ত্বক ও চুলের জেল্লা বাড়ায় আখরোট

স্বাস্থ্য ০৫ ফেব্রু. ২০২১ Contributor
ফিচার
ত্বক ও চুলের জেল্লা
Photo by Karolina Grabowska from Pexels

বয়স যতই বাড়ুক না কেন, জেল্লাদার ত্বক আর সুন্দর ঘন চুল কে না চায়! কিন্তু দূষণ, ধুলোবালি থেকে শুরু করে স্ট্রেস, দুশ্চিন্তা আপনার চুল, ত্বককে একেবারে জেল্লাহীন করে ফেলতে পারে। মানসিক চাপ সরাসরি প্রভাব ফেলে মুখের ত্বকে, আর অতিরিক্ত স্ট্রেসে চুল যে পড়ে যে মাথা ফাঁকা হয়ে যেতে শুরু করে, সে খবরও আপনাদের অজানা নয়! তাই চুল এবং ত্বকের নিয়মিত যত্ন নেওয়া জরুরি। কাজের ব্যস্ততার চাপে বা করোনার ভয়ে যদি পার্লারে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, বা আর্টিফিশিয়াল প্রোডাক্ট যদি চুলে, ত্বকে লাগাতে না চান, তাহলে আখরোট ব্যবহার করে ঘরে বসেই পেয়ে যেতে পারেন চটজলদি সমাধান। আপনার ত্বক ও চুলের  জেল্লা ফিরিয়ে দিতে আখরোটের কিন্তু জুড়ি নেই।

সুলতান-বাদশাদের প্রিয় আখরোট

আখরোটের বৈজ্ঞানিক নাম জাগলানস রেজিয়া। প্রাচীনকালে আখরোট ছিল খুব জনপ্রিয় বাদাম এবং সুলতান-বাদশাদের অত্যন্ত প্রিয়। বাইজান্টাইন সভ্যতায় আখরোটের পরিচিতি ছিল ‘রাজকীয় বাদাম’ নামে। দ্বাদশ শতকে আরবি কৃষিবিদ ইবন-আল-আওয়ামের লেখায় স্পেনে আখরোট চাষের সন্ধান মেলে। বর্তমানে চিন, আমেরিকা, ইরান, তুরস্কে আখরোট চাষ হয়।

ত্বক ও চুলের জেল্লা ও আখরোটের ব্যবহার ?

খোসা ছাড়া আখরোটে থাকে ৪% জল, ১৫% প্রোটিন, ৬৫% ফ্যাট এবং ১৪% কার্বোহাইড্রেট। ভিটামিন বি১, বি২, বি৩, বি৫, বি৬, ফোলেট, ভিটামিন ই-এর পাশাপাশি ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, জিঙ্ক ইত্যাদি খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ এই বাদাম। এইসব কারণে আখরোটকে প্রাচীনকাল থেকে রূপচর্চার কাজে ব্যবহার করা হয়ে আসছে।ত্বক ও চুলের জেল্লা আনতে তাই আখরোটকে বেছে নেওয়া হয়েছে অনেক আগে থেকেই।

আখরোট বুড়িয়ে যাওয়া ত্বককে খুব দ্রুত মসৃণ করে, চুলের গোড়া শক্ত করতে কাজে লাগে আখরোটের তেল। আখরোট বাদাম খাওয়ার পাশাপাশি ত্বক ও চুলের যত্নে কীভাবে কাজে লাগাবেন, সেই নিয়ে আমরা আজ আলোচনা করব।

ত্বকের যত্নে আখরোট

ত্বককে এক্সফোলিয়েট করতে

রাস্তায় যাদের বেরতে হয়, তাঁদের ত্বকে ধুলোময়লা জমতে-জমতে ত্বক জেল্লা হারিয়ে ফেলে। এছাড়া মৃত কোষ, তেল ইত্যাদিও ত্বককে নিষ্প্রভ করে দেয়। এর থেকে মুক্তি পেতে ব্যবহার করুন আখরোট। এতে থাকা ভিটামিন ই এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বকের যাবতীয় নোংরা, মৃত কোষ দূর করে। যাদের মুখ অতিরিক্ত তেলতেলে, তাঁরা আখরোটের গুঁড়ো দুধে দিয়ে পেস্ট তৈরি করে তা দিয়ে মুখ স্ক্রাব করতে পারেন, উপকার পাবেন।

