শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

দুনিয়ার সুখ-শান্তি আখিরাতের তুলনায় তুচ্ছ ও নগণ্য

jeremy-perkins-7FOSJVtUtac-unsplash
Fotoğraf: Jeremy Perkins-Unsplash

১০। মৃত্যু জীবনের শেষ পরিণতি নয়
একমাত্র আল্লাহ তাআলাই অবিনশ্বর। অবশিষ্ট সব সৃষ্টি নশ্বর। আল্লাহ ছাড়া সব কিছু তার নির্দিষ্ট হায়াত পূর্ণ হওয়ার পর নিঃশেষ হয়ে যাবে। এ নিশ্চিত ধ্বংসের কথা অনেক সৃষ্টিই জানে না।
মৃত্যু জীবনের শেষ পরিণতি নয়। মৃত্যুর পরেও এক জীবন আছে, সেই জীবনের নাম পরকাল। পরকালের জীবন অনন্তকালের। দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী।
যখন আমরা এই পৃথিবীর জীবন ত্যাগ করি, সেই অবস্থাকে আমরা ‘মৃত্যু’ নামে উল্লেখ করি। এর মাধ্যমে পৃথিবীতে একজনের যে কোন কাজ করার যাবতীয় সুযোগের সমাপ্তি ঘটে এবং মানুষের শারীরিক অস্তিত্বের বিনাশ ঘটে।
কুরআনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক জীবিত প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তবে মৃত্যুর মধ্য দিয়েই জীবনের সমাপ্তি হয় না।
এটিই যে মানুষের ভ্রমণের প্রথম অভিজ্ঞতা তা নয়। বরং এর আগেও মানুষ পৃথিবীতে আসার সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগত থেকে এসেছিল।
আমাদের বিশাল জীবন পথে পার্থিব এই জীবন ক্ষুদ্র এক অধ্যায় মাত্র।আমাদের এই চলার পথে কিছুটা অনন্ত জীবনের অধিকারী করেই আমাদের তৈরি করা হয়েছে।
অবশ্যই আমাদের এক সূচনা আছে, যখন আল্লাহ আমাদের আত্মাকে প্রথম সৃষ্টি করেন। পৃথিবীতে একবার মৃত্যুর স্বাদ পাওয়া ছাড়া এই আত্মা কখনোই মৃত্যবরণ করবে না বা এই আত্মার বিনাশ হবে না। পৃথিবীর এই মৃত্যুও প্রকৃত কোন বিনাশ নয়, বরং এক জগত থেকে অপর জগতে পা রাখার মাধ্যম।

শুধু মানুষ জানে তার মৃত্যুর কথা

শুধু মানুষ জানে যে তাকে একদিন মরতে হবে। আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদে মানবজাতিকে তার মৃত্যুর কথা অবহিত করেছেন। নবী-রাসুলরা তাঁদের উম্মতদের পার্থিব জীবনের পর আরেকটি জীবনের কথা বর্ণনা করেছেন। মানুষের মৃত্যুর কথা অবহিত করার কারণ হলো, যাতে তারা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। মৃত্যুর পর যদি আর কোনো জীবন না থাকত, তাহলে মৃত্যু নিয়ে কোনো চিন্তার কারণ থাকত না। মৃত্যু যদি জীবনাবসানের নাম হতো, তবে পৃথিবীতে যার যার ইচ্ছামতো চলার সুযোগ থাকত। কিন্তু মুমিন মাত্রই বিশ্বাস করে যে মৃত্যু মানে এক জীবন থেকে আরেক জীবনে প্রত্যাবর্তন। একটি জীবন শেষ করে আরেকটি নতুন জীবনের সূচনা করা। দুনিয়ার জীবন অস্থায়ী, আর পরকালের জীবন স্থায়ী। দুনিয়ার সুখ-শান্তি আখিরাতের সুখ-শান্তির তুলনায় তুচ্ছ ও অতি নগণ্য।

