ঢাকায় রিক্সা চালিয়ে ময়মনসিংহে হাসপাতাল গড়েছেন ষাটোর্ধ্ব জয়নাল চাচা

rickshaw puller
ID 65129499 © Mandy Pirch | Dreamstime.com

কোনও কোনও মানুষের জীবনের গল্পটা বোধহয় আর পাঁচটা ‘সাধারণ’ মানুষের মতো হয় না। বলতে পারি জীবনকে দেখার এবং জীবনকে উপলব্ধি করার মতো দক্ষতাই তাঁদের আলাদা হয়, সাধারণের ভিড়েও তারা ক্রমেই অসাধারণ হয়ে ওঠে…

আজকের এই লেখাতেও আমরা এমন একজন সাধারণ মানুষের কথা আমরা বলব, যিনি সত্যিই সাধারণের ভিড়ে থেকেও, শুধুমাত্র মনের জোরে, নিজের ইচ্ছার জোরে আজ ‘অসাধারণ’ হয়ে উঠেছেন।

আজ আমরা জয়নাল আবেদিনের কথা বলব। পেশায় রিক্সাচালক জয়নাল আবেদিন সকলের প্রিয় জয়নাল চাচা… সকলের প্রিয় মানুষ হয়ে ওঠার পিছনে অবশ্যই রয়েছে তাঁর সহানুভূতি সম্পন্ন মানবিক হৃদয়। তাঁর কাজের পরিধি অবশ্যই কুর্নিশযোগ্য।

ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ১৫ কিমি দূরে প্রত্যন্ত হাঁসাদিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম… আজ থেকে প্রায় ৪৩ বছর আগের ঘটনা। জয়নাল আবেদিনের বৃদ্ধ পিতা আবদুল গনির চিকিৎসাহীন মৃত্যু তাঁকে গভীর এক প্রশ্নের মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়। হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে উৎসাহিত করে। সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে প্রাণপণ আত্মনিয়োগে তিনি ওই দিন শপথ নিয়েছিলেন। অর্থবল না থাকলেও, তার ছিল মনোবল। নিজের প্রতি একধরনের আত্মবিশ্বাস।

অভাবের সংসারে তাঁর কোনোদিনই লেখাপড়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। অনেক ভেবে নিজ মনে শপথ নেন ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালিয়ে হাসপাতাল করার মতো অর্থ নিয়ে আবার বাড়ি ফিরবেন। অন্যথায় আর কোনো দিন বাড়ি ফিরবেন না-এমনই দৃঢ় মনোবলকে সঙ্গী করেই কাউকে কিছু না বলে স্ত্রী ও শিশুকন্যা মমতাজকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন জয়নাল আবেদিন।  স্বপ্নকে সত্যি করতে তারপর শুরু হয় দীর্ঘ ২৮ বছরের সংগ্রাম। ২৮ বছর রিক্সা চালিয়ে জমানো পৌঁনে তিন লাখ টাকা নিয়ে ফিরে আসেন তার গ্রামের বাড়িতে।

২০০১ সালের এক শুক্রবার সকালে গ্রামের মানুষকে ডেকে বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য তাঁর স্বপ্নের মমতাজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা জানালে প্রাথমিক ভাবে গ্রামের সবাই তার কথা শুনে হাসাহাসি করেন। এমনকি তার পরিবারও, নিজের খুব কাছের আত্মীয়রাও।

সে সময় সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেও পাশের গ্রামের যুবক পল্লী চিকিৎসক মো. আলী হোসেন তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান। অনেক কষ্টে জমানো টাকায় ২৪ শতক জমি কিনে ২০০১ সালে ছোট একটি আধাপাকা টিনশেড ঘর তৈরি করে জয়নাল আবেদিন মেয়ের নামে চালু করলেন মমতাজ হাসপাতালের কার্যক্রম। যেখানে প্রতিদিন অসুস্থ মানুষদের বিনামূল্যে সকাল-বিকেল চিকিৎসা করা শুরু করেন পল্লী চিকিৎসক মো. আলী হোসেন। শুধু তাই নয়, রোগীদের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী বিনামূল্যে ওষুধও তুলে দেন জয়নাল আবেদিন।

সেই শুরু। ষাট বছর বয়সেও ঢাকায় গিয়ে রিক্সা চালাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। কষ্টার্জিত টাকা নিয়ে ফিরে আসতেন হাসপাতালের জন্য ওষুধ কেনার টাকা নিয়ে। সে সময় গড়ে প্রতিদিন গ্রামের দরিদ্র ৩০-৪০ জন মানুষ এ হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পেতে থাকে। এখন প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৩০ জন রোগী প্রতিদিন চিকিৎসা সেবা পেয়ে আসছে।

ছোট্ট হাসপাতালটিতে বর্তমানে ৬টি শয্যা রয়েছে। রয়েছে একটি ডিসপেনসারি। ডিসপেনসারিতে রয়েছে প্রয়োজনীয় ওষুধ সামগ্রী। এছাড়া ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে সহকারী অধ্যাপক ডা. হেফজুল বারী খান সপ্তাহে একদিন এই হাসপাতালে এসে বিনামূল্যে রোগী দেখেন।

শুধু চিকিৎসা সেবাই নয়, রিক্সা চালক জয়নাল দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার জন্য ২০০৭ সালে নির্মাণ করেন টান হাসাদিয়া বেসরকারি শিশু স্কুল। স্কুল প্রতিষ্ঠা নিয়েও আনিসুল হকের ফেসবুক লাইভে কথা বলেছেন তিনি। জয়নাল আবেদিন জানান, স্কুল সম্প্রতি সরকারি দায়িত্বে এসেছে। 

এইভাবেই একজন সাধারণ মানুষের জনকল্যাণমূলক কাজ তাঁকে অসাধারণ করে তোলে।