দ্রুত আবশ্যক হয়ে পড়ছে খাদ্য সংরক্ষণের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি

food preservation
ID 158579145 © Nataliia Yankovets | Dreamstime.com

ভারতে যখন আমের মৌসুম থাকে, তখন মায়েরা এই ফল বেশিদিন উপভোগ করার জন্য এবং কোনো ফল যেন নষ্ট না হয় এ কারণে প্রচুর পরিমাণে আচার তৈরি করেন।

যে কোনো শহরের ছোট গলি দিয়ে হাঁটুন; আপনি দেখতে পাবেন পুরানো বিছানার চাদরে শুকনো মরিচ রোদে শুকাতে দেওয়া রয়েছে।

এগুলি হল ঐতিহ্যবাহী কিছু পদ্ধতি যা কিছু পরিবার এখনও মূল্যবান খাবার অপচয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য অনুশীলন করে যাচ্ছে।

পৃথিবী জুড়ে সবচেয়ে অপচয় হওয়া সম্পদ হল খাদ্য। দুর্বল পরিবহণ  ব্যবস্থা এবং ফসল সংগ্রহের দুর্বল পদ্ধতির কারণে উত্পাদিত খাদ্যের এক তৃতীয়াংশ অপচয় হয়; যার পরিমাণ ১.৩ বিলিয়ন মেট্রিক টন তথা ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান! অপরদিকে জাতিসংঘের মতে, প্রতিদিন ৯০কোটি মানুষ অনাহারে থাকে। যার অর্থ খাদ্য অপচয় রোধ করা গেলে কোনো মানুষই আর অনাহারে দিন কাটাবে না।

গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসকরণ

আমরা আজ অবগত হয়েছি যে, খাদ্যদ্রব্য পচনের ফলে মিথেন গ্যাস নির্গত হয় যা প্রাণিজগতের জন্য হুমকিস্বরূপ গ্রীন হাউস গ্যাসের ৩০% নির্গমনের জন্য দায়ী।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০১৩-তে, আয়োজক দেশ মঙ্গোলিয়া, UNEP এবং FAO এই বিষয়টির প্রচারণায় খুবই মনোনিবেশ করেছে।

আশ্চর্যের বিষয়, মঙ্গোলিয়া এখন বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশই নয় বরং বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধমান দেশও।

প্রকৃতিগতভাবে যাযাবর হওয়ার পরও এর বেশিরভাগ উপজাতির মধ্যে শীতকালে অতিরিক্ত খাদ্য সঞ্চিত করে রাখার ঐতিহ্যগত পদ্ধতি রয়েছে।

এই কর্মসূচির অংশ হিসাবে, UNEP সকল দেশকে তাদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংরক্ষণের পদ্ধতিগুলি অন্য সকল দেশের সাথে শেয়ার করতে বলেছিল।

এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল, কীভাবে এই আন্তর্জাতিক আর্থিক ও খাদ্য সংকটকে প্রতিহত করা যায় এবং বিশ্বব্যাপী খাদ্যের মূল্য হ্রাসকল্পে কিভাবে খাদ্য অপচয়কে রোধ করা যায়।

“খাদ্য অপচয় হ্রাস করা একটি অর্থনৈতিক, নৈতিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, যা ক্ষুধা ও পুষ্টি থেকে জলবায়ু পরিবর্তন, বনভূমি এবং ভূমির অবক্ষয় থেকে আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে অন্যতম”, বলেছেন UN আন্ডার সেক্রেটারি-জেনারেল এবং UNEP এর নির্বাহী পরিচালক, আসিম স্টেইনার।

খাদ্য সংরক্ষণের পদ্ধতি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিভিন্নরকম। তাই স্বাভাবিকভাবে সংরক্ষিত খাবার রান্না করার পদ্ধতিও সকল সংস্কৃতিতে ভিন্নরকম।

মঙ্গোলিয়ান জেনারেল গাঙ্গিস খান তার সৈন্যদেরকে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য নিযুক্ত করেছিল যাতে এশিয়ান দেশ থেকে তাদের খাদ্য সংগ্রহ করতে না হয়। তারা সঞ্চিত মাংস গরম পানিতে ফুটিয়ে এক প্রকার পুষ্টিকর স্যুপ তৈরি করেছিল যা যোদ্ধাদের বেঁচে থাকার জন্য খুবই ফলদায়ক ছিল।

তুর্কিরাও মাংস সংরক্ষণের জন্য আলাদা পদ্ধতি অবলম্বন করে। তারা মাংসগুলা টুকরো টুকরো কেটে কেটে ছড়িয়ে রাখে যাতে মাংসের রস শুকিয়ে গিয়ে মাংস সংরক্ষিত থাকে।

ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিগুলি দেখায় যে, কীভাবে খাদ্য সংরক্ষণ করতে হয়

কিছু খাদ্য সংরক্ষণের পদ্ধতি সৌম্য ব্যাকটেরিয়া বা খাবারে ছত্রাক উৎপন্নের মাধ্যমে কাজ করে।

নিরামিষভোজীদেরও খাবার সংরক্ষণের জন্য অনেক প্রচলিত পদ্ধতি রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকায় চুনো নামে পরিচিত একটি হিমায়িত শুকনো আলু খুবই জনপ্রিয়। আলু পর্যায়ক্রমে পাঁচ দিন পাঁচ রাত বায়ুতে শুকাতে দেওয়া হয় যা তাদের দেশে ফ্রিজিং পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে করা হয় এবং আর্দ্রতা দূর হওয়ার কারণে বছরের পর বছর ধরে তা সংরক্ষণ করে রাখা যায়।

নাইজেরিয়া এবং কিছু পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে গ্যারি নামে এক প্রকার খাবার প্রচলিত আছে, যা শুকনো দানাদার ময়দা, কাসাভা কন্দ থেকে তৈরি করা হয় যা ধুয়ে, খোসা ছাড়িয়ে, ছাঁটাই করা হয়। একটি ব্যাগে রেখে এর অভ্যন্তরের সমস্ত পানি শুষে ফেলা হয় এবং এটি পরবর্তী সময়কালে ব্যবহার করার জন্য সংরক্ষণ করা হয়।

মাখন, ঘি, দুধের গুঁড়ো, দই, শুকনো মাংস, আচার, জ্যাম এবং বিখ্যাত সর্ক্রাট জাতীয় খাবারগুলি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক পরিচিত কিছু খাবার।

বার্ষিক ৩০০ মিলিয়ন টন পরিমাণ খাবারকে নষ্টের হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের পূর্বপুরুষদের অনুশীলিত এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিগুলিতে ফিরে যেতে হবে, এগুলি অনুশীলন করতে হবে। কারণ যে পরিমাণে খাবার প্রত্যহ অপচয় হয় তা বিশ্বের সমস্ত দরিদ্র এবং ক্ষুধার্তকে খাওয়ানোর জন্য যথেষ্ট।

উন্নত বিশ্বের গ্রাহকদের এখন তাদের ঐতিহ্যবাহী শিকড়গুলিতে ফিরে যেতে হবে এবং তাদের বর্জ্য গ্রাসের আধুনিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।