎ করেই যেন ডেভিড অনুভব করেন এই সমাধিস্থলে তাঁর পূর্বপুরুষের দেহ রয়েছেন। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের সঙ্গে আসলে তাঁর জিনগত যোগাযোগ। আজ আমেরিকায় দাস হিসাবে তিনি পরিচিত হলেও তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন অত্যন্ত সংস্কৃতিবান এক উন্নত জাতির মানুষ।

পালেস্টাইনে তাঁর অনুভূতি 

তবে সেই পরিবর্তন ছিল ক্ষণস্থায়ী। প্যালেস্টাইনের মরুভূমি পার হয়ে হেব্রোন শহরে পৌঁছন তিনি। কিন্তু সেখানকার মসজিদে তাঁকে প্রবেশ করতে না দেওয়া হলে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন।

“দুপুর একটার সময় আমরা একটা উঁচু টিলায় উঠলাম। অলিভ গাছের জঙ্গলে ঘেরা টিলা থেকেই আধ মাইল দূরের জেরুজালেম শহর দেখা গেল। শহরের বাড়ির ডোম ও মসজিদের ডোম যেন চকচক করছিল রোদ্দুরে।” ডেভিড জেরুজালেমের দেখা পেয়ে উৎসাহের সঙ্গে এই লাইন কটি লেখেন। কিন্তু জেরুজালেমও তাঁর কথা মত তাঁকে নিরাশ করে।

ডেভিড ডোর প্রায় ১৭ দিন জেরুজালেমে ছিলেন। কিন্তু শহরটিকে তিনি ভালবাসতে পারেননি। তাই জেরুজালেমে ফিরে আসতে চাননি কখনও। তাঁর শেষ দিকের পাতায় লেখার পরিমাণ কমে আসছিল।

একটি বিশেষ ঘটনা এর মধ্যে উল্লেখ্য, যা দেখায়, ডেভিড আসলে ইসলাম ও উত্তর আফ্রিকার সংস্কৃতি সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞাত ছিলেন। জর্দন নদী, আফ্রিকান আমেরিকার সাহিত্য ও ইসলামী সাহিত্য যা অত্যন্ত পবিত্র ও মুক্তির নদী। শুধু তাই নয়, বাইবেলেও যার উল্লেখ রয়েছে। সেই নদীতে স্নান করে ও তার জল পান করে তিনি মনে করেছিলেন, এর থেকে মিসিসিপি নদীর জলের স্বাদ ভাল।

ডেভিড ডোর-এর এহেন মানসিকতার কারণ

ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা মালিনী জোহর শুয়েলারের মতে, ডেভিড আসলে নিজের জাতির মানুষদের ছোট করে ইউরোপিয়ানদের মধ্যে আশ্রয় খুঁজছিলেন। তিনি ছিলেন দুর্বল চরিত্রের মানুষ, আর এত বছরের দাসত্ব তাঁকে একটাই জিনিস শিখিয়েছিল, সাদা চামড়ার মানুষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হতে হবে। সেই জন্যই ইসলাম ও মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার ঐতিহ্য তাঁর চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।

ডেভিড সাদা চামড়ার সাহেব হতে চেয়েছিলেন, আর তার ফলেই ইসলামের মহান ঐতিহ্য ও শান্তির বাণী তার কাছে অধরা থেকে যায়। মালিনীর মতে, ডেভিডের ভ্রমণকাহিনী আসলে আফ্রিকান আমেরিকান ও অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের মানুষদের স্বরূপ তুলে ধরতে অক্ষম।

আজ, একজন ঈমানদার মুসলমান হয়ে আমি বলতে পারি, ডেভিড আসলেই আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। দুনিয়াদারির নেশা চোখে থাকলে আমাদের সুমহান ইসলামী ঐতিহ্য কারোর নজরে কখনওই পড়বে না। আর সেটা যে কী ভয়ানক ক্ষতি, তা বোঝার ক্ষমতা সকল মানুষের নেই। আল্লাহ রসুল ঠিক এই কারণেই আমাদের দুনিয়াদারি থেকে সামলে থাকতে বলেছেন।

ডেভিড নিজের পূর্বপুরুষের ইতিহাস বিস্মৃত হয়েছিলেন, আমরা যেন সেই পথে কখনওই না হাঁটি। আমিন।