তুরস্কের পাহাড়চূড়োয় মেঘমূলুকের মসজিদ

mountain and mosque dome

তুরস্কর ব্ল্যাক সি প্রদেশের রেজা অঞ্চলের গনি সো জেলার রয়েছে ১১৩০ মিটার উঁচু এক পাহাড়। স্থানীয়রা এই পাহাড়ের নাম দিয়েছেন ‘কিবলা’, ইসলামের কিববলা  শব্দটি থেকে নামটির উৎপত্তি। মক্কার কাবা পাথরের দিকটিকে কোর-আনে কিববলা বলা হয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা প্রতিদিন সেইদিকেই মুখ করে নমাজ পড়েন। পাহাড়টির নাম কিবলা দেওয়ার কারণ মূল শৈলশিরাটা মক্কামুখী, আর রেজা অঞ্চলের বাকি জেলা থেকেও পাহাড়ের চূড়াটি দেখা যায়। আর চূড়ার উপর মুকুট সদৃশ একটি মসজিদ রয়েছে, যে মসজিদ নিয়ে রেজা অঞ্চলের মানুষের গর্বের শেষ নেই। 

মসজিদটি প্রথম স্থাপিত হয় উনবিংশ শতাব্দীতে। মোসুলা মেহমত এফেন্দি ও কুস আহমেদ এফেন্দি নামক দুই ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাই-এর পরিকল্পনায় স্থাপিত হয় এই কিবলা মসজিদ। প্রথম স্থাপত্যটি পুরোটাই কাঠের বানানো হয়েছিল। মসজিদে গায়ে ছিল অনবদ্য কারকার্য্য। কিন্তু ১৯৬০ সালে এক বিধ্বংসী আগুনে সম্পূর্ন মসজিদ ধ্বংস হয়ে যায়। তারপর ইউসুফ ইয়ালমাজ হোকায়েফেন্দির তত্ত্বাবধানে একটি সাধারণ কংক্রিটের মসজিদ বানানো হয়। 

২০১০-এ মসজিদটি বিশেষ ভাবে নজর পড়ে তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েপ এরদোগানের। এই অঞ্চলে তাঁর ছোটবেলা কেটেছে। তিনি নিজে মসজিদটি দেখতে যান এবং স্থানীয় অধিবাসীদের সেটিকে সারিয়ে তুলতে ও আরও বিস্তৃত করতে বলেন। ২০১৩ সালে স্থানীয় এক শিল্পপতির অনুদানেই কাজ শুরু হয়। 

বর্তমান কিবলা জামে মসজিদটি ইস্তানবুলের ইউস্কিউদার অঞ্চলের ঐতিহাসিক সেমাইসি আহমেত পাশা মসজিদের আদলে তৈরি। 

বর্তমান স্থপতি ইউসুফ ইয়ালমাজের বক্তব্য থেকে জানা যায়, মসজিদটির ৭০ বর্গমিটার জায়গা পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট। ৪৫ বর্গমিটার জায়গা সীমাবদ্ধ নারীদের উপাসনার জন্য। মসজিদের পোর্টিকোর আয়তন ১৩৫ বর্গমিটার। মসজিদের ভিতরে মোট ২০০ জন মানুষ একসঙ্গে উপাসনা করতে পারেন। মসজিদের চারপাশের খোলা জায়গায় প্রায় ১০০০ জন মানুষ একসঙ্গে উপাসনা করতে পারেন। 

মসজিদের গোলাকৃতি ছাদ প্রায় ১৩ মিটার উঁচু , এবং মিনারেটগুলোর উচ্চতা ২৭ মিটার করে। ইমামের বাসস্থানের আয়তম ৮৫ বর্গমিটার। 

নারীদের উপাসনাগৃহের সঙ্গে ডে-কেয়ার ও সন্তানকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া দর্শনীয় স্থান, পথশ্রমে শ্রান্ত হলে বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা, ক্যাফে সবেরই ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এটিকে মসজিদের সঙ্গে-সঙ্গে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবেও গড়ে তুলেছেন।

এরদোগান নিজে ব্যক্তিগতভাবে এই মসজিদের নবীকরণের তত্ত্বাবধান করেছেন কারণ তিনি খুব তাড়াতাড়ি এই মসজিদটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দিতে চেয়েছিলেন। একবার তিন জন শ্রমিক দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার জন্য পাহাড়ের চূড়ায় আটকে পড়ে। হেলিকপটার পাঠিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়। নবীকরণের প্রাথমিক ধাপ ছিল অঞ্চলটিতে অজস্র বৃক্ষরোপণ, তার ফলেই এখন হেলিকপ্টার থেকে ছবি তুললে মনে হয় সবুজ গালিচার মধ্যে মসজিদটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। মসজিদের পুরো আঙিনা ঘিরে রয়েছে সবুজে ছাওয়া শ্যামল প্রকৃতি। মসজিদ প্রাঙ্গনে বসে বুনো প্রকৃতির সতেজ আমেজ পাওয়া যায় সহজেই। মাঝে মাঝে নেমে আসা মেঘের ভেলা আনন্দ ছড়িয়ে দেয়, ছোট-বড় সবার মন-মানসে। তাই কিবলা জামে মসজিদের অপর নাম ‘মেঘমূলুকের মসজিদ’।
চোখ জুড়ানো ও মনোরম এ মসজিদ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। মসজিদের সামনে ওজু করার জন্য একটি কৃত্রিম গরম জলের প্রস্রবণ রয়েছে। 

কথিত আছে, মসজিদের সবচেয়ে উঁচু মিনারটি রাত্রিবেলা আলোকিত থাকে। দূর দূরান্ত থেকে সেই আলো দেখা যায়। ঠিক যেন মনে হয়, আকাশের চাঁদ নেমে এসেছে মসজিদের বুকে। 

আল্লাহ আমাদের জন্য দুনিয়া জুড়ে নানা মণিমুক্তো ছড়িয়ে রেখেছেন, কিবলা জামে মসজিদ সেই মণিমুক্তোর অন্যতম একটি।