দিল্লি দরবার থেকে বরাবর বিজ্ঞান শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন মুসলমান শাসকরা

humayun tomb
ID 178944028 © Christopher Bellette | Dreamstime.com

মুসলিম শাসকদের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতের বিজ্ঞান চর্চা অব্যাহত ছিল। বহু মুসলিম সুলতান নিজেও বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন। যেমন, জালাল উদ-দিন খিলজি হলেন দিল্লির প্রথম মুসলিম সুলতান, যিনি হিন্দু শিক্ষা এবং সংস্কৃত অধ্যয়নের জন্য কৌতূহল দেখিয়েছিলেন। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক (১৩৫১)  যুক্তি, গ্রীক দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞানে দক্ষ ছিলেন। তিনি একজন বিশেষজ্ঞ ক্যালিগ্রাফারও ছিলেন। মুসলিম সুলতানরা সর্বদাই শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন।

সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক (১৩৮৮) এক মিলিয়ন পাউন্ডের এক তৃতীয়াংশের কিছু বেশি (৩৬ লক্ষ) বরাদ্দ করেছিলেন বিদ্বান পুরুষ এবং পবিত্র সামগ্রী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। শিক্ষায় উৎসাহ দেওয়ার জন্য বেশ তাঁর আমলে বেশ কয়েকটি মাদ্রাসা খোলা হয়েছিল। তিনি দরিদ্রদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য হাসপাতাল নির্মাণ করেছিলেন এবং ইউনানী ওষুধের বিকাশের জন্য সর্বদা চিকিৎসকদের উৎসাহ দিতেন। তিনি হিন্দু জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে একটি কাজ, দালাইল ফিরোজ শাহী নামে ফার্সিতে অনুবাদ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জিয়া আল-দিন-বারানী (১৩৫৭) তুঘলকের শাসনের কালানুক্রমিক ইতিহাস লিখেছিলেন, যার নাম ছিল তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী। 

মুঘল আমলে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার

মুঘল সম্রাটরা (১৫২৬-১৮৫৮) জ্যোতির্বিদ্যার বিকাশে গভীর আগ্রহী ছিলেন। তাঁরা রাজদরবারে জ্যোতির্বিদদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এই বিদ্যানুরাগের ফলে তৈরি করা হয়েছিল প্রধানত জিজ (জ্যোতির্বিদ্যার সারণী) এবং ক্যালেন্ডার। বাহাউদ্দিন আমুলির (১৫৭৪-১৬২১) খুলাসা তুল-হাসাব, এবং আল্লামা তুসির তাহরির উকালিদিস এবং তাহরির আল-মাজিস্তির মতো বহু বৈজ্ঞানিক রচনা ভারতের বাইরে থেকে আনা হয়েছিল। এই বইগুলি অনুবাদ করার চেষ্টা করা হয়েছিল যার ফলে আরব ও পারস্যের সাথে ভারতীয় গাণিতিক ঐতিহ্যের মিলন হওয়া সম্ভব হয়েছিল। 

সম্রাট আকবরের আমলে মুসলিম পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু শিক্ষার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটেছিল । তাঁর দরবারে কিছু হিন্দু সভাসদ ছিলেন যাঁরা ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষ ছিলেন, যেমন- রাজা মনোহরদাস এবং রাজা টোডর মল, যিনি ভাগবত পুরাণকে ফারসিতে অনুবাদ করেছিলেন। আকবরের একটি বিশাল গ্রন্থাগার ছিল, যেখানে শুধুমাত্র পাণ্ডুপিলি সংগ্রহ করে রাখা থাকত। তাঁর গ্রন্থাগার থেকে মাত্র ২৪,০০০ পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছে  তবে তাদের মূল্য ৩,৫০০,০০০ ডলার।

আবদুল রহিম খানি-ই-খানা, আবুল ফজল ও ফৈজির মতো কিছু মুসলিম আমীর কিছু সংস্কৃত জানতেন এবং তার থেকে অনুবাদও করেছিলেন। ১৫৮৪ সালে আকবর মোল্লা আবদুল কাদির বদাউনিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বিক্রমজিৎ ও ৩২টি কাহিনীকে সংস্কৃত থেকে ফারসি-তে অনুবাদ করার জন্য। এই কাজে সাহায্য করার জন্য একজন বিদ্বান ব্রাহ্মণকে বদাউনির সহযোগী হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। এই ফারসি রচনার নাম ছিল নাম-ই-খিরাদ (দ্য উইজডম অগমেন্টিং বুক)। পরের বছর আকবর আবুল ফজলকে হায়াতুল হাইয়ান-কে আরবি থেকে ফারসিতে অনুবাদ করার আদেশ করেছিলেন, এটি হল মূসা আল-দামিরি  দ্বারা রচিত প্রখ্যাত প্রাণিবিদ্যা সংক্রান্ত অভিধান, যার মধ্যে রয়েছে  লোককাহিনী এবং জনপ্রিয় বিভিন্ন ঔষধের সংমিশ্রণ। 

