ধর্মনিরপেক্ষতা: খলিফার শাসনে শেষ আঘাত

ইতিহাস Contributor
মতামত
ধর্মনিরপেক্ষতা
© Bilal Kocabas | Dreamstime.com

উনবিংশ শতকে সাম্রাজ্যের অবশ্যম্ভাবী ক্রমশ পতন রোধ করার জন্য অটোমান সরকার মরিয়া চেষ্টা শুরু করে। সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ, আবদুলমেসিদ এবং আবদুলাজিজ সমগ্র সাম্রাজ্যে সংস্কার করার চেষ্টা করেছিলেন তানজিমাত (পুনর্গঠন) প্রয়োগ করার মাধ্যমে। সেই সময় যে পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল, তা আজও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাযুক্ত সমস্ত দেশে না হলেও অধিকাংশ দেশেই মেনে চলা হয়। এই উদার দর্শন হল ইউরোপীয় মডেলের অনুরূপ, যা সরকারকে ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং ধর্মনিরপেক্ষ ধারণাগুলি আইন এবং সরকারী অনুশীলনকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

কিন্তু এর ফলাফল যা প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা হয়নি। বরং ঘটেছিল ঠিক তার বিপরীত। এই পুনর্গঠনমূলক সংস্কারগুলি সাম্রাজ্যের পতন ঠেকাতে পারেনি বরং কিছু ক্ষেত্রে অ-ইসলামিক পরিচয়ের উপর জোর দেওয়ার ফলে সাম্রাজ্যের প্রজাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ধারণা মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। সেই যুগে, সার্বিয়া, গ্রীস, ওয়ালাচিয়া, মোডোভা, আবখাজিয়া, বুলগেরিয়া এবং আলজেরিয়ার মতো অটোমান প্রদেশগুলি ইউরোপীয় দখলদারি বা জাতীয়তাবাদের জেরে আলাদা হয়ে গিয়েছিল।

উসমানীয় সাম্রাজ্যের একতা প্রসার

সুলতান আবদুল হামিদ অবশ্য আলাদা পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি শাসনভার গ্রহণ করার আগে এবং সেই সময় সাম্রাজ্যের আয়তন হ্রাস পাওয়ার ফলে, সাম্রাজ্যে তখন শুধুমাত্র মুসলিমদেরই বাস ছিল। অতীতে সাম্রাজ্যে শুধু মুসলমানদের বাস ছিল না, এমনকী সাম্রাজ্যের বেশ কিছু জায়গায় ৮০% জনগণই ছিল খ্রিস্টান। সুতরাং, আবদুল হামিদ ইসলামকেই উসমানীয় সাম্রাজ্যের মুসলমান প্রজাদের মধ্যে একতা বৃদ্ধির আদর্শ হিসাবে প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

ইসলামের ছত্রছায়ায় সকলকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য, তিনি প্রতি বছর পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনায় যাওয়ার উপরে জোর দেন, এই পবিত্র স্থানগুলিতে হাসপাতাল, ব্যারাক এবং পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজে মনোনিবেশ করেন, যাতে সকলে এই পবিত্র শহরে যেতে পারেন তার জন্য সাহায্য প্রদান করার পাশাপাশি, এই এলাকাকে বন্যার কবল থেকে মুক্ত করার চেষ্টাও করেছিলেন।

আবদুল হামিদ মনে করতেন যে, অটোমান সাম্রাজ্যের বাইরে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন আফ্রিকা ও এশিয়ায় বসবাসকারী মুসলমানদের সাহায্য করা তাঁর পবিত্র কর্তব্য। জাঞ্জিবারের মতো মুসলিম রাষ্ট্রে উপহারের মাধ্যমে প্রতিনিধিদের প্রেরণ করা হয়েছিল, যাতে তাঁরা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে খলিফাকে তাদের রক্ষাকারী হিসাবে স্বীকৃতি জানায়। একইভাবে, একই উদ্দেশ্যে রাশিয়া এবং চীনে বসবাসকারী মুসলমানদের জন্যও প্রতিনিধিদল প্রেরণ করা হয়েছিল।

