তোমরা সকলেই পথভ্রষ্ট, শুধুমাত্র সে ছাড়া যাকে আমি হেদায়াত দান করি: হাদিসে কুদসী কী?

dreamstime_s_180643118

(১ম পর্ব)

আল্লাহ তা’আলার যেই কথাগুলি কুরআনের আয়াত হিসেবে নাযিল হয়নি বরং, আল্লাহ তা’আলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কে স্বপ্নের মাধ্যমে অথবা তাঁর অন্তরে ইলহামের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন, আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সেই কথাগুলি আল্লাহর পক্ষ থেকে নিজ ভাষায় তাঁর উম্মতকে জানিয়েছেন, সেই হাদিসগুলিকে হাদিসে কুদসী বলা হয়।

হাদিসে কুদসী চেনার উপায়

যেহেতু এই হাদিসগুলি সরাসরি আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত, তাই এগুলিকে হাদিসে কুদসী নামকরণ করা হয়। হাদিসে কুদসীর কথাগুলো আল্লাহর, কিন্তু তা বর্ণনা করেছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে। অপরদিকে, কুরআনের আয়াতগুলির কথা এবং ভাষা সবই স্বয়ং আল্লাহর।

হাদিসে কুদসী চেনার উপায় হচ্ছে, এই হাদীসগুলিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম “আল্লাহ তা’আলা বলেছেন” এই কথাটি যুক্ত করেন।

আজকের আলোচনায় আমরা একটি বিখ্যাত হাদিসে কুদসী নিয়ে আলোচনা করব। হাদিসটি নিম্নরুপঃ

আল্লাহ বলেন, “হে আমার বান্দাগণ, আমি নিজের জন্য জুলুমকে হারাম করেছি এবং তোমাদের জন্যও তা হারাম করেছি, সুতরাং তোমরা একে-অন্যের উপর জুলুম করো না। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা সকলেই পথভ্রষ্ট, শুধুমাত্র সে ছাড়া যাকে আমি হেদায়াত দান করি, সুতরাং তোমরা আমার কাছে হেদায়াতের সন্ধান করো। হে আমার বান্দাগণ, আমি যা খাওয়াই সে ব্যতীত তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত, সুতরাং  তোমরা আমার কাছে খাবার চাও; তাহলে আমি তোমাদের খাওয়াবো।

হে আমার বান্দাগণ, আমি যাকে পোশাক পরিয়েছি সে ব্যতীত তোমরা সকলেই নগ্ন, সুতরাং তোমরা আমার নিকট পোশাক চাও। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা রাত্রি ও দিনে যত গুনাহ করো, আমিই সে সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে থাকি। সুতরাং তোমরা আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; তাহলে আমি ক্ষমা করে দেব।

হে আমার বান্দাগণ, তোমরা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এবং কোনো উপকারও করতে পারবে না। হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল মানুষ ও জ্বিন যদি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ধার্মিক ব্যক্তির মত হয়ে যায় তবে তা আমার রাজত্বকে সামান্য পরিমাণও বাড়াতে পারবে না। হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল মানুষ ও জ্বিন যদি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তির মত হয়ে যায় তবে তাও আমার রাজত্বকে সামান্য পরিমাণও কমাতে পারবে না।

হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল মানুষ ও জ্বিন যদি একটি ময়দানে জমা হয় আর আমার নিকট তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী চায় আর আমি তাদেরকে সব দিয়ে দিই তবে তা আমার রাজত্বে ততটুকুও হ্রাস করবে না যতটুকু সমুদ্রের মধ্যে একটি সূঁচ ডুবালে সমুদ্রের পানি হ্রাস পায়।” (মুসলিম)

আলোচ্য হাদিসে আল্লাহ তা’আলা মানুষকে পরস্পরের প্রতি জুলুম করতে নিষেধ করেছেন এবং জুলুম যে কতটা নিকৃষ্ট তা বোঝাতে তিনি নিজের জন্যও জুলুম হারাম ঘোষণা দিয়েছেন। অথচ আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনি জুলুম করতে চাইলে তা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কোনো সৃষ্টির নেই। মুমিনের জন্য এ কথার উপর দৃঢ় বিশ্বাস আনা আবশ্যক যে, আল্লাহ কারও প্রতি নূন্যতম জুলুম করেন না।

জুলুমের ভয়াবহতা সম্পর্কে মহানবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন ভীষণ অন্ধকারে পরিণত হবে।”

আল্লাহ কারও প্রতি জুলুম করেন না

পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ কোনো সৃষ্টির প্রতি জুলুম করেন না। কেননা জুলুম ও  ন্যায়পরায়ণতা পরস্পর বিপরীত। যা মহান আল্লাহর শানের খেলাফ। আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতার দাবি হলো তিনি জুলুম থেকে অমুখাপেক্ষী। তাঁর কোনো ইচ্ছা পূরণের জন্য জুলুম করার প্রয়োজন হয় না। কেননা আল্লাহর ইচ্ছা অপ্রতিরোধ্য ও অনিবার্য। সুতরাং, আল্লাহ কারও প্রতি নূন্যতম জুলুম করেন না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “আমি বান্দাদের উপর নূন্যতম জুলুম করি না।” (১৮:২৯)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ বিশ্বজগতের প্রতি কোনো জুলুম করতে চান না।” (৩:১০৮)

পরস্পরের প্রতি জুলুম হারাম

আল্লাহ শুধু নিজের উপরই জুলুম হারাম করেননি; বরং বান্দার জন্যও পরস্পরের উপর জুলুম হারাম করেছেন। যেমনটি আলোচ্য হাদিসে উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “ঐ সকল জনপদ ও তাদের অধিবাসীদের আমি ধ্বংস করেছিলাম, যখন তারা জুলুম করেছিল।” (১৮:৫৯)

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গুনাহ ও জুলুম হলো এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম।”

(চলবে)