তিন দশক ধরে উন্মুক্ত ময়দানে বিনামূল্যে মানুষ গড়ছেন পাকিস্তানের মাস্টার আইয়ুব

open air classroom
ID 170566721 © Hecos255 | Dreamstime.com

প্রতিটি মানুষের জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম । জীবনে প্রতিটা ক্ষেত্রে সফলতা পেতে শিক্ষা ছাড়া আর কোনো গতি নেই। কিন্তু শিক্ষার ইচ্ছে পোষণ করলেও অনেকে শিক্ষিত হতে পারে না কারণ তাদের পড়াশোনা করার সামর্থ্য বা সুযোগ সবটাতেই তারা বঞ্চিত হয়ে পড়ে। 

পাকিস্তানের মোহাম্মদ আইয়ুব খানের জীবনের কাহিনীটাও এরকমই। তবে তিনি থেমে থাকেননি, প্রত্যেকটা পদে লড়েছেন। তাঁকে পাকিস্তান সহ গোটা বিশ্ব চেনে মাস্টার আইয়ুব নামে। ইসলামাবাদে খোলা আকাশের নীচে, বিস্তৃত পার্কে স্কুল চালান তিনি। গত ৩০ বছর ধরে চালাচ্ছেন। বিনা পারিশ্রমিকে। তাঁর স্কুলে আপাতত ২৫০ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। পড়ানো হয়, ইংরেজি, ঊর্দু, অংক সহ একাধিক বিষয়। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে ক্লাস। ভাবতে অবাক লাগে, এই স্কুল থেকে পড়াশোনা করে বহু দরিদ্র ছাত্রছাত্রী সরকারি বোর্ড এবং উচ্চশিক্ষার পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছে। অনেকে জুটিয়েছে ভালো মাইনের চাকরি। যা এ সমস্ত অভাবী পরিবারে কল্পনার অতীত। 

মাস্টার আইয়ুবের অসামান্য সাফল্যের জন্য পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘প্রাইড অফ পারফরম্যান্স’ সম্মানে ভূষিত করেছে। ২০১৮ সালে কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলির তরফে ‘পয়েন্ট অফ লাইট’ পুরস্কার তাঁর হাতে তুলে দেন কমনওয়েলথ রাষ্ট্রের প্রধান এবং ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ।

পুরস্কার হাতে নিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘বাচ্চারা যখন একসঙ্গে পড়াশোনা করে, সেই দৃশ্যটা আমার কাছে সবচেয়ে সুখকর। সমগ্র পাকিস্তানে আমি এরকম খোলা আকাশের নীচে মুক্ত পাঠশালা গড়তে চাই। যেখানে বিনামূল্যে আমরা সমাজের প্রান্তিক মানুষদের শিক্ষার আওতায় আনতে পারব। সে যে সম্প্রদায়ের হোক, মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান। আমাদের স্কুলের দরজা সকলের জন্য খোলা থাকবে।’

মোহাম্মদ আইয়ুবের বাবা হঠাৎ মারা যাওয়ার পর তাঁর পরিবারের ওপর নেমে আসে দুর্দশার ছায়া। দরিদ্রতা তাঁর পরিবারকে ক্রমশ গ্রাস করতে থাকে, এ হেন দুর্দশার ছাপ গিয়ে পড়ে তাঁর ও তাঁর ভাইবোনদের পড়াশোনায়। এই কঠিন পরিস্থিতিতে আইয়ুবকে তাঁর পরিবারের দায়িত্বভারও গ্রহণ করতে হয়।  তবুও তিনি প্রতিটা মুহুর্তে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন পড়াশোনার জন্য কঠিন বাস্তবের কাছে হার মানেননি। একটা সময় আসে, যখন তিনি বুঝেছিলেন জীবনে শিক্ষিত হওয়ার গুরুত্ব কতটা। তখনই তিনি মনে মনে নিজের কাছে এই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে আর যেন কোনো পরিবারের ছেলেরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।

প্রত্যেককে শিক্ষার জন্য সমান সুযোগ দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকেন তিনি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। ১৯৮৬ সালে তিনি তাঁর গ্রাম মান্ডি বাহাউদ্দিন ত্যাগ করেন এবং ইসলামাবাদে গিয়ে পৌঁছোন। সেখানে তিনি চাকরির খোঁজ করতে শুরু করেন জীবিকার তাগিদে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দমকলকর্মী হিসেবে একটা চাকরিতে যোগদান করেন। কিন্তু হঠাৎই ১৯৮৮ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে গোলবারুদ ডিপোতে বিস্ফোরণ হয় এবং এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ১৩০০ মানুষ প্রাণ হারায়।

এরকম একটা দুঃসহনীয় ঘটনার পর, তিনি পথে ঘাটে শিশুদের আবর্জনা সংগ্রহ করতে দেখতেন প্রতিদিন। এমনকি সেই ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের ভিক্ষা  করতেও দেখতেন আইয়ুব ,তার সাথে লক্ষ্য করেন কিছু জায়গায় অনেক ছেলেমেয়ে একসাথে মিলিত হত। তখন তাদের ওই কষ্ট তাঁকে নিজের ফেলে আসা স্মৃতিগুলো মনে করায়। তিনি ঠিক করেন ওই বাচ্চাদের  লেখা পড়া শেখাবেন।

সেই শুরু, তিনি চাকরি করে যে টাকা মাইনে পেতেন তা তিনটি ভাগে ভাগ করতেন, তার মধ্যে একটি অংশ স্কুলের পিছনে ব্যয় করতেন।  আর একটি পরিবারের কাজে। তারপর বাকি যা টাকা থাকে ওতে নিজের প্রয়োজনটুকু সামান্য মেটাতেন। এভাবে অদম্য প্রচেষ্টার ফলে তিনি ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতে শুরু করেন। তাঁর এই কাজ দেখে প্রথম প্রথম লোকজন তাকে সন্দেহ করত কিন্তু যখন তারা বাচ্চাদের মধ্যে উন্নতি দেখলেন তখন লোকজন নিজেদের বাচ্চাদেরও পড়াশোনা করতে সেখানে নিয়ে যেতে শুরু করলেন। এভাবেই তিনি ধীরে ধীরে তাঁর প্রচেষ্টাকে সফলতার দিকে নিয়ে যেতে শুরু করেছিলেন। 

বর্তমানে ৫৮ বছর বয়সী আইয়ুব মাস্টার তার দুই প্রবীণ ছাত্রের সহায়তায় ইসলামাবাদের এফ-৬ সেক্টরের মধ্যে একটা পাবলিক পার্কে স্কুল চালান। জায়গাটি পাকিস্তানের পার্লামেন্ট থেকে মাত্র দু-কিলোমিটার দূরে। আল জাজিরাকে দেওয়া একটি সাক্ষাতকারে বলেন, তিনি একাই শহরে বাস করেন, পুরো পরিবার গ্রামে থাকায় অবসর সময় তিনি এমনভাবে কাটাতে চান যাতে নিজেকে অন্যের কাজে লাগাতে পারেন।

আইয়ুব খানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত থেকে আমরা আশা করতে পরি, জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পার হয়েও অন্যের জন্য কিছু করার তাগিদ মানুষের চিন্তাধারাকে উন্নত করবে, তাকে স্বার্থ ভুলে অন্যের জন্য বাঁচতে শেখাবে।