আখরোট ত্বকের ইনফেকশন সারিয়ে তোলে

ব্রণর সমস্যায় যারা ভোগেন, তাঁরা স্কিনকেয়ার রুটিনে আখরোটকে রাখুন। আখরোটের অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান ত্বককে ইনফেকশন, ব্রণর হাত থেকে মুক্তি দেয়, এবং মুখকে উজ্জ্বল, দাগহীন করে তোলে। স্নান করার সময় আখরোট যুক্ত সাবান বা ফেসওয়াশ ব্যবহার করুন। এছাড়া আখরোটের ফেস মাস্ক বানিয়ে মুখে নিয়ম করে লাগান।

ত্বককে উজ্জ্বল করে

আখরোটে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই ও বি৫ থাকে, যা ত্বককে প্রাকৃতিকভাবে ভিতর থেকে উজ্জ্বল করে তোলে এবং মুখের ত্বককে টাইট করে। ভিটামিন বি৫ ত্বকের কালো দাগছোপ, ট্যান দূর করে এবং ভিটামিন ই ত্বককে মসৃণ, উজ্জ্বল ও হাইড্রেটেড করে তোলে। তাই আখরোটের তেল গায়ে ও মুখে নিয়ম করে লাগান, দেখবেন আপনার ত্বক দু’দিনেই জেল্লাদার হয়ে উঠবে। ত্বক ও চুলের জেল্লা ফেরাতে ত্বকের প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার হিসেবে দোকান থেকে কেনা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার না করে আখরোটের তেল ব্যবহার করতে পারেন, দেখবেন, এই শীতে রুক্ষ ত্বকের মসৃণতা দ্রুত ফিরে পাবেন।

চোখের ডার্ক সার্কেল

রাত জেগে কম্পিউটারের সামনে কাজ করে বা মোবাইল ব্যবহারের ফলে, কিংবা দুশ্চিন্তায় চোখের তলায় কালি এখন খুব সাধারণ একটি সমস্যা। চোখের তলায় কালি বা ডার্ক সার্কেল এবং ফোলা চোখ যেমন দেখতে ক্লান্ত লাগায়, তেমনই মুখের সৌন্দর্যকে কমিয়ে দেয়। ডার্ক সার্কেল দূর করতে চোখের আশপাশে নিয়ম করে রাতে শুতে যাওয়ার আগে হালকা করে আখরোটের তেল বুলিয়ে নিলে সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন।

ত্বকের বয়সজনিত ছাপ দূর করে

সামান্য বয়স হলেই ত্বক কুঁচকে যাওয়া বা ত্বকে বয়সজনিত ছাপ আজকাল খুব বড় একটা সমস্যা। মুখে বয়সের ছাপ দূর করতে অনেকেই চিকিৎসার সহায়তা নিয়ে থাকেন। আখরোটে থাকা ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড অকালে ত্বকের কুঁচকে যাওয়া ও অন্যান্য বয়সের ছাপ দূর করে, ত্বককে ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করে। এছাড়া এতে থাকা ভিটামিন ই ত্বককে নানারকম ক্ষতি ও ক্লান্তির ছাপ থেকে মুক্ত করে তরতাজা রাখে। ফলে মুখে নিয়ম করে আখরোটের তেল মালিশ করে দেখতে পারেন।

চুলের সমস্যায় আখরোট

খুশকির সমস্যায়

শীতে অনেকেই খুশকির সমস্যায় ভুগছেন। খুশকি অনেকসময়ে আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। এক্ষেত্রে সপ্তাহে দু’দিন আখরোট এক্সট্র্যাক্ট যুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করলে খুশকি থেকে মুক্তি পেতে পারেন। আখরোটের শক্তিশালী অ্যান্টি-ফাঙ্গাল বৈশিষ্ট স্কাল্পকে ভিতর থেকে স্বাস্থ্যবান করে তোলে এবং চুলকে হাইড্রেটেড করে খুশকিসহ অন্যান্য ফাঙ্গাল ইনফেকশন দূর করে। চুলে নিয়ম করে আখরোট তেল মালিশ করলেও উপকার পাবেন।

