SalamWebToday নিউজলেটার
সালামওয়েবটুডে থেকে সাপ্তাহিক নিবন্ধ পাওয়ার জন্য সাইন আপ করুন
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

দোষারোপের ইমেইল? রাগ সামলে উত্তর দেবেন কীভাবে?

শিক্ষা ৩০ ডিসে. ২০২০
ফিচার
রাগ
© Fizkes | Dreamstime.com

একটা ঝকঝকে সকাল। নিয়ম মতো ব্রেকফাস্ট সেরে আপনি ল্যাপটপে লগ ইন করলেন। মেল বক্স খুলে দেখলেন সমস্ত মেলের উপরে একটি মেল জ্বলজ্বল করছে। মেলটা ওপেন না করেই আপনি বুঝতে পারলেন এই সেই মেল যে আপনার সারাদিনটা নষ্ট করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মেলটা এসেছে আপনার সেই কলিগের থেকে যে গত কয়েকদিন ধরে কাজে ভুল করে গিয়েছে, আর এখন সেই ব্যর্থতার রাগ প্রকাশ করেছে আপনার উপর।

শুধু তাই নয়, কাটাকাটা ব্যঙ্গোক্তিতে আপনার সিদ্ধান্তকে আক্রমণও করেছে।

প্রফেশনাল হিসাবে আপনি হয়তো শান্তভাবে মেলটির উত্তর দিলেন। অবস্থা অনুকূলে রাখতে ক্ষমাও চেয়ে নিলেন। কিন্তু কতবার? ক্রমাগত এরকম অভিযোগের মেল আসতে থাকলে একবার না একবার আপনার ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙবেই! আপনার উত্তরও তখন হয়ে উঠবে নির্দয় ও অভিযোগে পূর্ণ।

আমরা রাগ কেন সামলাতে পারি না?

বর্তমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে মানুষের আবেগ ও মানসিক দিক। ক্রমাগত ভয় ও অনিশ্চয়তা আমাদের ধৈর্য্য কমিয়ে দিয়েছে অনেকটাই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওয়র্ক ফ্রম হোমের চাপ। আমাদের এখন খুব সহজেই রাগ হয়ে যাচ্ছে। আর রাগ হওয়া মানেই ‘এফেক্টিভ কমিউনিকেশন’-এর বেশ খানিকটা ব্যাহত হওয়া।

মেহরাবিয়ানের তত্ত্ব অনুসারে আমাদের আবেগের সঠিক আদানপ্রদানের মাত্র ৭ শতাংশ প্রতিফলিত হয় কথা বলায় বা শব্দচয়নে। ৩৮ শতাংশ প্রতিফলিত হয় গলার স্বরে আর ৫৫ শতাংশ বডি ল্যাংগুয়েজ-এ। সুতরাং রাগ হলে এই সংখ্যাগুলি উলটে পালটে যায়, ফলে আমাদের উলটো দিকে থাকা মানুষ হয় আহত হয় নয় ভুল বোঝে আমাদের।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, স্ত্রী যদি কোনও তর্কের শেষে শান্তভাবে ঠিক আছে বলেন স্বামীর অস্বস্তি শুরু হয় সেখান থেকেই। আদতে কিছুই যে ঠিক নেই, এমনটাই বোঝায় স্ত্রীর গলার স্বরে।

তবে এর থেকেও বেশি অস্বস্তির সৃষ্টি হয় মেল বা টেক্সটের মাধ্যমে। যেহেতু আমরা যা বলতে চাই তার মাত্র ৭ শতাংশ কথার মাধ্যমে বোঝাতে পারি, তাই ৯৩ শতাংশ টেক্সট বা মেল থেকে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থাকে। তার থেকেই হয় বিচ্ছেদ ও সম্পর্কের ইতি।

অদ্ভুত ভাবে, একই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ভাবে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। যে বিষয়ে আপনি ভীষণ রেগে যাচ্ছেন, আপনার বন্ধুই হয়তো সেই বিষয়টায় রেগে যাওয়ার কিছু পাচ্ছে না।

আমাদের রাগ কেন হয়?

মনোবিজ্ঞান বলে, রাগ খুব স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে না রাখলে তা হয়ে উঠতে পারে বিধ্বংসী।

এই একলাইনের সংজ্ঞায় কিছুই বোঝা যায় না যতক্ষণ না আমরা নিজেদের জীবনে বিধ্বংসী রাগের পরিচয় পাচ্ছি।

মনোবিজ্ঞান এটাও বলে যে নিয়ন্ত্রিত রাগ অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করতে পারে, শুধু আমাদের চিনে নিতে হবে আমরা ঠিক কোন কারণে রাগান্বিত।

সাধারণত মানুষের রাগ চার প্রকার-

ন্যায়পরায়ণ রাগঃ

সম্ভবত যে কয় প্রকার রাগ রয়েছে তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে সদর্থক। যখন আমরা অত্যাচার, সামাজিক অবনমন, অন্যায় ও অবিচারের কারণে রেগে যাই। এর মধ্যে বিশ্বাসভঙ্গের রাগও অন্তর্ভূক্ত। এই রাগকেই যদি নিয়ন্ত্রিত ভাবে লক্ষ্য পূরণের কাজে ব্যবহার করা যায় তাহলে অবশ্যই সাফল্য আসে।

