দ্বীনি শিক্ষা-র মাধ্যমে সন্তানের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করুন (১ম পর্ব)

শিক্ষা ২৮ ফেব্রু. ২০২১ Contributor
মতামত
দ্বীনি শিক্ষা
Photo by Adli Wahid on Unsplash

সন্তান পিতামাতার নিকট আমানত

সন্তান পিতামাতার নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। তাদেরকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া, এবং একজন মুমিন হিসাবে গড়ে তোলা পিতামাতা ও অভিভাবকের কর্তব্য। কারণ, আজকের সন্তানই আগামীদিনে জাতির কর্ণধার হবে। তাই সন্তান সুশিক্ষা না পেলে তা জাতির জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। আর পিতামাতাও আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসিত হবে।

আজকাল সন্তানকে বৈষয়িক শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং উপার্জনক্ষম করে গড়ে তোলাকেই পিতামাতা একমাত্র দায়িত্ব বলে মনে করা হয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সন্তানকে হালাল ও বৈধপন্থায় উপার্জন শেখানোও পিতামাতার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটিই তাঁদের একমাত্র দায়িত্ব নয়; বরং সন্তানকে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি শেখানো, দ্বীনি শিক্ষা ও শরীয়তের মৌলিক বিষয়াদি শেখানো এবং একজন দ্বীনদার ও প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও পিতামাতার অপরিহার্য দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

হাদীসে এসেছে- “জেনে রেখো, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। পুরুষ তার পরিবারবর্গের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তাদের ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।” (বুখারী)

সুসন্তান যেমন পিতামাতার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের বড় সম্পদ এবং সদকায়ে জারিয়া তেমনি সন্তান যদি দ্বীন ও শরীয়তের অনুগত না হয়ে দুর্নীতি ও গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায় তাহলে সে উভয় জগতেই পিতামাতার জন্য বিপদস্বরুপ। দুনিয়াতেও এগুলি লাঞ্ছনা ও পেরেশানির কারণ। এবং আখিরাতেও পিতামাতা এই গুনাহের কর্মফল ভোগ করতে থাকবে। আখিরাতে আপনার এই আদরের দুলালই আপনার বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে নালিশ করবে যে, তারা আমাকে দ্বীন শেখায়নি। তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। তাই এই আমানতের হক আদায়ের প্রতি খুবই যত্নবান হতে হবে। কারণ এই আমানতের যথাযথ হেফাজতের উপরই নির্ভর করছে আপনার সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যত ও আপনার নাজাতের ব্যবস্থা।

বিজাতীয়দের রীতিনীতি অনুসরণ ও দ্বীনি শিক্ষা না দেওয়া 

কুরআন-হাদীসের একটি মৌলিক শিক্ষা হল, আচার-ব্যবহার, কৃষ্টি-কালচার, সাজসজ্জা ইত্যাদিতে ইসলামের স্বাতন্ত্রতা থাকা। এসব ক্ষেত্রে বিজাতীয়দের অনুকরণকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। এটা দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান।

হাদীসের ‘কিতাবুল আদাব’ অধ্যায়ে এবং অন্যান্য প্রসঙ্গে বিধর্মীদের অনুকরণ না করার এবং কৃষ্টি-কালচারে তাদের বিরোধীতা করার অনেক তাকীদ এসেছে। একটি হাদীসে এসেছে, “যে ব্যক্তি কোনো জাতি বা সম্পদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করল সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।”

সুতরাং শিক্ষা-দীক্ষা ও রীতিনীতিতে বিজাতীয়দের অনুকরণ, অনুসরণ করা এবং সে অনুযায়ী সন্তানদের গড়ে তোলা মারয়াত্মক রকমের ভুল। এতে ইসলাম থেকে সে ধীরে ধীরে এমনিভাবে বের হয়ে যাবে যার উপলব্ধিও আপনার হবে না।

কুরআন ও দ্বীনি শিক্ষা না শেখানো

একজন মুসলিম তার সন্তানকে আল্লাহর কালাম শেখাবে না এটা কি কল্পনা করা যায়? কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ মুসলমানের অবস্থাই এরকম। ভেবে দেখুন, লাখ লাখ টাকা খরচ করে সন্তানকে দুনিয়াবি শিক্ষায় শিক্ষিত করা যাচ্ছে কিন্তু কুরআন পড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কাল হাশরের ময়দানে এই সন্তানই আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করবে। স্বয়ং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লামও এরকম মানুষদের ব্যাপারে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ করবেন। কুরআনে এসেছে- “রাসূল সেদিন বলবেন, হে আমার রব, আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে!” (২৫:৩০)

