তালাকের পর সন্তান কার দায়িত্বে থাকবে?

পরিবার Contributor
মতামত
তালাকের পর সন্তান
© Oleksandr Shpak | Dreamstime.com

সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিকতার অবনতি ও দায়িত্বহীনতার বিষাক্ত ছোবলে প্রতিনিয়ত ভাঙছে অসংখ্য সুখের সংসার। হচ্ছে অহরহ বিবাহবিচ্ছেদ। সৃষ্টি হচ্ছে নানান সাংসারিক জটিলতা। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তালাকের পর সন্তান-এর দায়িত্ব।

এরকম সম্পর্কের টানাপোড়ান আরও বেশি কঠিন হয়ে যায় যখন দম্পতির দুগ্ধপোষ্য শিশুসন্তান থাকে। তালাকের পর কখনও পিতামাতার মধ্যে শুরু হয় সন্তান নিয়ে টানাহেঁচড়া। উভয়ে শিশুকে নিজের কাছে রাখতে দ্বারস্থ হন আদালতের নিকট। কখনও বা পিতা কিংবা মাতা কেউই নিতে চান না শিশুর দায়িত্ব। এই অবস্থায় তৃতীয় পক্ষের হাতে তুলে দিতে হয় সন্তান লালনপালনের এই গুরুদায়িত্ব। কিন্তু এ ব্যাপারে ইসলামের বিধান কি তা আমাদের অনেকেরই অজানা।

এই নিবন্ধে এ সম্পর্কেই সংক্ষেপে আলোকপাত করা হবে। এখানে আলোচ্য বিষয় হল দুটি। একটি হলো সন্তানের অধিকার সংক্রান্ত এবং আরেকটি হলো সন্তানের লালনপালন সংক্রান্ত। এই দুটিই একটি অপরটির সাথে সংশ্লিষ্ট।

সন্তানের ওপর পিতার অধিকার 

সন্তানের জন্ম যদিও মায়ের গর্ভে, কিন্তু ইসলামি শরিয়াহর বিধানমতে সন্তানের বংশ সাব্যস্ত হয় পিতার দিক থেকে। এ কারণে তার ওপর পিতার কর্তৃত্ব ও অধিকারই কার্যকর হয়। কুরআনের আয়াতও এদিকে ইঙ্গিত করে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর সন্তানের অধিকারী অর্থাৎ, পিতার উপর হলো সেই সমস্ত নারীর খোরপোষের দায়িত্ব, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী। (আল কুরআন-২: ২৩৩)

এখানে সরাসরি ‘পিতার উপর’ কথাটি না বলে ‘সন্তানের অধিকারীর উপর’ বলে পিতাকে সন্তানের অধিকারী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।

সুতরাং তালাকপ্রাপ্ত দম্পতির সন্তানের অধিকার ও কর্তৃত্বও সন্তানের পিতার উপর বর্তাবে। এছাড়া শরিয়াহর নির্দেশনা হল, যার উপর যার অধিকার ও কর্তৃত্ব বর্তাবে, সে-ই ভরণপোষণ ও ব্যয়ভার বহন করবে। অর্থাৎ, অধিকার ও দায়িত্ব পরস্পরের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। এ হিসেবে বিবাহবন্ধন বহাল থাকুক বা তালাক হয়ে যাক, সর্বাবস্থায় সন্তানের ভরণপোষণসহ যাবতীয় দায়দায়িত্ব পিতার উপর অর্পিত হবে।

তালাকের পর সন্তানকে দুধপান করানো মায়ের দায়িত্ব

পূর্ণ ২ বছর পর্যন্ত সন্তানকে দুধপান করানো মায়ের উপর ওয়াজিব। রোগ-ব্যাধি, অক্ষমতা বা শরিয়াহ সম্মত কোনো কারণ ছাড়া সন্তানকে দুধপান করাতে অস্বীকার করা কঠিন গুনাহ। যতক্ষণ পর্যন্ত শিশুর মা তার স্বামীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ থাকবে বা তালাকের পর ইদ্দত পালন করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সন্তানকে দুধপান করানো বাবদ বিনিময় গ্রহণ করাও জায়েজ নেই।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ খাওয়াবে, যদি তারা দুধ খাওয়ানোর মেয়াদ পূর্ণ করতে চায়।” (আল কুরআন-২: ২৩৩)

কিন্তু মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেলে মায়ের ওপর সন্তানকে দুধপান করানোর দায়িত্ব থাকে না। এই অবস্থায় মায়ের জন্য সন্তানকে দুধপান করানোর বিনিময় দাবি করাও জায়েজ এবং বিনিময় প্রদান করা সন্তানের পিতার দায়িত্ব।

ইসলামী শরিয়াহর মতে, স্ত্রী ব্যতীত অন্য কোনো নারী অর্থাৎ, দুধমায়ের মাধ্যমে সন্তানকে দুধ পান করালে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বিনিময় দেওয়া জায়েজ। তালাকপ্রাপ্তা নারী যদিও সন্তানের গর্ভধারিণী মা, কিন্তু বিবাহবিচ্ছেদের কারণে সে এখন আর তার প্রাক্তন স্বামীর স্ত্রী নয়, তাই তার জন্যও বিনিময় গ্রহণ জায়েজ।

তালাকের পর সন্তানের লালনপালন

ইসলামী শরিয়াহর আলোকে শিশুর মা যদি সুস্থ-সবল থাকে, তবে সন্তানের লালনপালনের যাবতীয় দায়িত্ব তার উপর অর্পিত হবে। এমনকি মাতাপিতার বিবাহবিচ্ছেদ হলেও সন্তানের মা ঐ সন্তানের যত্ন ও লালনপালনে অন্যদের চেয়ে বেশি হকদার। নবীজি সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের যুগেও বিবাহবিচ্ছেদের পরে এক দম্পতির মধ্যে সন্তান নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সন্তানের পিতা সন্তানের মায়ের কাছ থেকে সন্তানকে নিয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু মা চাইলেন সন্তানকে তার নিজের প্রতিপালনে রাখবেন। এ অবস্থায় ঐ মহিলা নবীজিকে সার্বিক অবস্থা জানালে নবীজি সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তানকে মায়ের প্রতিপালনে রাখার আদেশ দিলেন।

হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, “একদা এক মহিলা বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এই সন্তান আমার গর্ভজাত। সে আমার স্তনের দুধ পান করেছে এবং আমার কোলই তার আশ্রয়স্থল। তার পিতা এখন আমাকে তালাক দিয়েছে। এখন সে সন্তানটিকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যেতে চাইছে। একথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, তুমি অন্যত্র বিয়ে না করা পর্যন্ত তুমিই এই সন্তানের অধিক হকদার।” (আবু দাউদ)

এই হাদিসের শেষাংশে এই বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে যে, তালাকপ্রাপ্তা নারী অন্য কোথাও বিয়ে করার আগ পর্যন্ত সন্তান লালনপালনে অগ্রাধিকার পাবেন। কিন্তু অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেলে সন্তান লালনপালনে তার এই অধিকার বাতিল হয়ে যাবে।

তালাকের পর সন্তানের ভরণপোষণ

তালাকপ্রাপ্ত দম্পতির সন্তান যার কাছেই লালিতপালিত হোক না কেন, সন্তানের যাবতীয় ব্যয়ভার পিতাই বহন করবেন। শিশু যদি মায়ের কাছে লালিতপালিত হয়, তবু শিশুর খাদ্য, ওষুধপত্র, পোশাকসহ সার্বিক ব্যয় বহন করা পিতার উপর ওয়াজিব।