দোদুল্যমান নয়, দৃঢ়চেতা হন

christin-hume-Hcfwew744z4-unsplash
Fotoğraf: Christian Hume-Unplash

বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে গৌরবজনক একটি দেশ। এ গৌরবের অংশীদার প্রধানত এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের। বাংলাদেশের ইতিহাসে যার অবদান অনেক, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান একজন দৃঢ়চেতা মানুষ ছিলেন। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও এদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্যই এদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।
বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার দেশ। তলাবিহীন ঝুড়ির অভিযোগ এখন সাফল্যে পরিণত হয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল বাংলাদেশকে পরাজিত করার জন্য তারাই আজ বাংলাদেশের প্রশংসা করছে। সমস্যা আর সংকটের পাহাড় ঠেলে ঠেলে সামনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এটা আমাদের জন্য বড় অজর্ন। আমরা পরিশ্রমী আত্মবিশ্বাসী বলেই এগোতে পারছি।

এ দেশের মানুষ পরিশ্রমী তবে বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল অবলম্বন করে পরিশ্রম করতে পারে না। যার কারণে গাধার খাটুনি খেটেও উপযুক্ত পারিশ্রমিক বা ফল থেকে বঞ্চিত থাকে। দেশের অভ্যন্তরে যারা কাজ করেন দেশের উন্নয়নের জন্য, তাদের বিপুল অংশ শোষিত হয় মালিক শ্রেণির হাতে। এভাবে যারা বিদেশে কমর্রত তারাও নিরুপায় হয়ে গতর খাটেন এবং উপযুক্ত পারিশ্রমিক পান না। তারা আবার দালালদের মাধ্যমে প্রতারণা ও ভয়াবহ নিযার্তনের শিকার হন। কেউ কেউ জেলও খাটেন। নানা সঙ্কট ও সীমাবদ্ধতার মাঝে সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশ আপন গতিতে এগিয়ে চলছে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে। বাংলাদেশের এই উজ্জ্বল অভিযাত্রা আমাদের আশাবাদী করে তোলে। ’৭২ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ আর ২০১৮ সালের বাংলাদেশ এক নয়। তৎকালীন মাকির্ন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিলেন আর এখন বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে ‘এশিয়ার বাঘ’।

বাঙালি ইতোমধ্যে নানা দিকে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। বাংলার কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে ফসল ফলিয়ে ষোল কোটি মানুষের অন্নের জোগান দিচ্ছে। অথচ তারা ফসলের, শাকসবজির ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। তার পরও তারা দেশের কৃষি অথর্নীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এ দেশের শ্রমিকশ্রেণি দেশের অভ্যন্তরে যেমন বিভিন্ন গার্মেন্টস ও শিল্প কারখানায় কাজ করে দেশের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। একইভাবে এদের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রবাসে কমর্রত থাকায় রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বেড়েছে। বেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজাভর্ও। আমাদের দামাল ছেলেরা ক্রীড়া ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছে, আমাদের তরুণ-তরুণীরা এভারেস্ট জয় করেছে, বতর্মান সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় পোলিওমুক্ত বাংলা হয়েছে, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, বিপুল চাহিদার মধ্যে বিদ্যুৎ ঘাটতি অনেক কমেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্য এসেছে।

সেনাবাহিনী ও পুলিশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে গিয়ে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখন অনেক এগিয়ে। দেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট হাউসগুলো পুরোপুরিই তথ্যপ্রযুক্তির ওপর নিভর্রশীল। বোনম্যারো প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাফল্য দেখিয়েছে। পাট ও মহিষের জন্মরহস্য আবিষ্কৃত হয়েছে। এভাবে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছেছি। এসব দেখেবুঝেই হয়তো বতর্মান সরকার বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে।

অথৈর্নতিকভাবে যেসব দেশ শক্তিশালী ওইসব দেশ বিশ্বের মধ্যে প্রভাবশালীও। অন্যভাবে গণতান্ত্রিকভাবে যেসব দেশ প্রতিষ্ঠিত ওইসব দেশও মেরুদ- সোজা করে সচল রয়েছে। এ কথার সারবত্তা হচ্ছে, শক্তিশালী অথর্নীতি ও সুষ্ঠু গণতন্ত্রচচার্ই পারে দেশকে এগিয়ে নিতে। সে জন্য হিংসা-বিভেদ, হানাহানি ভুলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিতে হবে বলিষ্ঠ ভূমিকা। বাংলাদেশ সুস্থ ও স্বাভাবিক ধারায় চলতে না পারার শত কারণ রয়েছে। অন্যতম প্রধান কারণ দেশের একশ্রেণির মানুষের সীমাহীন লোভ, অসততা ও উচ্চাভিলাষ। এরা কেবল মানুষেরই শত্রু নয়, দেশেরও শত্রু।

দেশের পুরোপুরি উন্নয়ন চাইলে, দেশকে পূণর্মাত্রায় গণতান্ত্রিক ধারায় প্রতিষ্ঠিত করতে হলে রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐকমত্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে প্রয়োজন সরকারের কঠোর ও কাযর্কর পদক্ষেপ। যারা এসব কাজে যুক্ত থাকবেন তাদের হতে হবে দৃঢ়চেতা স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত। বাংলাদেশের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ জাতীয় ও আন্তজাির্তকভাবে থাকবেই। থাকবে দেশ নিয়ে নানা অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র। এর মধ্যেই প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে নিভের্য় সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। জয় আমাদের হবেই।

ইসলামেও দোদুল্যমান নয়, দৃঢ়চেতা হতে বলা হয়েছে। যারা দোদুল্যমান এদের স্বভাব মুনাফিকের মতো। তারা মাঝখানে দোদুল্যমান, না এদের দিকে, না ওদের দিকে; বস্তুতঃ আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি তার জন্য কক্ষনো কোন পথ পাবে না। তারা দোটানায় দোদুল্যমান, না এদিকে না ওদিকে![১] আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি তার জন্য কখনও কোন পথ পাবে না।

কাফেরদের কাছে গিয়ে ওদের সাথে এবং মুসলিমদের কাছে এসে এদের সাথে বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক থাকার কথা প্রকাশ করে। প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে না তারা মুসলিমদের সাথে আছে, আর না কাফেরদের সাথে। বাহ্যিক তাদের মুসলিমদের সাথে থাকলে অভ্যন্তর থাকে কাফেরদের সাথে। আবার কোন কোন মুনাফিক তো ঈমান ও কুফরীর মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থায় ঝুলতে থাকে। নবী করীম (সাঃ) বলেন, “মুনাফিক হল সেই ছাগীর মত, যে সঙ্গমের জন্য দু’টি পালের মধ্যে (পাঁঠার খোঁজে) ঘুরাঘুরি করে। কখনো এই পালের দিকে আসে, আবার কখনো অন্য পালের দিকে যায়।”