ইসলামি বিশ্বাসে কিয়ামত ও হাশর–নশর

ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের প্রধান হলো ইমান বা বিশ্বাস। ইমানের প্রথম তিনটি বিষয় হলো তাওহিদ তথা স্রষ্টার একত্ববাদে বিশ্বাস, রিসালাত অর্থাৎ নবী-রাসুল বা প্রেরিত পুরুষদের প্রতি বিশ্বাস এবং আখিরাত মানে পরকালে বিশ্বাস। আখিরাত শব্দের অর্থ হলো পরে, আখিরাতের বিশ্বাস মানে হলো মৃত্যুর পরের জীবন, কবর বা বারজাখের প্রশ্নোত্তর এবং তথায় শান্তি ও শাস্তি, কিয়ামত বা মহাপ্রলয়, হাশর–নশর তথা পুনরুত্থান ও বিচারের জন্য সমবেত হওয়া, পাপ-পুণ্যের বিচার এবং বেহেশত-দোজখ অর্থাৎ পুরস্কার ও শাস্তি এবং সেখানে অনন্ত জীবনের প্রতি বিশ্বাস করা। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তারা আখিরাত বা পরকালের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস পোষণ করে।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ৪)
কিয়ামতের তিনটি অবস্থা রয়েছে, এর প্রথম পর্যায় হলো ব্যক্তির মৃত্যু। হাদিস শরিফে রয়েছে, ‘যখন কারও মৃত্যু হয়, তখন তার কিয়ামত সংঘটিত হয়।’ আলমে বারজাখ বা বারজাখ জগতে রুহ ও নাফস ইল্লিন বা ছিজ্জিনে অবস্থান করবে এবং দেহ হয়তো বিলীন হয়ে যাবে, নয়তো সুরক্ষিত থাকবে। এখানে প্রশ্ন হবে—তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? তোমার নবী কে? উত্তর হবে, ‘আমার রব আল্লাহ, আমার দ্বীন ইসলাম, আমার নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।’

দ্বিতীয় পর্যায় হলো মহাপ্রলয়, যার মাধ্যমে সব সৃষ্টি ধ্বংস অর্থাৎ লয় বা বিলীন হয়ে যাবে। এটি সংঘটিত হবে আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা হজরত ইসরাফিল (আ.)-এর শিঙায় প্রথম ফুত্কারের মাধ্যমে। কোরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ‘এ জগতে যা কিছু আছে সবই লয়প্রাপ্ত হবে, শুধু আপনার রবের অস্তিত্বই টিকে থাকবে।’ (সুরা-৫৫ আর রহমান, আয়াত: ২৬-২৭)। ব্যক্তিসত্তার মৃত্যু বা প্রথম কিয়ামতের পর থেকে এবং দ্বিতীয় কিয়ামত বা শিঙায় প্রথম ফুত্কারের পর থেকে পুনরুত্থান পর্যন্ত আলমে বারজাখ বা অন্তর্বর্তীকালীন জীবন।
তৃতীয় পর্যায় অর্থাৎ শিঙায় দ্বিতীয় ফুত্কারের পর চূড়ান্ত কিয়ামত অর্থাৎ হাশর ও নশর তথা পুনরুত্থান ও মহামিলন বা মহাসম্মিলন অনুষ্ঠিত হবে। এদিনই শেষ বিচারের দিন এবং আখিরাত বা পরকালের অনন্ত জীবনের সূচনা এদিন থেকেই হবে, যে জীবনের আর কোনো শেষ বা সমাপ্তি নেই, নেই কোনো সীমা বা পরিসীমা।
হাশরের দিনে প্রত্যেক মানুষকে পাঁচটি প্রশ্ন করা হবে। হাদিস শরিফে এসেছে, কিয়ামতের দিন কোনো আদম সন্তান পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ছাড়া এক পা–ও নড়তে পারবে না। এই বিষয়গুলো হলো জীবন, যৌবন, আয়, ব্যয় ও জ্ঞান। জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী ছিল? যৌবনকাল কীভাবে কাটিয়েছে? কীভাবে আয়-উপার্জন করেছে? কোন পথে ব্যয় করেছে? জ্ঞান বা বিবেক অনুসারে কর্ম করেছে কি না?

হাশরের দিন তিনটি পর্বে বিচার অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম পর্বে শুধু একটি প্রশ্ন থাকবে ইমান। অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ছিল কি না। দ্বিতীয় ধাপে বিচার করা হবে ‘হক্কুল ইবাদ’ বা বান্দার হক বিষয়ে। বান্দার হক বা অধিকার নষ্ট করলে আল্লাহ তা ক্ষমা করবেন না। শেষ পর্যায়ে বিচার হবে আল্লাহর হক তথা বিশেষ ইবাদতের, যাতে প্রথম প্রশ্ন হবে সালাত বা নামাজের।

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন