SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

দারুচিনি: এক নজরে মিষ্টি কাঠের সুস্বাদু ইতিহাস

খাবার ২৬ জানু. ২০২১
জানা-অজানা
দারুচিনি
© Dmytro Loboda | Dreamstime.com

রবিবার, ছুটির দিন। আম্মি আর বড় খালা মিলে মাংস রান্না করছে আর বাড়িসুদ্ধ ম’ম করছে তার ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণের অনেকটাই কিন্তু গরম মশলার অবদান। আর গরম মশলা যাকে ছাড়া ভাবাই যায় না তা হল দারুচিনি। রান্না থেকে সাহিত্য, দারচিনির গুরুত্ব কিন্তু অনস্বীকার্য! স্বয়ং নজরুল ইসলাম তাঁর গানে লিখতে বাধ্য হয়েছেন, “দারুচিনির দেশের তুমি বিদেশিনীগো, সুমন্দভাষিণী।”

আমাদের প্রায় সকলের রান্নাঘরেই এই সুগন্ধি কাষ্ঠ মশলার উপস্থিতি রয়েছে।

ইতিহাস খুঁজে দেখলে জানা যাবে, দারুচিনি আর আমাদের সম্পর্ক কিন্তু অত্যন্ত প্রাচীন ও গভীর। প্রসিদ্ধ লেখিকা মরিয়ম রেশি তাঁর বই, ‘দ্য ফ্লেভার অফ স্পাইস’-এ দারুচিনি সম্পর্কে অজানা অনেক তথ্যের সন্ধান দিয়েছেন। দারুচিনি গাছের উচ্চতা সাধারণত দশ থেকে পনেরো মিটারের বেশি হয়না। এই গাছের যে অংশ আমরা ব্যবহার করি তা কিন্তু আসলে গাছের গুঁড়ির অন্তঃত্বক।

দারুচিনির ইংরেজি নাম সিনামন। ফিনিশিয়ান ও হিব্রু শব্দ ‘কিনামন’ থেকে এর উৎপত্তি। আবার ধরে নেওয়া হয় এই ‘কিনামন’ শব্দটি গ্রিক ‘কুইনামন’ শব্দ থেকে এসেছে। অনেক ঐতিহাসিকের ধারণা, এই ‘কুইনামন’ শব্দের উৎপত্তি মালয় শব্দ ‘কায়ু মানিস’ থেকে। কায়ু মানিসের অর্থ মিষ্টি কাঠ। সুতরাং, এখান থেকেই বোঝা যায় দারুচিনির ইতিহাস কত পুরনো!

দারুচিনির উৎস সন্ধানে

দারুচিনি বললেই আমাদের মনে আসে শ্রীলংকার নাম। সেখান থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ নাগাদ বণিকদের হাত ধরে মিশরে পা রাখে এই সুগন্ধি কাঠ। পথিমধ্যে মধ্য প্রাচ্য ও আরব জয় করে এই মশলা, রান্নায় এর ভূমিকা সম্পর্কে ইসলাম তখন থেকেই অবহিত। খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ নাগাদ গ্রিকরা পরিচিত হয় দারুচিনির সঙ্গে।

মজার ব্যাপার হল, আরবী বণিকরা কাউকেই দারুচিনির উৎসের কথা জানাতে চাইত না। ফলে, একের পর এক অদ্ভুত গল্পের মাধ্যমে খরিদ্দারদের কৌতূহলের নিবৃত্তি করত তারা।

সেই গল্পেই কখনও দারুচিনি হয়ে যেত বেহেস্তের পাখিদের বাসা বানানোর উপকরণ, কখনও ভয়াল ভয়ংকর ‘দারুচিনি পাখি’দের গল্প শুনে খরিদ্দাররা বেশ ভয়ই পেয়ে যেত।

রোমান প্রকৃতিবিজ্ঞানী ও দার্শনিক প্লিনি নিজের রচনায় লিখেছেন এগুলি মূলত ব্যবসা কুক্ষিগত করে রাখার প্রয়াস ছিল। এর ফলে ব্যবসায়ীরা নিজেদের মত দাম নির্বাচন করতে পারত, আর কেউ সাহস করে দারুচিনির বিষয়ে বিশদে খোঁজ খবর করত না।

