‘দ্য মুসলমান’, বিশ্বের একমাত্র হাতে লেখা দৈনিক সংবাদপত্র

handwritten newspaper

সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে নাস্তা-পানির টেবিলে যে জিনিসটা আমাদের প্রত্যেকেরই চাই-ই চাই… তা হল একখানি খবরের কাগজ বা সংবাদপত্র। যাতে পাওয়া যাবে দেশ-বিদেশের নানা হাল হকিকত। সোশ্যাল মিডিয়া মারফত সারা দিনেই টুকরো টুকরো নানা খবর পেয়ে গেলেও আজকের দিনে দাঁড়িয়েও খবরের কাগজের কোনও বিকল্প নেই। আমাদের ভাবতে ভারি অবাক লাগে বর্তমান সময়ে সংবাদপত্রের যে রূপটি আমাদের সামনে উঠে এসেছে তারও কিন্তু রয়েছে একটা পূর্বাপর ইতিহাস।

টাইম মেশিনের বন্দোবস্ত যদি করা যেত তাহলে আমারা অনায়েসেই চলে যেতে পারতাম ফেলে আসা অষ্টম দশকের দোড়গোড়ায়, চীনদেশে। বিভিন্ন তথ্য থেকে ইতিপূর্বে জানা গেছে সেই সময়ে চীন থেকে কাইয়ুয়ান ঝা বাও নামে একটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হত, যার বাংলা প্রতিশব্দ করলে হয় ‘আদালতের বার্তা’। সাধারণত নাম থেকে ধারণা করতে পারা যায়, প্রশাসনিক নিয়ম-নীতি সংক্রান্ত নানা তথ্য এতে লেখা হত। এখন অবশ্য আধুনিক সময়ের সঙ্গে তাল রেখে সংবাদপত্র বিপণন ব্যবস্থা এবং পরিবেশনার ক্ষেত্রে এসেছে নানা পরিবর্তন। মুদ্রণযন্ত্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চোখে পড়েছে বিভিন্ন ডিজিটাল ভার্সনও।

ঊর্দু দৈনিক ‘দ্য মুসলমান’ 

তবে এতসব আয়োজন, প্রগতি এবং প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা আপনাদের সামনে একটা অন্যরকমের দৃষ্টান্ত উপস্থাপনের চেষ্টা করব। প্রাচীন উর্দূ ভাষায় প্রকাশিত দৈনিক সংবাদপত্রের কথা বলা প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকদের আলোচনাতে বারবারই এসেছে ‘দ্য মুসলমান’ পত্রিকাটির কথা। পত্রিকাটি ভারতের চেন্নাই শহর থেকে প্রকাশিত। পুরো পত্রিকাটিই উর্দূ ভাষায় লেখা। এই প্রসঙ্গে আরও দুটি অবাক করা তথ্য উল্লেখ করতে হয়।

এক, পত্রিকাটি সান্ধ্যকালীন একটি পত্রিকা অর্থাৎ সন্ধেবেলাতে প্রকাশিত হয়। দুটি, জনমানসের কাছে পত্রিকাটি পৌঁছনোর আগে অর্থাৎ মুদ্রণ যন্ত্রের মাধ্যমে পত্রিকা প্রকাশের আগে চারপাতার এই বিশেষ পত্রিকাটির পুরোটাই হাতে লেখা হয়ে থাকে বা আমরা বলতে পারি ক্যালিগ্রাফি করা হয়ে থাকে। পত্রিকা প্রকাশনার এই পদ্ধতিতে একদিকে যেমন অভিনবত্ব রয়েছে, তেমনই এই কাজটি যে বেশ শ্রমসাধ্য সেকথা স্বীকার না করে কোনও উপায়ও নেই।

প্রকাশের ইতিহাস

ফিরে যাওয়া যাক পত্রিকা প্রকাশের কালে। তখন ১৯২৭ সাল। সৈয়দ আজাতুল্লাহ পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিলেন। পত্রিকা প্রকাশের সময়ে উদ্ধোধক রূপে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মাদ্রাজ অধিবেশনের সভাপতি ডা মুকতার আহমেদ আনসারী। পত্রিকা প্রকাশের দিন থেকেই প্রতিষ্ঠাতারা সংবাদপত্রের ক্যালিগ্রাফির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সমগ্র পত্রিকাতে যে নিপুণ এবং দক্ষ ক্যালিগ্রাফির নিদর্শন ফুটে ওঠে তা সত্যিই সংবাদপত্রপ্রেমী মানুষদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে থাকে। পত্রিকাটির মূল প্রতিষ্ঠাতা আজাতুল্লাহর মূলত উদ্দেশ্যই ছিল স্থানীয় মুসলমানদের কথা, তাঁদের জীবন এবং জীবিকার কথা উর্দূ ভাষার মাধ্যমে জনসমক্ষে নিয়ে আসা। বলা যেতে পারে তাঁর ভাবনাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মও।

