ঢাকার প্রথম মসজিদ কোনটি?

lalbagh fort bangladesh
People visit mausoleum of Bibipari in Lalbagh fort in Dhaka, Bangladesh.ID 59839549 © Dmitry Chulov | Dreamstime.com

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে মসজিদের শহর বলেও আখ্যায়িত করা হয়। মুসলিম অধ্যুষিত এ শহরে শুধু মুসলমানদের সংখ্যা বাড়ছে তা না, তার সাথে প্রয়োজন অনুসারে বেড়ে চলেছে মসজিদের সংখ্যা। মুসলমানরা এই অঞ্চলে প্রবেশের পর থেকেই মসজিদ নির্মাণে মনোযোগ দেয়। ১৮৩২ সালে ঢাকার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট জর্জ হেনরি ওয়াল্টার এক রিপোর্টে উল্লেখ করেন, তৎকালীন ঢাকায় মসজিদের সংখ্যা ছিল ১৫৩টি। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশের হিসাব অনুসারে ঢাকায় ১০ হাজার মসজিদ আছে। (দৈনিক ইত্তেফাক, ৭ ডিসেম্বর ’১৪)। মোগল আমল থেকেই ঢাকা মসজিদের শহরে পরিণত হয়। এরই সাক্ষ্য বহন করে এখনো দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক মোগল মসজিদ। এমনকি সুলতানি আমলের একাধিক মসজিদও এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে বিনত বিবির মসজিদ (স্থাপিত : ১৪৩৫ খ্রিস্টাব্দ), চকবাজার শাহি মসজিদ (স্থাপিত : ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দ), বেগমবাজার মসজিদ (স্থাপিত : ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দ), তারা মসজিদ (স্থাপিত : ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ), মুসা খাঁর মসজিদ (স্থাপিত : ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে) অন্যতম।

কিন্তু ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীনতম মসজিদ কোনটি? পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঢাকার পুরানো অংশে দুটি এবং মিরপুরে একটি প্রাচীন মসজিদ রয়েছে যা মোঘল পূর্ব যুগের। জাতীয় মসজিদখ্যাত’ ‘বায়তুল মোকাররম’ আধুনিক ঢাকার কেন্দ্রস্থলে নির্মিত হয় ২৬ ডিসেম্বর ১৯৬২। বিভিন্ন দিক বিবেচনায় ‘বিনত বিবির মসজিদ’ ঢাকার প্রাচীনতম মসজিদ। পুরান ঢাকার ৬ নম্বর নারিন্দা রোডের সুপ্রাচীন ‘হায়াৎ বেপারীর পুলের উত্তর দিকে ‘বিনত বিবির মসজিদ’ অবস্থিত। মুনতাসীর মামুন রচিত ‘ঢাকা : স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ (তৃতীয় সংস্করণ, জানুয়ারি, ২০০৪)

বিনত বিবির মসজিদই ঢাকার সবচেয়ে পুরনো মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শন ও শহরের প্রথম মসজিদ। চারকোনা বিশিষ্ট ছয়-সাত কাঠা জায়গার উপরে মসজিদটির আদি কাঠামোতে একটি মাত্র গম্বুজ ছিল। বাংলা ১৩৩৭ (১৯৩০ খ্রি.) সনে দ্বিতীয়বার সংস্কার কালে আরও একটি গম্বুজ যুক্ত করা হয়, যা মসজিদটির সম্প্রসারণ এবং বিবরণের স্পষ্ট ধারণা দেয়। সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহর আমলে আরকান আলী নামক এক পারস্য সওদাগর ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ঢাকার নারিন্দায় বসবাস শুরু করেন এবং তিনিই ৩০-৪০ জন মুসল্লির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বিনত বিবির মসজিদটি নির্মাণ করেন।মসজিদের দেয়ালে স্থাপিত একটি কালো পাথরে ফারসি ভাষায় এই বর্ণনাটি রয়েছে।ঢাকায় থাকা অবস্থায় আরকান আলীর আদরের কন্যা বিনত বিবির হঠাৎ মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরে তাকে ওই মসজিদ সংলগ্ন স্থানে কবর দেয়া হয়। কন্যার আকস্মিক মৃত্যুর শোকে-দুঃখে পিতা আরকান আলীও ছয় মাস পর মৃত্যুবরণ করলে তাঁকেও কন্যার পাশেই ওই মসজিদসংলগ্ন স্থানে সমাহিত করা হয়। অন্য একটি বর্ণনা মতে, মাহরামাতের কন্যা মুসাম্মাৎ বখত বিনত বিবি মসজিদটি নির্মাণ করান।অন্য একটি বর্ণনা মতে মাহরামাতের কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি মসজিদটি নির্মাণ করান।

যদিও ধরে নেয়া হয় যে ঢাকার প্রথম মসজিদ বিনত বিবির মসজিদ, কিন্তু এর আগে যে ঢাকায় কোন মসজিদ নির্মাণ হয়নি তা বলাটা বেশ কঠিন। কেন না বাংলার সুলতানরা মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন—এটা ইতিহাসসিদ্ধ কথা। তাই সে আমলে অনেক প্রাচীন মসজিদ যে নির্মিত হয়েছিল, এটা অস্বীকার করা যায় না। তবে হ্যাঁ, হয়তো কাঠামোগতভাবে সেগুলো এখন আর টিকে নেই। সম্প্রতি এমনও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে যে হিজরী প্রথম শতাব্দীতে বাংলাদেশ মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। এর আলোকে আমরা এ কথাও বলতে পারি যে হয়তো ঢাকার কোন এক স্থানে হিজরী প্রথম শতাব্দীতে কোন এক স্থানে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। এ যুক্তি ছাড়া আরো যুক্তি আছে যে বিনত বিবির মসজিদকে ঢাকার প্রাচীনতম মসজিদ নির্ভুলভাবে বলে দেওয়া কঠিন। ড. আব্দুল করিমের ‘মোগল রাজধানী ঢাকা’ বই ও আরো অনেকের মতে, ঢাকার মুগদার মাণ্ডা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ‘মাণ্ডা মসজিদ’-এর চেয়েও প্রাচীন মসজিদ। শিলালিপি অনুযায়ী ‘মাণ্ডা মসজিদ’ ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে নির্মিত। ঐতিহাসিক ‘মাণ্ডা মসজিদ’ বর্তমানে ‘নান্দু ব্যাপারী মসজিদ’ নামে পরিচিত।