বণিকদের এই প্রয়াস অনেকাংশেই সফল ছিল, কারণ এর ফলে ভূমধ্যসাগর অঞ্চল ও ইউরোপ বহুদিন দারুচিনির উৎস সন্ধানে বেরোনোর কথা ভাবেনি। দারুচিনি ছিল অভিজাতদের মহার্ঘ্য মশলা।

প্রাচীনকালে দারুচিনি-র ব্যবহার

বর্তমান পোলাও থেকে আরম্ভ করে ডেজার্ট পর্যন্ত দারুচিনির বহুল ব্যবহার। তবে প্রাচীনকালে খাবারের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা ও রূপচর্চায়ও এই সুগন্ধি কাঠের ব্যবহার ছিল। মিশরে সুগন্ধি দ্রব্য তৈরি হত এর মাধ্যমে। দশম শতকের বিখ্যাত পণ্ডিত ও চিকিৎসক আল-রাজির লিখিত বই ‘কিতাব আল হাওয়াই ফি আল-তিব’ থেকে পাওয়া যায় তৎকালীন অভিজাতরা অতিরিক্ত ঘামের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে দারুচিনির ব্যবহার করতেন।

মধ্যযুগের অন্যান্য মুসলমান চিকিৎসকরা নানাপ্রকার ক্ষত, টিউমার ও আলসারের চিকিৎসায় দারুচিনির ব্যবহার করতেন। সেখান থেকে ইউরোপীয় চিকিৎসকরা দারুচিনির ওষধি গুণ সম্পর্কে জানতে পারে। পরবর্তীতে ইউরোপে ক্ষত সারানোর সঙ্গে- সঙ্গে পেট, লিভার ও হৃদরোগের চিকিৎসায় এটির ব্যবহার শুরু হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ শতকে, শ্রীলংকার রাজা বুদ্ধসা দারুচিনিকে সে দেশের ওষধি গাছ হিসাবে পরিচয় দেন।

বিশ্বে দারুচিনি-র পরিচিতি

দশম শতকের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে দারুচিনি দ্বীপ শ্রীলংকার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৩৪৪ সালে বিখ্যাত ভূপর্যটক ইবন বতুতা শ্রীলংকায় পা রাখেন। তবে, শ্রীলংকার পরিচিতি আরও গভীর হয় ১৫০৫ সালে যখন একটি পর্তুগিজ জাহাজ ঝড়ে পথ হারিয়ে সে দেশে গিয়ে পৌঁছয়।

কথিত আছে, ইউরোপে ফেরার সময় সেই জাহাজ নাকি ৬ মেট্রিক টন দারুচিনি নিয়ে ফিরেছিল। এরপরেই ইউরোপীয়দের কাছে দারুচিনি দ্বীপের রহস্য জলবৎ তরলং হয়ে যায়। আরব ও ইসলাম বণিকদের একচেটিয়া ব্যবসায় ভাগ বসায় ইউরোপীয় বণিকরাও। ১৮০০ শতকের মধ্যে ব্যবসায়িকভাবে ভারত, জাভা ও সেশ্যেলেস দ্বীপপুঞ্জে বাণিজ্যিক ভাবে দারুচিনি চাষ শুরু হয়। একসময়কার মহার্ঘ্য মশলা সাধারণের সাধ্যের মধ্যে চলে আসে।

বর্তমানে দক্ষিণ চীন, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশে এর বাণিজ্যিক চাষ হয়।

শ্রীলংকায় প্রাকৃতিকভাবে যে দারুচিনি পাওয়া যায় তার বৈজ্ঞানিক নাম সিনামোমাম ভেরাম। আর বাণিজ্যিকভাবে যে দারুচিনির চাষ হয় তা হল সিনামোমাম ক্যাসিয়া। লেখিকা মরিয়ম রেশির মতে, ভেরামের স্বাদ অনেক বেশি সুমিষ্ট। ক্যাসিয়াতে হালকা তিক্ত স্বাদ পাওয়া যায় ট্যানিনের প্রভাবে। তাঁর মতে, এখনও মধ্য প্রাচ্য ও এশিয়া জুড়ে সিনামোমাম ভেরামের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না ক্যাসিয়া।

তবে ভেরাম হোক বা ক্যাসিয়া, আমাদের রান্নাঘরে এই মিষ্টি কাঠের চাহিদা কোনওদিন কমবে না। সুপ্রাচীন অভ্যাসেই দারুচিনি আর আমাদের স্বাদকোরকের দোস্তি চিরকালীন!