এরকম মানুষদের বিরুদ্ধে স্বয়ং কুরআনের অভিযোগ করার কথাও এসেছে। তাই আমাদের অত্যন্ত সচেতন হওয়া উচিত সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে পিতামাতার নিকট আমানত। তাই এ ব্যাপারে ভেবে চিন্তে পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদেরকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানান এতে কোনোআপত্তি নেই। কিন্তু তাদেরকে ঈমানদার বানানোও আপনার কর্তব্য। সন্তান কুরআন পড়তে ও বুঝতে পারে কমপক্ষে এতটুকু যোগ্যতা তো তার মধ্যে গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর(রাযিঃ)-এর ছেলে আব্দুল্লাহ, যখন সূরা বাকারা সমাপ্ত করেছিলেন তখন বাবা খুশিতে উট যবাই করে আশেপাশের লোকদেরকে দাওয়াত করে খাইয়েছিলেন। আজ আমরাও মিষ্টিমুখ করি কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হয় সন্তান খৃষ্টান মিশনারীদের নামি দামি স্কুল-কলেজে চান্স পেয়েছে এজন্য। সন্তান বৃত্তি পেয়ে ইসলামের জঘন্যতম শত্রু ইহুদীদের ইউনিভার্সিটিতে সম্পূর্ণ বৈরী পরিবেশে পড়ার সুযোগ পেয়েছে এজন্য।

তাই আপনার কলিজার টুকরা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য তাদেরকে বিধর্মীদের হাতে সোপর্দ না করে আসুন সাহাবায়ে কেরামের মত আমরাও সন্তানদেরকে আল্লাহ তা’আলার কালাম শেখাই। আসমান-জমিনের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র, নূরানী ও সবচেয়ে বরকতময় কালাম।

আপনার সন্তানের কচি মনে যদি আল্লাহর পবিত্র কালাম স্থান পেয়ে যায় তাহলে পরবর্তী জীবনে কখনও প্রতিকূল পরিবেশের সম্মুখীন হলেও অন্তরের এই নূর তাকে সৎ পথে চলতে সাহায্য করবে। সে খড়কুটার মতো অন্যায়-জুলুমের জোয়ারে ভেসে যাবে না ইনশাআল্লাহ।

দ্বীন না শেখানো

সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দেয় না এমন পিতামাতার যদি শতকরা ৭০ জন হয়ে থাকে তবে দ্বীন শেখায় না এমন পিতামাতার হার শতকরা ৯০-৯৫ ভাগ। সালাত কিভাবে আদায় করবে তাও সন্তানকে শেখায় না। হালাল-হারামের পার্থক্য, পাক-নাপাক, অযু-গোসল তো আরও দূরের কথা। অথচ সন্তানকে দ্বীনের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি শেখানো পিতা-মাতার উপর ফরয করা হয়েছে। দ্বীন না শেখানো সন্তানের উপর সবচেয়ে বড় জুলুম।

বাবা-মাকে এ জুলুমের জন্য কিয়ামতের দিন কঠিন জবাব দিতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সতর্কবাণী, “পুরুষ তার পরিবারবর্গের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তাকে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত করা হবে।” (বুখারী)

সন্তানকে ইসলাম বিদ্বেষী করে গড়ে তোলা

আধুনিকতার দোহাই দিয়ে অনেক পিতামাতাই তাদের সন্তানদেরকে ইসলামের আহকাম ও ইসলামী সংস্কৃতির ব্যাপারে সম্পূর্ণ বিদ্বেষী করে গড়ে তুলছেন। টুপি-দাড়ি, আলিমসমাজ, মাদরাসা-মসজিদ ইত্যাদি বিষয়ে একটা নেতিবাচক ধারণা তাঁদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে। শিক্ষক বাছাইয়ে যেমন ভুল করা হয়; উপরন্তু স্যাটেলাইট চ্যানেল, ইন্টারনেট এর অবাধ ব্যবহার তো আছেই। সাথে সাথে নাস্তিক্যমনা লেখকদের বইপত্র পড়তে দেওয়া হয় এবং এই মানসিকতা সম্পন্ন লোকদের পরিবেশেই তাদের বিচরণকে বিচক্ষণতার সাথে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। এভাবে শিশুর মন-মানসকে দ্বীনের ব্যাপারে বিষাক্ত করে দেওয়া হয়। এটা মারাত্মক একটি ভুল। এজন্য পিতামাতাকে আল্লাহর দরবারে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

 

(চলবে)