ভয় থেকে রাগঃ

অনেকসময় আমাদের দুর্বলতা অন্যের সামনে প্রকাশ হয়ে যাবে এই ভয় থেকে ক্রোধের জন্ম হয়। মূলত নিজের দুর্বলতা ঢাকার ঢাল হিসাবে এই রাগ ব্যবহৃত।

যন্ত্রণা থেকে রাগঃ

মানসিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তি থেকে রাগের সৃষ্টি হয়। আমরা যখন মানসিক ভাবে আহত হই তখন অনেকসময়ই সঠিক কারণ প্রকাশ না করে রাগের মাধ্যমে নিজেদের যন্ত্রণা প্রকাশ করি। আসলে, অন্যান্য জটিল মানসিক অনুভূতির থেকে রাগ প্রকাশ করা তখন বেশি সহজ হয়।

অনিশ্চয়তা থেকে রাগঃ

নিজেকে নিয়ে অনিশ্চয়তা বা অন্যান্য কোনও বিষয়ে আমরা যদি অনিশ্চিত হই তাহলে সেটির প্রকাশ রাগের মাধ্যমে ঘটে। এর মূল কারণ, অনেকক্ষেত্রেই আমরা নিজেদের অনিশ্চয়তা নিজেরা বুঝে উঠতে পারি না।

আর সেইসব মুহূর্তে রাগ আমাদের একটা নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার অনুভূতি প্রদান করে। যদিও এই অনুভূতির প্রায় পুরোটাই সঠিক নয়।

আসল কথা, আমাদের নিজের ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক অবস্থার উপর অনেকাংশেই নির্ভর করে কোন ক্ষেত্রে আমাদের রাগ হবে এবং কোন ক্ষেত্রে হবে না।

তবে, যেকোনও অবস্থাতেই নিজের আসল অনুভূতি গোপন করে ‘প্যাসিভ অ্যাগ্রেসিভ’ ব্যবহার করা উচিত নয়। এটি আমাদের নেগেটিভ ইগোর প্রকাশ মাত্র!

রাগ সামলানোর সঠিক উপায় কী?

রাগ সামলানোর কতগুলো সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম রয়েছে। তার মধ্যে প্রাথমিক হল,

কক্ষনও রেগে থাকা অবস্থায় কোনও অভিযোগ সমন্বিত মেল বা টেক্সটের উত্তর দেবেন না। রেগে থাকা অবস্থায় বাদানুবাদে যাবেন না।

সময় নিন, অপেক্ষা করুন রাগ একটু কমে যাওয়ার। বড় করে শ্বাস নিন। তারপর উত্তর করুন।

যদি দেখেন খানিকক্ষণ পরেও রাগ কমছে না, রেগে যাওয়ার কারণগুলি একটা কাগজে পরপর লিখতে শুরু করুন। তাতেও না কমলে উঠে খানিকটা হেঁটে আসুন, কফি বানান। এ ধরনের ছোট কাজগুলো অনেকসময়ই রাগের ক্যাথারেসিসে সাহায্য করে।

ফিরে এসে যদি দেখেন আপনার মাথা প্রয়োজনীয় শান্ত হয়ে গিয়েছে, তখন উত্তর করুন। তবে, তার আগে আপনার প্রতি করা অভিযোগটিতে একবার চোখ বুলিয়ে নেবেন অবশ্যই।

মেলে উত্তর লেখার সময় কতগুলো জিনিস খেয়াল রাখবেন,

১। সবসময় আপনার উত্তর শুরু করলে সদর্থক বাক্য ও শব্দ দিয়ে। উল্টোদিকের মানুষের রাগ ও তার কারণকে যে আমি যথাযথ মূল্য দিচ্ছেন তা যেন আপনার লেখায় প্রকাশ পায়।

২। নিজের হয়ে বেশি কথা বলবেন না, যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবেন।

৩। কক্ষনও দুজনের মধ্যে হওয়া রাগারাগির মধ্যে অন্য কাউকে জড়াবেন না। তাই অফিশিয়াল মেলে এই অবস্থায় ‘রিপ্লাই অল’ ক্লিক করা একেবারে নিষেধ।

৪। উত্তর শেষ করবেন সদর্থক ভাবে। নিজের যুক্তি দিলেও সেটা যেন কোনওভাবে অপরজনকে ছোট না করে সেই বিষয়ে খেয়াল রাখবেন।

৫। যদি দেখেন কোনও ভাবেই লিখে এটার সমাধান হবে না, সামনাসামনি বা ফোনে মিটিং-এর জন্য অনুরোধ করবেন।

বিশ্বাস করুন, পরিণত ও প্রফেশনাল হওয়ার এটাই প্রমাণ। আপনি আপনার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

মহামান্য নবী রাসুল(সাঃ) নিজে রাগ সামলানোকে অত্যন্ত পরিণত ও মানসিক স্থিরতার নিদর্শন বলে মনে করতেন।

ইবন আব্বাসের কথায় জানতে পারি, নবী বলেছেন, ‘সে প্রকৃত বীর নয়, যে কাউকে কুস্তীতে হারিয়ে দেয়। বরং সেই প্রকৃত বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ [আল হাদিস]

রাগ স্বাভাবিক, মনোবিজ্ঞান বলে। কিন্তু খেয়াল রাখবেন রাগ যেন অহ্ংকারে পরিণত হয়ে আপনার কর্মজীবন ও সম্পর্কগুলিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে না দেয়।