আবদুল হামিদের ক্ষমতাচ্যুতি

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইওরোপীয় ইহুদিদের মধ্যে জিওনিস্ট আন্দোলন শুরু হয়েছিল। মজার বিষয় হল, কোনও মুসলিম দেশে নয় বরং এই আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল ইউরোপে। ইউরোপীয়দের নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য, তাঁরা আশ্রয় খুঁজেছিল মুসলিমপ্রধান দেশগুলিতে। অসংখ্য ধনী ও রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন ইহুদি পরিবার দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ফলে জিওনিজম ক্রমশ একটি শক্তিশালী আদর্শে পরিণত হয়েছিল। এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা থিওডোর হার্জল ব্যক্তিগতভাবে দ্বিতীয় আবদুল হামিদের কাছে প্যালেস্তাইনে জিওনিস্টদের বসতি স্থাপনের জন্য অনুমতি চেয়েছিলেন এবং তার পরিবর্তে ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ড সোনা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হামিদ এই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন।

শেষ অবধি ১৯০৯ সালে তরুণ তুর্কী নামের একটি দল আবদুল হামিদকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরা ছিল ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, আবদুল হামিদ ইসলামের প্রভাব বাড়ানোর যে নীতি গ্রহণ করেছিলেন, এরা তার বিরোধিতা করেছিল। তরুণ তুর্কীরা অটোমান সাম্রাজ্যের মন্ত্রীস্থানীয় পদগুলির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল, এবং পরবর্তী তিন খলিফাকে কার্যত পুতুলে পরিণত করেছিল। পরবর্তী কালে অবশ্য তাঁরা খলিফা পদ বিলুপ্ত করে দিয়ে তুরস্কে নতুন সরকার গঠন করেছিল।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন

পশ্চিমী শিক্ষার দ্বারা প্রভাবিত তরুণ তুর্কী আন্দোলনকে পূর্ববর্তী শতাব্দীর শেষদিকে মূলধারার ইসলামকে মোকাবিলা করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এর স্বপক্ষে আধুনিক উদাহরণ আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয়, উভয় ক্ষেত্রেই পাওয়া যাবে। গত বছরের জানুয়ারিতে, আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসি একটি জোরালো বক্তব্য পেশ করে বলেছিলেন যে, ইসলামকে যেভাবে বোঝা হয় তার সংস্কার প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গে ইজরায়েলের একটি সংবাদ ওয়েবসাইট মতেপ্রকাশ করেছিল, “এই দাবির মূল লক্ষ্য হচ্ছে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার চরমপন্থী ধারণাকে ইন্ধন দেওয়া যা আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের মতো গোষ্ঠীগুলিকে চালনা করে।”

এই ধরনের বিবৃতির সমস্যা দুই রকম। প্রথমটি হল, এই ধরনের বক্তব্য জারি করার মাধ্যমে সিসি কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন যে, এই অস্পষ্ট উৎস থেকে অর্থ পাওয়া এই সংস্থাগুলি ঐতিহ্যবাহী ইসলামের ফলস্বরূপ তৈরি হয়েছে এবং এর সাথে বিশ্বের সমস্ত স্বনামধন্য ইসলামী পণ্ডিতদের সরাসরি বিরোধ রয়েছে। দ্বিতীয় সমস্যাটি হল, এর দ্বারা এমন ধারণা তুলে ধরা হয়েছে যে একটি ধর্মনিরপেক্ষতা মেনে নেওয়াই হল জাতীয় দ্বন্দ্ব এবং অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের একটি বিশ্বাসযোগ্য সমাধান।

বাস্তব হল, ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাব গ্রহণের ফলে মুসলিম সমাজের কোনও উন্নতিই হয়নি। তুরস্কের ইতিহাসের আতাতুর্ক অদ্যায় অত্যন্ত প্রশংসিত, কিন্তু এই কথা কোথাও উল্লেখ করা হয় না যে, সেই সময় অর্থনৈতিক ভাবে উঁচু শ্রেণি এবং দেশের অভ্যন্তরে বিদেশীর বিনিয়োগকারীদের নিয়ন্ত্রণ কতটা বেড়ে গিয়েছিল। মূল বিষয়টি হল, ঐতিহ্যবাহী মুসলমান শাসনের অধীনেই সর্বদা আর্থসামাজিক উন্নয়ন হয়েছে। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেমন- আব্বাসীয় খিলাফত থেকে শুরু করে আন্দালুসীয় কর্ডোবা এবং অটোমান সাম্রাজ্য।