দিগন্ত জোড়া হলুদ আঙ্গিনা ফরিদপুরের ডোমরাকান্দি

sunflower bangladesh
ID 186102076 © Estiak Tusar | Dreamstime.com

সূর্যমুখী ফুল,আমাদের পরিচিত কাঙ্খিত এক ফুলের নাম। কত গল্পে ,কবিতায়, উপন্যাসে , চলচ্চিত্রে, শিল্প-সাহিত্যের নানা মাধ্যমে নানা সময়ে এই ফুলের কথা বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। এটি আমাদের দেশের অতি পরিচিত এবং জনপ্রিয় একটি ফুল। সকালের সোনা রোদ যখন সূর্যমুখী ফুলের উপরে পরে তখন ঝলমলে সূর্যমুখীর হাসি যে কারো দৃষ্টি এবং অন্তর জুড়ানো জন্য যথেষ্ট।

আমাদের দেশেও সূর্যমুখীর বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়ে থাকে। মাইলের পর মাইল দিগন্ত জুড়ে এর ক্ষেত অনন্য সৌন্দর্যর নজির স্থাপন করে। আকাশের নীল রঙের সাথে ফুটন্ত হলুদ সূর্যমুখী ফুলের মায়াবী রূপে যে কেউই মোহিত হতে বাধ্য। বাগানে প্রতিদিন খেলা করে হাজারো প্রজাপতি ও মৌমাছি। আগত সকলকে স্বাগত জানায় তার হলুদের সামিয়ানা দিয়ে।

ফরিদপুরের একটি গ্রাম হচ্ছে ডোমরাকান্দি। গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক। আর এই সড়ক পাশেই গড়ে উঠেছে হলুদের এক স্বর্গরাজ্য। মৃদু বাতাসের দোল খাওয়া এই সূর্যমুখী দেখে পাশ দিয়ে ছুটে চলা যে কেউই আনন্দিত হয়ে উঠবেন। শীতের সকালের কুয়াশা ভেদ করে সূর্যমামা যখনই উঁকি দেয় তখনই এই সূর্যমুখী ফুল তার আড়মোড়া ভেঙে পুরোপুরি রূপে জেগে ওঠে। যেন আন্তরিক হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রকৃতির বুকে। আর এই প্রাকৃতিক হাসি দেখতেই প্রতিদিন বহু মানুষ ভিড় করে এই গ্রামে। সূর্যমুখী ফুলের সাথে সাথে আগতদের মুখেও ফুটে ওঠে এক তৃপ্তির, আনন্দের হাসি।

বাগানে প্রবেশের সাথে সাথেই মনে হবে হলুদ চারিদিকে যেন ছড়িয়ে আছে এক অপার মুগ্ধতা। সবুজের মাঝে হলুদের এই মাঠে মৌমাছি, প্রজাপত আর পাখির আনাগোনা সৃষ্টি করে এক মনোরম দৃশ্যের। এখানে ফুল থেকে তেল উৎপাদনের পাশাপাশি উৎপাদিত হচ্ছে মধু।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে ফরিদপুরের এই গ্রামের সূর্যমুখীর বাগান করা হয়। শুধুমাত্র বীজ সংগ্রহের জন্য প্রায় এক যুগ ধরে এখানে চাষ হচ্ছে সূর্যমুখী। দুই একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই খামার সূর্যমুখী ফুল থেকে সারাদেশের ‘ডাল তেলবীজ’ খামারে বীজ সরবরাহ করা হয়।

প্রতিটি গাছ প্রায় তিন মিটার লম্বা হয়ে থাকে। এবং এই গাছ থেকে প্রায় ১২ সেন্টিমিটার ফুল দেখতে পাওয়া যায়। এই বীজ থেকে ৪৫০ থেকে ৪৬০ লিটার তেলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে এখানে বীজ রোপন করা হয় এবং পরবর্তী ফেব্রুয়ারির মাসের শেষ সপ্তাহে পাকা বীজ তোলা হয়।

প্রায় ২০,০০০ সূর্যমুখী ফুলের এই হলুদ গালিচায় সকাল থেকেই মৌমাছির গুঞ্জন আর পাখিদের কোলাহলে মুখরিত থাকলেও দিনের সময় বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে যায় মানুষের আনাগোনা। প্রতিদিনই এই ফুলের হলুদের হাতছানিতে এখানে এসে উপস্থিত হয় বহু তরুণ তরুণী। জীবনের ব্যস্ততম সময় এর মাঝেও আগতরা খুঁজে নিতে চায় প্রাকৃতিক নির্ভেজাল আনন্দ। মিশে যেতে চায় প্রকৃতি মায়ের কোলে। অন্তরকে করতে চায় আনন্দময়। সূর্যমুখী ফুলের এই সামিয়ানাও তাদেরকে হতাশ করে না। দৃষ্টি ও অন্তরকে এই ফুল তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিয়ে আগতদের চিত্রকে প্রশান্ত ও আনন্দিত করে।

বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে সূর্যমুখীর চাষ হয়। সূর্যমুখী চাষে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন। বিশেষ করে এই অঞ্চলের কৃষকরা যাতে রবি শস্য হিসেবে সূর্যমুখী চাষের প্রতি আগ্রহী হয় এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে নানান ধরনের উদ্যোগ। এর ফলে আঞ্চলিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এতে ব্যক্তিগত এবং জাতীয় পর্যায়ে এর আর্থিক প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। দূর হতে পারে বেকারত্ব।

এই অপার সৌন্দর্যের সূর্যমুখী দেখে মন ভরে ওঠে হাজারো প্রকৃতিপ্রেমির। প্রকৃতির নিয়মে সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বেলা গড়িয়ে দিনের সূর্য যখন হারিয়ে যেতে শুরু করে সূর্যমুখীরা তখন শুধু তাদের ঘাড়ই বাঁকা করে না, চোখ বুঝে আবার ঘুমিয়ে পড়ে রাতের কোলে। অপেক্ষা শুধু সকালের স্নিগ্ধ আলোর, যার ছোঁয়ায় সূর্যমুখীরা তাদের আড়মোড়া ভেঙে আবার জেগে উঠবে এক হলুদের সামিয়ানা নিয়ে। নিজের রঙে রাঙিয়ে দিবে প্রকৃতিকে।