সৈয়দ আজাতুল্লাহের পরে তাঁর পুত্র সৈয়দ ফাজলুল্লাহ এই পত্রিকার দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে পালন করেছিলেন। ২০০৮ সালে তাঁর মৃত্যু হলে এই পত্রিকার সম্পাদক হন সৈয়দ আরিফুল্লাহ। সুতরাং, আমরা বলতে পারি প্রজন্মের পর প্রজন্মের ধরে ‘দ্য মুসলমান’ কিন্তু তার সনাতন এবং চিরন্তন ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রযুক্তি এবং প্রগতির সংসর্গ বাঁচিয়ে সে কিন্তু তাঁর নিজ ঐতিহ্য, নিজ নীতিরক্ষায় অবিচল। ব্যস্ত এই আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে অনেকেই অনেক সময়ে সম্পাদকদের কাছে জানতে চেয়েছেন ‘দ্য মুসলমান’ কি আজীবন হাতে লিখে ক্যালিগ্রাফির মধ্যে দিয়েই প্রকাশিত হবে? সম্পাদকেরা এক্ষেত্রে বেশ অকপটেই সম্মতিসূচক বক্তব্য জানিয়েছেন। তাঁদের মতে এতেই পত্রিকার প্রথাগত ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব।

পত্রিকার কারুকার্য

পত্রিকাটিতে যারা ক্যালিগ্রাফির কাজে নিযুক্ত তাদেরকে সাধারণত ‘কাতিব’ বলা হয়ে থাকে। ২০০৮ সালে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে ক্যালিগ্রাফির এই দলে দুইজন পুরুষ এবং দুইজন মহিলা নিযুক্ত ছিলেন। যাঁরা প্রতিটি পৃষ্ঠা লেখার জন্য প্রায় তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করতেন। অত্যন্ত যত্ন নিয়ে তাঁরা নিজেদের কাজটুকু করবার চেষ্টা করতেন।

পত্রিকার পাতায় পাতায় রয়েছে নানা ধরনের খবর। তবে উল্লেখ করার মতো বিষয় হল ‘দি মুসলমান’ পত্রিকাতে কোনও ব্রেকিং নিউজ প্রকাশ করা হয় না। তার হয়তো অন্য কারণ রয়েছে। অনুমান করা যায় ব্রেকিং নিউজের স্থায়িত্ব অত্যন্ত সাময়িক, খবরের গুরুত্বও তাৎক্ষণিক তাই হয়তো এই ধরনের খবর পরিহার করা হয়ে থাকে। তাহলে কী থাকে চারপাতার এই পত্রিকাতে? জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক খবর প্রকাশিত হয় প্রথম পাতায়, দ্বিতীয় পাতাতে থাকে সম্পাদকীয়, তৃতীয় পাতায় স্থানীয় খবরাখবর এবং চতুর্থ পাতায় থাকে খেলাধুলার খবর।

এই প্রসঙ্গে আরও একটু চমকপ্রদ তথ্য পাঠকদের জন্য উল্লেখ না করলেই নয়। হাতে লেখা এককথায় নিতান্তই শ্রমসাধ্য এই পত্রিকাটির দাম সত্যিই যৎসামান্য। ২০১৮ সালে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মাত্র ৭৫ পয়সা। সুতরাং ঐতিহাসিক জিনিস সংগ্রহের প্রতি যাদের আলাদা আকর্ষক রয়েছে তারা কিন্তু অবশ্যই চেন্নাই ভ্রমণকালে এটি সংগ্রহ করতে পারেন।

আজকের এই আধুনিক সময়ে যখন ছাপার হরফে বই বা পত্রিকা পড়বার অভ্যাস ক্রমশ অবলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে সেইখানে দাঁড়িয়ে ‘দ্য মুসলমান’-এর এই অভিনব প্রয়াস নিঃসন্দেহে কুর্নিশযোগ্য।