দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করার মাধ্যমে সন্তানের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করুন (২য় পর্ব)

শিক্ষা ২৮ ফেব্রু. ২০২১ Contributor
ফিচার
সন্তানের ভবিষ্যত
oto 47845294 © Garudeya | Dreamstime.com

শিশুর প্রথম পাঠশালা

শিশুর প্রথম পাঠশালা হল মায়ের কোল। এখানে সে জীবনের অনেক কিছু শেখে। সন্তানের ভবিষ্যত সুরক্ষিত হয়।  পরবর্তীতে এটাই তার চিরাচরিত অভ্যাসে পরিণত হয়। একারণে ইসলামী শরীয়তে এই পাঠশালাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

শরীয়তের আদেশ হল, শিশু ভূমিষ্ট হওয়া পরপরই শিশুর ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত দিবে। যেন তার জীবন শুরু হয় আল্লাহর বড়ত্বের বাণী ‘আল্লাহু আকবার’ দিয়ে। এরপর পিতামাতা দায়িত্ব হল সন্তানের ভালো অর্থবোধক নাম রাখা। বাচ্চা কথা বলা শিখলে তাকে সর্বপ্রথম আল্লাহর নাম শেখানোর চেষ্টা করা উচিত। যিনি এই সন্তান দান করলেন এরপর তাকে বাকশক্তি দিলেন তার নাম সর্বপ্রথম শেখানোই কৃতজ্ঞ বান্দার পরিচয়।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সন্তানকে প্রথম কথা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শেখাও এবং মৃত্যুর সময় তাদেরকে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর তালকীন করো।”

সন্তানকে অল্প বয়স থেকেই আল্লাহর পরিচয় শেখানো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম শেখানো, গল্পে গল্পে তাঁর পরিচয় ও আখলাক তুলে ধরা পিতামাতার কর্তব্য। এককথায় তার জীবনের প্রথম পাঠশালা থেকেই যেন সে দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করতে পারে।

সন্তানের জন্য বিধর্মীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দেওয়া

এখন সর্বত্রই খৃষ্টান মিশনারীদের বহু স্কুল রয়েছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য এসব স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মুসলমান। শিক্ষকদের মধ্যেও বিধর্মী এবং মুসলমান উভয় ধরনের রয়েছে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে স্কুলের শিক্ষা কারিকুলাম নিয়ন্ত্রিত হয় মিশনারীদের কর্তৃক।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার দ্বারা একদিকে তো শিক্ষার্থীদের নিজ ধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়, অন্যদিকে সম্পূর্ণরূপে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের ভবিষ্যতটা ঐ ধাঁচেই গড়ে ওঠে। তাই সন্তানের জন্য এমন স্কুল নির্বাচন করা যা তাঁকে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দেয় একটি মস্ত বড় ভুল।

একজন সাধারণ মুসলমানেরও কমপক্ষে এতটুকু সচেতনতা ও আত্মমর্যাদাবোধ থাকা চাই যে, নিজের সন্তানকে কোনো বিধর্মীর হাতে তুলে দিবে না। একটু লক্ষ করে দেখুন তো কোনো ইহুদী বা খৃষ্টান কি তাদের সন্তানকে কোনো মুসলিমের হাতে এভাবে তুলে দেয়? তারা এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, ছাত্রের উপর তার শিক্ষকের অনেক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে পরিণত বয়সের আগে তো শিক্ষকের অনেক কিছুই শিক্ষার্থীর হৃদয়পটে অঙ্কিত হয়ে যায়। তাই সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য দ্বীনি মাদরাসাগুলোই সবচেয়ে উপযোগী।

কিন্তু কেউ যদি এতটুকু না পারেন তবে সন্তানের জন্য অন্তত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন শিক্ষকমন্ডলী এবং ধর্মীয় ভাবধারার স্কুল নির্বাচন করা পিতামাতার কর্তব্য। এক্ষেত্রে পিতামাতার একটু ভুল পদক্ষেপ সন্তানের জন্য বড় ধরনের সর্বনাশ ডেকে আনে।

