দুই বাংলার বিভিন্ন উৎসবে জনপ্রিয় পদ: ইলিশ পোলাও

ilish pulao

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাছ ‘ইলিশ’। বিজ্ঞানসম্মত নাম Tenualosa ilisha। বর্ষাকাল এবং তার পরবর্তী কিছু মাস জুড়ে মৎসপ্রেমী বাঙালিদের মনে ইলিশের আতিথেয়তা কিন্তু একটু আলাদাই হয়। সাদামাটা মধ্যবিত্ত পরিবারে, সংসারের অন্যান্য দায়িত্ব সামলে খুব বেশি বিলাসিতার অবকাশ না থাকলেও বাজারে রূপালি এই মাছের আগমন ঘটেছে শুনে, অনেক বাঙালিই চুপ করে থাকতে পারে না। কাটাপোনা, চারাপোনার পর্ব পেরিয়ে গরম ভাতে ইলিশ মাছ ভাজা, একটুকরো লঙ্কা আর তেল তার চাই-ই!

কলকাতায় ইলিশ

সম্প্রতি করোনা আবহের কালেও মন ভাল করে দেওয়া খবরও উঠে এসেছে বাঙালিদের জন্য… ‘পদ্মাপাড়ের ইলিশ’-র আগমনে। সেই ইলিশ মোটেই যে-যে ইলিশ নয় আকারে বর্ণে বিষয়টা কিঞ্চিৎ রাজকীয়ই বলা যায়। প্রায় দেড়কিলো ওজনের ইলিশও ধরা পড়েছে মৎসজীবীদের জালে।

এই প্রসঙ্গে আরও একটা জিনিস বলে রাখা ভাল বাংলাদেশের মানুষজন কিংবা পদ্মাপাড়ের মানুষজন কিন্তু জিনিসপত্র ভাগ করে খেতেই বেশি ভালবাসে। তাই ভারতের হিন্দু বাঙালিদের দুর্গোৎসবের আগেই তারা প্রায় দেড় হাজার মেট্রিক ইলিশ পাঠিয়েছে কলকাতায়। বাজারপ্রেমী বাঙালির কাছে এর থেকে সুখবর আর কিছুই বোধহয় হতে পারে না। অন্যদিকে বাংলাদেশের মহিপুর-আলিপুর মৎস্যবন্দরের মৎস্যজীবীরা জানিয়েছে প্রাথমিকভাবে লকডাউন, করোনা মহামারীর প্রকোপে মাছ সেভাবে ধরতে যেতে না পারলেও, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিই মাছেদের বড় হয়ে ওঠার পক্ষে একপ্রকার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে।

এক, দীর্ঘ লকডাউনের ফলে পরিবেশ দূষণ এবং জলদূষণের মাত্রা অনেকটাই কম, ফলে পদ্মায় ইলিশের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছন্দে সম্ভব হয়েছে। দুই, প্রাথমিকভাবে রুজির তাগিদে ছোট ওজনের ইলিশ মাছ ধরে সরাসরি রপ্তানি করার কোনও তাড়াও ছিল না তাদের এবারে। কাজেই স্বাভাবিক নিয়মে, নির্দিষ্ট সময়ে মৎস্যজীবীদের জালে ধরা দিয়েছে পরিপুষ্ট এবং সুস্বাদু এই রুপোলি মাছ। আরও একটি বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন প্রায় প্রতি বছরই বঙ্গোপসাগরের ব-দ্বীপ অঞ্চল, পদ্মা-মেঘনা-যমুনার মোহনা থেকে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ সংগ্রহ করা হয়।

ইলিশের নাম পরিচিতি

ইলিশ মাছ প্রসঙ্গে কথা বলতে বলতে আরও কয়েকটি কথা বলা যেতে পারে । রুপোলি এই মাছেরও স্থানভেদে রয়েছে নামভেদ। যেমন-পাকিস্তানের সিদ্ধ ভাষাতে একে বলা হয় পাল্লু মাছি, তেলেগু ভাষায় বলে পোলাসা, গুজরাটে মোদেন (স্ত্রী ইলিশ) এবং পালভা (পুরুষ ইলিশ)। পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম নিকটবর্তী রাজ্য ‘ওড়িয়া’ ভাষাতে একে বলা হয় ইলিশী।