চুলকে সুন্দর ও শক্তিশালী করে তুলতে

রোদে বেরিয়ে বা দূষণের কারণে আপনার চুল কি তার স্বাভাবিক জেল্লা হারিয়ে ফেলছে? তাহলে ব্যবহার করুন আখরোটের তেল। এতে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড, মেলাটোনিন প্রভৃতি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট চুলের গোড়া শক্ত করে এবং নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। এছাড়া আখরোটে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড শুষ্ক, রুক্ষ চুলকে নরম করে। সপ্তাহে অন্তত একদিন রাতে শোওয়ার আগে চুলে ভাল করে আখরোটের তেল মালিশ করে শুতে যান। দেখবেন ঘুমও ভাল হচ্ছে, চুলের জেল্লাও বাড়ছে। এছাড়া আখরোটের তেলে থাকা খনিজ উপাদান, ভিটামিন ই, ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, পটাশিয়াম চুলের আগা ভেঙে যাওয়া থেকে আটকায়।

চুলের রং স্বাভাবিক রাখতে

বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে চুল পাকতে শুরু করে। এছাড়া আজকাল নানারকম কারণে অল্পবয়সেই চুল পাকার সমস্যা দেখা যায়। মাথায় আখরোটের তেল মালিশ এক্ষেত্রে কাজে দেবে। চুলের স্বাভাবিক কালো রং বজায় রাখতে এবং চুলকে পর্যাপ্ত পুষ্টির যোগান দিতে আখরোট তেলের জুড়ি নেই। আখরোটে থাকা প্রোটিন, বায়োটিন চুলকে ঘন, সুন্দর ও মোলায়েম করে চুলকে ঘন করে।

এখন দেখে নিন আখরোট দিয়ে কীভাবে সহজে মুখ ও চুলের মাস্ক তৈরি করবেন।

পেঁপে ও আখরোটের ফেস মাস্ক

কী লাগবে

৩ চামচ আখরোট গুঁড়ো, ২ চামচ পেঁপের পাল্প, ২ চামচ মধু

কীভাবে বানাবেন

সমস্ত উপকরণ একটি পাত্রে মিশিয়ে নিন। তারপর মুখে, গলায়, ঘাড়ে ভাল করে লাগান। ১৫-২০ মিনিট রেখে ঠান্ডা জল দিয়ে ভাল করে ধুয়ে ফেলুন। ত্বকে দাগ, ছোপ, ইনফেকশন ইত্যাদি যে-কোনওরকম সমস্যায় এই ফেস মাস্ক দারুণ কাজে দেবে। এছাড়া আখরোটে থাকা ভিটামিন ই ত্বককে উজ্জ্বল করে তুলবে। এটি সপ্তাহে তিনদিন ব্যবহার করুন।

আখরোট তেল ও জবাফুলের হেয়ার মাস্ক

কী লাগবে

৫-৬ ফোঁটা আখরোট তেল, ১ কাপ জবাফুলের পাপড়ি পেস্ট করা, ১ চামচ নারকেল তেল

কীভাবে বানাবেন

একটি পাত্রে সব উপকরণ মিশিয়ে নিয়ে মাথার স্কাল্পে এবং চুলে ভাল করে লাগিয়ে নিন। আধঘণ্টা রেখে ঠান্ডা জলে ভাল করে ধুয়ে নিন। আখরোট তেলে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড এক্ষেত্রে আপনার রুক্ষ, শুষ্ক চুলকে মসৃণ ও নরম করবে। এবং এই হেয়ার মাস্ক আপনার মাথার যাবতীয় ইনফেকশন, খুশকি দূর করে চুলকে শক্তিশালী ও জেল্লাদার করে তুলবে। সুন্দর চুল পেতে সপ্তাহে একদিন এটি ব্যবহার করুন।

এছাড়াও, আখরোট আমাদের শরীরের রক্ত চলাচলে সাহায্য করে যার ফলে প্রতি কোষে পর্যাপ্ত পুষ্টি পৌঁছে যায়, এবং এই পুষ্টির যোগানই আমাদের ত্বক ও চুলকে ভিতর থেকে জেল্লাদার করে তোলে। তাই আখরোটের তেল, স্ক্রাব, মাস্ক ব্যবহার করার পাশাপাশি রোজ নিয়ম করে ৩-৪ টে আখরোট খান। দেখবেন, দীর্ঘস্থায়ী ফল পাবেন।