উপার্জন কেন্দ্রিক শিক্ষা নির্বাচন

আজকাল শিক্ষাকে সকলেই পেশা হিসেবে অবলম্বন করে থাকে। যে শিক্ষায় বেশি টাকা আয় করা যাবে সেটাই সকলে চায়। তা হোক না কেন যতই অসার ও অযৌক্তিক। আবার যে শিক্ষায় শিক্ষিত হলে এমন চাকরি করা যায় যেখানে মূল বেতনের পাশাপাশি অবৈধ উপার্জনেরও পথ খোলা থাকে, সেটাকে সাগ্রহে নির্বাচন করা হয়। অর্থাৎ পিতামাতারও সন্তানকে শিক্ষিত বানানোর মূল উদ্দেশ্য থাকে বেশি আয়-রোজগার। ফলে সন্তান সেবার মানসিকতা ছেড়ে ধীরে ধীরে কমার্শিয়াল মানসিকতার হয়ে গড়ে উঠে।

শিক্ষাকে প্রকৃত মানুষ হওয়ার উপকরণ হিসেবে এবং দেশ ও জাতির সেবার মানসিকতা নিয়ে শিখতে হবে। তবেই তা হবে সুশিক্ষা। এই দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করা গেলে নিজের ও জাতির উপকার হয় এমন জ্ঞানার্জনের সুযোগ হবে। সাথে সাথে প্রকৃত মানুষ গড়ার আসল শিক্ষা কুরআন ও সুন্নাহ শেখারও সুযোগ বের হয়ে আসবে।

সন্তানকে স্বাধীনতার নামে মুক্ত ছেড়ে দেওয়া

বর্তমানের সুশীল সমাজ সন্তানের ব্যাপক স্বাধীনতার প্রবক্তা। এই নীতি মুসলিমদের নয়, বরং ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আমদানীকৃত। যখন সন্তানের আখলাক-চরিত্র গঠনের মূল সময় তখন তাকে স্বাধীন ছেড়ে দেওয়াটা অনেক বড় বোকামি। সে ভালো-মন্দ বাছাই না করে সব ধরণের পরিবেশে মিশে যার সাথে ইচ্ছা ঘুরাফেরা করে। ইন্টারনেটে সব ধরনের প্রোগ্রাম দেখতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে সে নানা ধরনের মন্দ প্রবণতায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে এই সন্তানই পিতামাতার কষ্টের কারণ হয়ে দাড়াঁয়।

সময়মত শাসন না করার কারণে বড় হয়ে পিতামাতার অবাধ্য হয়ে যায়। তাই এই ধরনের অবাধ স্বাধীনতা দুনিয়াতেও সন্তান এবং পরিবার কারোও জন্যই সুখকর হয় না। ফলে সমাজে বিশৃংখলা ও অপরাধ বৃদ্ধি পায় এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের এক বৃহৎ অংশ ধ্বংসের মুখে নিপতিত হয়ে যায়।

সন্তানকে অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া একটি ভুল চিন্তাধারা, ভুল পদক্ষেপ। শরীয়ত বলে, সন্তান পিতামাতার কাছে আল্লাহর আমানত। তার আখলাক-চরিত্র গড়ার দায়িত্ব পিতামাতার। সময় মতো তাকে শাসন করা, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা এবং সৎ ও দ্বীনী পরিবেশে রাখা পিতামাতার নৈতিক দায়িত্ব।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “… সন্তানের বয়স সাত বছর হলে তাদের নামাযের আদেশ দাও, দশ বছর বয়সে নামাযের জন্য তাকে শাসন কর এবং এ বয়সে তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।’ (মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ)

এভাবে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই যদি পরিপূর্ণভাবে দ্বীনি পরিবেশে লালন-পালন করা হয় এবং দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া হয় তবে তাঁদের ভবিষ্যত যে কতটা উজ্জ্বল হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

(সমাপ্ত)