দক্ষিণ ফ্রান্সের রঙিন ব্রাভাদো উৎসব

দক্ষিণ ফ্রান্সের প্রোভঁস-আল্প-কোত-দাজুর (Provence-Alpes-Côte d’Azur) অঞ্চলের ফ্রেজিউ (Fréjus) কমিউনের একাংশে রয়েছে একটি প্রাচীন রোমান শহর, ৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জুলিয়াস সিজার। প্রতি বছর জুন মাসে ফ্রেজিউ এবং সেন্ট ত্রোপেজ মেতে ওঠে এক ঐতিহ্যবাহী উৎসবে।

ব্রাভাদো দ্য ফ্রেজিউ উৎসব কী 

ইস্টারের পরে তৃতীয় রবিবার মূলত এই উৎসব, ব্রাভাদো দ্য ফ্রেজিউ পালন করার দিন। তবে তা পালিত হয় টানা তিন দিন ধরে। এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য শহরকে মারণ রোগের হাত থেকে বাঁচানো পাদ্রী সেন্ট ফ্রসোঁয়া দ্য পোল (Saint-François de Paule)-কে সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জানানো। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, পাঁচ শতক অর্থাৎ প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল মারণ প্লেগ। সেই সময় এখানে আবির্ভাব ঘটে সেন্ট ফ্রসোঁয়া দ্য পোল-এর। তিনি অলৌকিক শক্তিতে প্লেগের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন বাসিন্দাদের। সেই কথা ভোলেননি দক্ষিণ ফ্রান্সের এই এলাকার বাসিন্দারা।

উৎসবের ইতিহাস

১৭৩৩ সালে প্রথম এই উৎসব পালন শুরু হয়। প্রায় ৫০ বছর পালন করার পরে দেশে বিপ্লব এবং তার পরে নানা যুদ্ধবিগ্রহের কারণে এই উৎসব পালন বন্ধ হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক মহলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে ফের এই উৎসব শুরু হয়। গত ৬০ বছর ধরে কোনও রকম বিঘ্ন ছাড়াই পালিত হচ্ছে এই উৎসব।
স্থানীয়দের কথায়, সেন্ট ফ্রসোঁয়া (ইংরেজি উচ্চারণে সেন্ট ফ্রান্সিস) অত্যন্ত সাদামাটা আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করতেন। তাঁর বাড়ি ছিল দক্ষিণ ইতালির পাওলো-তে। ১৪৮২ সালে তিনি যখন জাহাজে চেপে ফ্রেজিউ বন্দরে এসে নামেন, তখন অধিকাংশ বাসিন্দাই প্লেগের প্রকোপে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন, বাকিরা রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করছেন। তিনি আক্রান্ত বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যকামনা করে প্রার্থনা করেন। সেই প্রার্থনা মঞ্জুর হয়। ধীরে ধীরে সেরে ওঠেন আক্রান্তরা, মুছে যায় প্লেগের আতঙ্ক। ব্রাভাদো উৎসবের মাধ্যমে পালন করা হয় সেন্ট ফ্রসোঁয়ার ফ্রেজিউ-তে আসার শুভদিনটি।

কেমন করে পালন করেন ফরাসীরা

নির্দিষ্ট দিনে, স্থানীয়রা নেপোলিয়নের আমলে সেনাবাহিনীর রঙিন ইউনিফর্ম পরে দল বেঁধে নেমে আসেন শহরের রাস্তায়, ঘুরতে থাকেন অলি-গলিতে। প্রত্যেকের হাতে থাকে বাঁশি বা ড্রাম অথবা প্রাচীন আমলে ব্যবহৃত অদ্ভুতদর্শন বন্দুক, ব্লান্ডারবাজ। কেউ বাজনা বাজান, কেউ আবার এই বন্দুক তাক করে আকাশে গুলি ছোঁড়েন। সাথে চলতে থাকে সেই সময়ের নাচ। শহরের মেন স্কোয়ারে রয়েছে একটি টাউন হল এবং সেন্ট-পোল-ডি-লিওন ক্যাথিড্রাল। ধীরে ধীরে সকলে এসে সমবেত হন ক্যাথিড্রালের সামনে। সেখানে রাখা থাকে সেন্ট ফ্রসোঁয়ার একটি বিশাল ছবি। সেটি সাজানো হয় লাল-সাদা ফুল দিয়ে। গোটা শহর সেজে ওঠে লাল-সাদা সাজে। প্রত্যেক বছর বাসিন্দাদের মধ্যে থেকেই বেছে নেওয়া হয় একজন জেনারেলকে, যিনি এই প্যারেডে নেতৃত্ব দেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন আরও দুই জন, একজন সাজেন কর্নেল অফ দ্য গ্রেনাডিয়ের কর্পস এবং দ্বিতীয় জন সাজেন অফিসার অফ দ্য অর্ডিন্যান্স। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে থেকে পছন্দ করা তিনজন সেজে ওঠেন এই সেনা আধিকারিকদের কস্টিউমে। তাঁদের কথা মতোই পরিচালিত হয় সেই বছরের উৎসব।

রঙের ছটা

ফলে প্রতি বছরই উৎসবের রং বদলায়। তবে শুধু সেনাবাহিনীর সাজই একমাত্র পছন্দ নয়, বাসিন্দাদের অনেকে সাজেন মধ্যযুগীয় নাবিক আবার কেউ সাজেন শিকারী। প্যারেডের শেষাংশে থাকে শহরের শিশুরা। তারাও সেজে ওঠে নিজেদের পছন্দের সাজে। বড় হয়ে কোনও একদিন জেনারেল সেজে ব্রাভাদোতে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেবে, এমন স্বপ্ন দেখতে দেখতে বড় হয় ফ্রেজিউয়ের কিশোররা। ক্যাথিড্রালের সামনে জমায়েত হওয়ার পরে সকলে মিলে সামিল হন প্যারেডে, যার নেতৃত্বে থাকেন সেই তিন অফিসার। দুপুরের মধ্যে উৎসব শেষ হয়ে গেলেও সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলতে থাকে হই-হুল্লোড়, খানাপিনা। গোটা দিন ধরে হুল্লোড় চললেও ক্লান্তির ছাপটুকুও দেখা যায় না নগরবাসীর চোখে-মুখে।

ফ্রান্সের অন্যান্য এলাকা থেকে তো বটেই, এমনকী দূরদূরান্ত থেকে বহু দর্শক এই সময় ফ্রেজিউতে আসেন, শুধু এই উৎসবের স্বাদ নেবেন বলে। এই দর্শকদেরও নিজেদের উৎসবে সামিল করে নেন স্থানীয়রা। সোমবার ক্যাথিড্রালে এসে প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে শেষ হয় ব্রাভাদো উদযাপন। এরপরে বাসিন্দারা সমবেত হন মেন স্কোয়ারে, সেখানে টাউন হলে সারা হয় উৎসবের শেষাংশ। বহু স্থানীয় শহরের অলি-গলি ধরে ঘুরতে থাকেন, শহরের বিভিন্ন চার্চে গিয়ে প্রার্থনা করেন। বিভিন্ন স্কোয়ারে সমবেত হন। সোমবার গোটা দিন এভাবেই কাটান স্থানীয়রা। চোখের নিমিষে উৎসবের দিনগুলি কেটে যাওয়ার পরে আবার সকলে অপেক্ষা করেন পরের বছর জুনের।