ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজনীয়তা

159706668 © Ilkin Guliyev | Dreamstime.com
159706668 © Ilkin Guliyev | Dreamstime.com

ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী ব্যক্তির মনে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণে লাগাতর ধ্যানমগ্নতাই হলো আধ্যাত্মিকতা। আরবী ভাষায় মনের এরূপ অবস্থাকে বলা হয় যিকির। যিকিরের মাঝেই আত্মার পুষ্টি। পশুর জীবনে যিকির থাকে না বলেই সে পশু। মানুষ পশু বা তার চেয়েও নীচু পর্যায়ে পৌঁছে যায় যদি তার মাঝে যিকির ও ফিকির না থাকে। এখানে ফিকিরের অর্থ হলো গভীর চিন্তাশীলতা। আরবীতে এরূপ চিন্তাশীলতা বলা হয় তাফাক্কু, তাওয়াক্কুল ও তাদাব্বুর। নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম চিন্তাশীলতাকে উচ্চমানের ইবাদত বলেছেন।

আধ্যাত্মিক বিপ্লবের অর্থ মানব মনে মহান আল্লাহ তা’আলার যিকির ও ফিকিরে বিশাল প্লাবন আনা। সে যিকির ও ফিকির তখন ব্যক্তির মনে সীমিত থাকে না,বরং কূল উপচানো জোয়ারের ন্যায় তা নেমে আসে ব্যক্তির কথা, কর্ম, লিখনি, আচরণ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যুদ্ধবিগ্রহে। ব্যক্তির চেতনারাজ্যের এ বিশাল বিপ্লব তখন মহাবিপ্লব আনে পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে। তখন পাল্টে যায় দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি,রাজনীতি ও মূল্যবোধ। তখন নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে তো সেটিই হয়েছিল। মানব ইতিহাসে এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব। এ বিপ্লবটি ছিল বস্তুত মানব শিশুকে মানবতাসম্পন্ন প্রকৃত মানব রূপে গড়ে তোলার। ফলে এ বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার বিপদটি বিশাল। তখন মানব শিশুর পক্ষে মানব রূপে বেড়ে উঠাটি ব্যহত হয়। তখন সভ্যতার বদলে বাড়ে অসভ্যতা। শান্তির বদলে বাড়ে অশান্তি।

আল্লাহ তা’আলা চান তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ জৈবিক বা দৈহিক পরিচয়ের বাইরেও প্রবল এক নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বল নিয়ে বেড়ে উঠুক। দৈহিক বলে মানুষ থেকে অনেক পশু বহুগুণ শক্তিশালী। অনেক প্রাণী মানুষের চেয়ে বেশী দিন বাঁচে। মানুষের প্রকৃত গৌরব ও চ্যালেঞ্জ বাঘ-ভালুকের ন্যায় শক্তি নিয়ে বাঁচাতে নয়, কচ্ছপের ন্যায় দীর্ঘ কাল বাঁচাতেও নয়। বরং নৈতিক গুণ নিয়ে বাঁচায়। মানবের শ্রেষ্ঠত্ব উচ্চতর সভ্যতা নির্মানের লক্ষ্য নিয়ে বাঁচায়। মু’মিনের জীবনে সেটাই মূল মিশন। সে মিশন ভূলে মানব যখনই নিছক পানাহার ও আনন্দ-উল্লাস নিয়ে বাঁচায় ব্যস্ত হয়েছে তখনই পশু থেকে মানুষের পার্থক্যটিও বিলুপ্ত হয়েছে। এরূপ পশুবৎ মানুষটি মর্যাদা হারায় মহান আল্লাহর কাছেও। সমাজে এরূপ মানুষের সংখ্যা বাড়লে আল্লাহর রহমত না এসে তখন আযাব আসে।

তাই আধ্যাত্মিক বিপ্লব অপরিহার্য শুধু ওলি-আউলিয়া, পীর-দরবেশদের জন্য নয়, এটি অপরিহার্য প্রতিটি নারী-পুরুষ, বালক-বৃদ্ধের জন্যও। কারণ, আল্লাহ তা’আলার সাথে আত্মিক বন্ধনটি অর্জিত না হলে বান্দার মুসলিম বা ঈমানদার হওয়াটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শুধু মু’মিন হওয়ার জন্য নয়,মানব শিশুকে এমনকি মানব রূপে বেড়ে উঠার জন্যও সেটি অপরিহার্য। ব্যক্তির জীবনে এ বিপ্লবটি না এলে শুরু হয় লাগাতর নীচে নামা। নীচে নামা মানুষটি তখন বর্বরতা ও হিংস্রতায় হিংস্র পশুকেও হার মানায়।আজ অবধি দেশে দেশে রাজনৈতিক ও সামরিক বিপ্লব কম হয়নি। সে সব বিপ্লবে মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ানটি অতি বিশাল। কিন্তু তাতে শান্তি বাড়েনি, প্রতিষ্ঠা পায়নি মানবতাও। মানব জাতির ব্যর্থতাটি এক্ষেত্রে অতি বেদনাদায়ক।

পৃথিবী পৃষ্ঠে সবচেয়ে বড় বড় হিংস্র তান্ডবগুলি কোন বন্য পশুদের দ্বারা ঘটেনি। প্লাবন, ঘূর্ণিঝড়, সুনামী, মহামারি বা ভূমিকম্পও হয়নি। ভয়াবহ যুদ্ধ, বিশ্বযুদ্ধ, গণহত্যা, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের ন্যায় বীভৎস কান্ডগুলি ঘটেছে মানবতাশূণ্য বা আধ্যাত্মিকতাশূণ্য মানব-পশুদের হাতে। কম্যুনিস্টদের বিপ্লবে বহু লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে রাশিয়া ও চীনে। এবং ২০ লাখের বেশী মানুষ মারা গেছে ক্যাম্পুচিয়ায়। সাড়ে সাত কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে মাত্র দুটি বিশ্ব যুদ্ধে। অথচ ইতিহাস জুড়ে এরূপ ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের সংখ্যা এক-দুয়েক শত নয়,বরং বড় হাজার। তাছাড়া এরূপ মানব পশুদের পাপাচারের কারণে পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ভয়ানক আযাব নেমে আসার বিপদটিও বিশাল।

ইসলাম ও আধ্মাতিকতা

এ কারণে ইসলাম ধর্মের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুসঙ্গ আধ্যাত্মিকতা। শরীয়তের পরেই এর অবস্থান। এ জন্য ওলামায়ে কিরাম এটিকে সবসময় তাগাদার দৃষ্টিতে দেখেছেন। এর অপর নাম তাসাউফ কিংবা সুফিবাদ এবং কোথাও কোথাও যুহুদও বলা হয়ে থাকে। যুগের আবর্তনে বিভিন্ন নামে এটি পরিচিত হলেও নববী যুগে তা ‘তাযকিয়া’ হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল।

তাযকিয়া শব্দের অর্থ আত্মার পরিশুদ্ধি। পাপ প্রবণ আত্মাকে পরিশোধন করে প্রশান্ত হৃদয়ে পরিণত করতেই এই প্রচেষ্টা। এটিই সৃষ্টি জগতের কাছে নবী প্রেরণেরও অন্যতম উদ্দেশ্য। যেসকল নফস বা আত্মার খোদার আনুগত্য থেকে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেগুলোকে ইবাদতে আকৃষ্ট ও প্রশান্ত হৃদয়ে পরিণত করাই আত্মার পরিশুদ্ধি।