সম্রাট আকবরের নির্দেশে হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ মহাভারতেরও ফারসি অনুবাদ করেছিলেন আবুল ফজল। তিনি মহাভারতের যে ফারসি অনুবাদ করেছিলেন তার মুখবন্ধে আবুল ফজল বলেছেন: “আকবর তাঁর আমলে এমন নীতি চালু করেছিলেন যাতে যুগ যুগ ধরে অন্ধের মতো সকলে যা মেনে চলতেন তা ভেঙে ফেলা যায় এবং এর ফলে ধর্মীয় বিষয়ে গবেষণা ও তদন্তের একটি নতুন যুগ শুরু হয়েছিল”। 

১৫৮০ সালে ফাদার আন্তোনিও মনসেরাত সম্রাট আকবরের হাতে তুলে দেন পৃথিবীর একটি মানচিত্র বা অ্যাটলাস, যা গোয়ার আর্চবিশপ তাঁকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে লিখেছিলেন, যে তিনি দেখেছিলেন সম্রাট নিজে যন্ত্র নিয়ে কাজ করছেন এবং নতুন যন্ত্র কীভাবে তৈরি করা হবে সেই সম্পর্কে নির্দেশ দিতে দেখেছেন। ফাদার আন্তোনিও মনসেরাত সম্রাট আকবর সম্পর্কে লিখেছেন:

তিনি শেখার এক মহান পৃষ্ঠপোষক, এবং সর্বদা তাঁর চারপাশে জ্ঞানী ব্যক্তিরা থাকেন, যাঁদের কাজ হল সম্রাটের সামনে দর্শন, ধর্মতত্ত্ব এবং ধর্ম নিয়ে আলোচনা করা এবং তাঁকে মহান রাজাদের ইতিহাস ও অতীতের গৌরবময় কর্মের বর্ণনা দেওয়া। তিনি দুর্দান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন এবং তুখোড় স্মৃতিশক্তির অধিকারী। ধৈর্য সহকারে এই বিদ্বান ব্যক্তিদের আলোচনা ও পরামর্শ শুনে তিনি বহু বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছেন। সুতরাং তাঁর অক্ষরজ্ঞান না থাকলেও (ফলে তিনি পড়তে বা লিখতে পুরোপুরি অক্ষম), তিনি যে কোনও জটিল বিষয় সহজে ব্যাখ্যা করতে ও তার সমাধান করতে পারেন। তিনি যে কোনও প্রশ্নের এত বুদ্ধিদীপ্ত এবং তীক্ষ্ণ জবাব ও মতামত দিতে পারেন যে,  তিনি নিরক্ষর সে কথা কারও পক্ষে বোঝা অসম্ভব। বরং সকলে তাঁকে অত্যন্ত জ্ঞানী ও বিদ্বান মনে করেন। ” 

শেখ আবু আল-ফৈজ ইবন মোবারক – নোম দে প্লুম ফৈজি ছিলেন সম্রাট আকবরের সভার অন্যতম কবি। আকবরের পরামর্শে ফৈজি ভাস্কর আচার্যের গণিত লীলাবতী সংক্রান্ত সংস্কৃত রচনা ১৫৮৭ সালে ফারসি-তে অনুবাদ করেছিলেন। অনুবাদটি এত জনপ্রিয় ছিল যে আতাউল্লাহ রাশদী লাহোরি ভাস্কর আচার্যের বীজগণিত ও পরিমাপ সম্পর্কিত অন্যান্য বইগুলিও অনুবাদ করেছিলেন।

সম্রাট হুমায়ুন (১৫৫৬) দিল্লির পুরোনো কেল্লায় তাঁর একটি ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ও মানমন্দির তৈরি করেছিলেন। জাহাঙ্গীর এবং শাহজাহানও তাঁদের আমলে মানমন্দির নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেছিলেন তবে তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়নি। সম্রাট শাহজাহানের  রাজদরবারে মালজিৎ, মুনীশ্বর, নিত্যানন্দ, মোল্লা ফরিদ, মোল্লা মুর্শিদ শেরাজী, এবং মোল্লা মাহমুদ জৌনপুরীর মতো বহু বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ছিলেন। জৌনপুরি ছিলেন একজন বহুমুখী পণ্ডিত, যাঁর রচিত শামস বাজেঘি মধ্যযুগীয় জ্যোতির্বিদ্যাকে এক নতুন দিশা দেখিয়েছিল।