এতসব নামের ভিড়েও এর স্বাদ এক এবং অনন্য। কাঁচালঙ্কা, সরষেবাটা দিয়ে, কিংবা কালো জিরে ফোড়ন কিংবা দই যে-কোনও উপকরণ দিয়েই আপনি ইলিশের যে পদই বানান না কেন স্বাদের ক্ষেত্রে আপনাকে এই নামগত বিভাজনগুলোকে মনে রাখতে হবে না। সরষে ইলিশ, ইলিশ ভাপা, দই ইলিশ রান্নার এই সকল পদের সঙ্গে আমরা সকলেই বিশেষভাবে পরিচিত। বাড়িতেও বানিয়েছি বহুবার। তবে আজ আমাদের প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা শিখব ইলিশ পোলাও বানানোর পদ্ধতি। পোলাও বানানোর এ যাবতীয় যা যা পদ্ধতি আপনারা জানেন সেগুলোকে আপাতত একটু সরিয়ে রেখে আমাদের পরবর্তী নিবেদন ইলিশ পোলাও।

ইলিশ পোলাও বানানোর প্রক্রিয়া

প্রয়োজনীয় উপকরণ-

গোবিন্দভোগ চাল বা বাসমতী চাল ( ৫০০ গ্রাম), ইলিশ মাছের টুকরো ১২-১৪ পিস, আদা বাটা ১ চা-চামচ, রসুন বাটা ১/২ চা-চামচ, টকদই (বাড়িতে বানানো বা পাতা হলে ভাল) ১ কাপ, দারচিনি ২ টুকরো, এলাচ ৪টে, পেঁয়াজ বাটা (এক্ষেত্রে একটু বেশি পরিমাণে লাগবে) ৩-৪ কাপ, পেঁয়াজ ভাল করে কুচানো ১/২ কাপ, কাঁচা মরিচ ১০-১১টা, পানি ৪-৫ কাপ, চিনি ১ চা-চামচ (প্রয়োজনে বেশি ব্যবহার করতে পারেন), তেল ১/২ কাপ।

প্রণালী- প্রথমেই মাছের টুকরোগুলোকে ভাল করে জল দিয়ে ধুয়ে নিন। এরপর ম্যারিনেট করার জন্য টুকরোগুলোতে আদা, রসুন, লবণ, দই মাখিয়ে রাখুন। এই প্রসঙ্গে খেয়াল রাখবেন প্রতিটি টুকরোর প্রতিটা পৃষ্ঠদেশ যেন ভাল করে মশলা দিয়ে মাখা হয়। ম্যারিনেট হওয়ার জন্য প্রায় ১৫ মিনিটের মতো সময় দিন। এবার একটি প্যানে তেল গরম করুন। তাতে দারচিনি, এলাচ এবং পেঁয়াজ দিন। ভাল করে মিশ্রণটিকে কষানোর চেষ্টা করুন। এরপর এই মশলার মধ্যে ম্যারিনেট করে রেখে দেওয়া মাছের টুকরোগুলোকে দিয়ে দিন, একটু খুন্তি

দিয়ে নেড়ে ২০ মিনিটের জন্য অল্প আঁচে চাপা দিয়ে রাখুন। এরমধ্যে চিনি এবং কাঁচামরিচ দিতে পারেন এবং আরও একবার মাছের টুকরোগুলোকে উল্টে দিয়ে অন্য পৃষ্ঠগুলোকে ভেজে ফেলার চেষ্টা করুন। একটা সময়ে দেখবেন প্যানের পানি শুকিয়ে গেছে এবং তেল উপরে উঠে এসেছে। এইরকম অবস্থাতে মশলা থেকে মাছগুলোকে তুলে নিন।

এবার অপেক্ষাকৃত একটা বড় পাত্র নিন। তাতে তেল গরম হলে কুচানো পেঁয়াজগুলো দিন। পেঁয়াজের রং বাদামি হয়ে গেলে পোলাও-এর চালগুলো ওর মধ্যে ঢেলে দিয়ে ভাল করে নাড়াচাড়া করুন, পূর্বে প্রস্তুত মাছের মশলা দিয়ে ভাল করে চালগুলোকে ভেজে নিন এবং এরপরে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি নিয়ে পাত্রটিকে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখুন। পানি শুকিয়ে যেতে এবং চাল সেদ্ধ হতে প্রায় মিনিট ১৫-২০ সময় লাগবে। এরপর আর একটি পাত্রে চাল ঢেলে নিয়ে ওতে মাছের টুকরোগুলোকে দিয়ে দিন। প্রায় ১০ মিনিট মতো সমস্ত প্রক্রিয়াটি ঢাকা দিয়ে রাখুন। এরপর পরিবেশনের জন্য তৈরি গরম গরম ইলিশ পোলাও। পরিবেশনকে আরও সুন্দর করে তুলতে পোলাও-এর উপরে কুচানো পেঁয়াজ ভাজা (বাদামি বর্ণের) ছড়িয়ে দিতে পারেন।