তুর্কি দম্পতির করোনা ভাইরাস প্রতিষেধক টিকা বদলে দিতে পারে পৃথিবীর ভাগ্য

coronavirus vaccine discovered byturkish couple

প্রথম কার্যকর কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কার নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা চলছে এই রোগের প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই। এখনও বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিনের শেষ পর্যায়ের ট্রায়াল চলছে। এগুলির মধ্যে এখনও পর্যন্ত যে ভ্যাকসিনটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে, সেটি আবিষ্কারের পিছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে এক মুসলিম দম্পতির। তাঁরা দুজনেই ফিজিশিয়ান, এবং দুজনেরই এই গবেষণার পিছনে যথেষ্ট অবদান রয়েছে।

৫৫ বছর বয়সী উগুর সাহিন হলেন জার্মান বায়োটেক ফার্ম বায়োএনটেকের চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার তথা প্রতিষ্ঠাতা এবং তাঁর স্ত্রী ওজলেম তুয়েরেসি (৫৩)হলেন এই ফার্মেরই চিফ মেডিক্যাল অফিসার তথা সহ-প্রতিষ্ঠাতা।

এই দম্পতি ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপি নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যে এই সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁদের এই ফার্মে যে সংস্থাগুলি কয়েক মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন।

বিশ্ব খুঁজছে প্রতিষেধক

গত সোমবার, বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা ফাইজার ঘোষণা করেছে যে, তারা বায়োএনটেকের সাথে হাত মিলিয়ে যে ভ্যাকসিন তৈরি করেছে, তা করোনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত ৯০ শতাংশ কার্যকর বলে ট্রায়ালে দেখা গিয়েছে। ট্রায়াল এখন শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং শীঘ্রই এর কার্যকারিতা সম্পর্কে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা সম্ভব বলেও আশাবাদী এই সংস্থা।

গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে কোভিড-১৯ ভাইরাসের আতঙ্ক ধীরে ধীরে গোটা বিশ্বকে কাবু করে ফেলেছে। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিস প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোলের পরিসংখ্যান অনুসারে, এই এক বছরেরও কম সময়ে গোটা পৃথিবীতে ৫১,৫৫২,৮৭৫ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে ১,২৭৪,৩১১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে একটি রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে এমন একটি আশাব্যঞ্জক ঘোষণা নিঃসন্দেহে সারা বিশ্বে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে,। এমনকী যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন জানিয়েছেন, তাঁর সরকার এই ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন করার নির্দেশ দিয়েছে। মূল লক্ষ্য হল, গোটা যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ যাতে প্রথম দফায় ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে পারে, তার জন্য পর্যাপ্ত বন্দোবস্ত করা।

আমেরিকান ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা ফাইজার-এর তরফে জানানো হয়েছে, বছর শেষ হওয়ার আগেই তারা প্রাথমিক ভাবে ৫০ মিলিয়ন ভ্যাকসিন ডোজ প্রস্তুত করার লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেছে।

টিকা তৈরির কঠিন যাত্রা

২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে যখন কোভিড-১৯ ভাইরাস ধীরে ধীরে গোটা পৃথিবীতে থাবা বসাতে শুরু করেছিল, তখন থেকেই ডাঃ সাহিন প্রায় ৫০০ জন গবেষকের দল গঠন করে এই রোগের প্রতিষেধক টিকা বা ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। তার দুই মাস পরে অর্থাৎ মার্চ মাসের মধ্যেই, তাঁদের এই প্রতিষেধক তৈরির উদ্যোগ বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা ফাইজার এবং চিনের ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা ফোসুনের সমর্থন অর্জন করেছিল।

ডাঃ সাহিনের সংস্থার মূল্য এখন প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি – তবুও তিনি রোজ অফিসে আসেন একটি বাইকে চড়ে। অর্থ ও প্রতিপত্তি যথেষ্ট পরিমাণে অর্জন করা সত্ত্বেও এই দম্পতি এখনও সাধারণ জীবনযাপন করতেই পছন্দ করেন বলে জানা গিয়েছে।

ডাঃ সাহিন তুরস্কে জন্মগ্রহণ করলেও মাত্র চার বছর বয়সে তাঁকে নিয়ে তাঁর বাবা-মা জার্মানিতে চলে আসেন। ফলে তাঁর পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠা পুরোটাই জার্মানিতে। কারণ তাঁর বাবা-মা দুজনেই জার্মানিতে কাজ করতেন। ১৯৯০ সালে কোলন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি মেডিসিন নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি পিএইচডি সম্পূর্ণ করেন।

দম্পতির মেধা

জার্মানির কোলন শহরে কর্মরত থাকাকালীন ইমিউনোলজিস্ট ওজলেম তুয়েরেসির সাথে ডাঃ সাহিনের প্রথম মোলাকাত হয়। দুজনেরই আগ্রহের বিষয় ছিল মেডিক্যাল রিসার্চ এবং অঙ্কোলজি। ২০০২ সালে তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের এক কন্যাসন্তান রয়েছে।

ওজলেমের জন্ম জার্মানিতে বসবাসকারী এক তুর্কি পরিবারে। তিনি সারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ডিপার্টমেন্ট থেকে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বায়োএনটেকের চিফ মেডিক্যাল অফিসার তথা সহ-প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার পাশাপাশি তিনি অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপি (CIMT) –এর প্রেসিডেন্ট। তুয়েরেসিকে ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপির পথিকৃৎ বলে মনে করা হয়। এর পাশাপাশি তিনি মাইনজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন খ্যাতনামা লেকচারার।

জার্মান পত্রিকা ওয়েল্ট আম সোনটাগের মতে, শীর্ষ ১০০ জন ধনী জার্মানের তালিকায় এই দম্পতির নাম রয়েছে। তবুও মাইনজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ম্যাথিয়াস থিওবল্ড, যিনি প্রায় ২০ বছর ধরে ডাঃ সাহিনের সহকর্মী, তাঁর কথায়, ডাঃ সাহিন হলেন একজন প্রকৃত “বিনয়ী” মানুষ এবং এখনও তিনি সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত।

অর্থ, যশ, প্রতিপত্তির অধিকারী হলেও ডাঃ সাহিন এখনও মাটির কাছাকাছি একজন মানুষ। ২০১৯ সালে ডাঃ সাহিন মুস্তাফা প্রাইজ (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের অবদান রাখা মুসলিমদের জন্য দ্বিবার্ষিকী ইরানি পুরস্কার) পেয়েছিলেন।