তথ্য-প্রযুক্তি সুরক্ষায় তাড়াহুড়ো করে প্রতিশোধ নয়, বিজ্ঞানীরা বললেন ধৈর্য্য রাখতে !

প্রযুক্তি ২৬ ফেব্রু. ২০২১ Contributor
ফোকাস
তথ্য-প্রযুক্তি
Photo by FLY:D on Unsplash

একবিংশ শতাব্দী ইন্টারনেট-কম্পিউটারের যুগ। ইন্টারনেটের বিশ্ব ব্যাপী বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রবল ভাবে দেখা দিয়েছে ইন্টারনেটে বিভিন্ন দেশ বা সংস্থার রাখা তথ্য চুরি এবং সেগুলোর অপব্যবহার। প্রধানতঃ কোনো ভাইরাস পাঠিয়ে প্রথমে কোনো নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটকে অকেজো করে সেখানকার তথ্য হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা। আর একবিংশ শতাব্দীতে সব থেকে দামী জিনিসটির নাম – তথ্য।

কোনো দেশের সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক হলে তৎক্ষণাৎ হ্যাকারদের খোঁজে লেগে যান সে দেশের কম্পিউটার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। আর এইসব ক্ষেত্রে প্রথমেই নিশানা করা হয় তথাকথিত শত্রু দেশকে। এম.আই.টি, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় এবং নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকরা তাদের নতুন গবেষণায় এই প্রবণতাকে সার্বিকভাবে ক্ষতিকারক হিসেবে চিহ্নিত করলেন। তাদের এই নতুন মডেল প্রকাশিত হল American Political Science Review জার্নালে।

হ্যাকারদের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ পাল্টা পদক্ষেপের খারাপ দিক

হ্যাকাররা এখন এতটাই দক্ষ এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে পটু যে সবসময় তাদের খোঁজ পাওয়াও মুশকিল হয়। ওয়েবসাইটের একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা থাকে, তাকে বলা হয় আই.পি এড্রেস (IP address)। বর্তমানে হ্যাকার রা তাদের আই.পি এড্রেস লুকোতে ভীষণভাবে সক্ষম। যেমন ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় শীতকালীন অলিম্পিক্সের সময় রাশিয়ান হ্যাকাররা সে দেশের টেলিভিশন এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। কিন্তু হ্যাকাররা উত্তর কোরিয়ার আই.পি এড্রেস ব্যবহার করায় সেই সমস্যা মেটাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়।

এ ব্যাপারে আমেরিকার সহকারী নিরাপত্তা সচিব একদা বলেছিলেন, “একটা মিসাইল তার সাথে করে প্রেরকের ঠিকানা বয়ে আনে, কিন্তু কম্পিউটার ভাইরাস তা আনে না। ” আর তাই হ্যাকারদের বা তাদের পাঠানো ভাইরাসের উৎসস্থল খোঁজা যেমন দুরূহ বিষয়, তেমনি সীমিত তথ্যের আধারে তৎক্ষণাৎ পাল্টা প্রতিক্রিয়া বেশি ক্ষতিকর। এই গবেষণার সাথে যুক্ত এম.আই.টি এর অর্থনীতিবিদ আলেকজান্ডার উলিজকি এর কথায়, “প্রত্যেক বার ইন্টারনেটে হামলা হলে প্রথম থেকেই যদি রাশিয়া বা চীন কে নিশানা করা হয়, তাহলে ইরান বা উত্তর কোরিয়া হামলা চালালেও পার পেয়ে যাবে। ”

গবেষকরা কী পরামর্শ দিলেন?

এই গবেষণাপত্রে বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক হ্যাকার দের আক্রমণ এবং তার বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের খতিয়ান তুলে ধরে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে দ্রুত পাল্টা পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিলই হয়েছে বেশি। উলিজকি যার জন্য বলেছেন, “প্রত্যেক বার কোনো ছোট্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক মনোভাব নেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ” তার বদলে হ্যাকারদের সম্পর্কে বেশি করে তথ্য সংগ্রহ করে তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হলে তবেই সেই নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবা যেতে পারে।

কিন্তু এই তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্তও সবসময় ভাল ফল দেয় না, বিশেষ করে সংগৃহিত তথ্যের ভিত্তিতে যদি পাল্টা আক্রমণের ব্যাপারটাকেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়। গবেষকদের মতে তাদের এই মডেল শুধু কম্পিউটার-ইন্টারনেটের সুরক্ষার ক্ষেত্রে নয়, আরও অনেক বিষয়ে কার্যকরী হতে পারে। তেমন একটি বিষয় হল দূষণ। ধরা যাক, একটি নদীতে অনেকগুলি কারখানা থেকে বর্জ্য ফেলা হয়।

সেক্ষেত্রে যদি তাদের মধ্যে কোনো একটির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হয়, তাহলে বাকিরা নিজেদের মত দূষণ চালিয়ে যেতে উৎসাহই পাবে। গবেষকরা আশা করছেন যে তাদের এই গবেষণাপত্রটি বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে আলোচনার নতুন দিক খুলে দিতে পারে, যেহেতু এইমুহূর্তে কোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি অনেকটায় কম্পিউটার-ইন্টারনেটের সুরক্ষার সাথে জড়িত।