ধর্মের প্রতি অগাধ আস্থার পাশাপাশি চাই সচেতন সিদ্ধান্ত

liane-metzler-B32qg6Ua34Y-unsplash
Fotoğraf: Liane Metzler-Unsplash

আপনি কি ঈশ্বরে আস্থা (Faith) রাখেন নাকি বিশ্বাস (Belief) করেন? বিশ্বাস একটা সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর থাকে এবং সেই সিদ্ধান্ত আসে একটি যুক্তিসম্পন্ন তর্ক ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে। কিন্তু আস্থা ঠিক বিশ্বাস নয়, এটা একটা আবেগপূর্ণ বিষয় যা বিশ্বাসের উচ্চস্তরে থাকে। অর্থাৎ আপনি কখনও আপনার আস্থাকে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে পারবেন না। এর কারণ আস্থা যৌক্তিকতার উপরে কাজ করে যাকে আধুনিক বিজ্ঞান ‘কাকতালীয়’ বলে ব্যাখ্যা করে।

যেমন ধরুন, আপনি মনে করেন আল্লাহ্ সবসময় আপনার সঙ্গে আছেন এবং তিনি আপনার ক্ষতি হতে দেবেন না, সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আপনার এই বিশ্বাসের যুক্তিসম্মত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবেন কি?

ঠিক এখানেই নাস্তিক আর ধার্মিকদের পার্থক্য। নাস্তিক কারা? যারা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে এবং প্রতিপক্ষ যেকোনো ধার্মিককে চ্যালেঞ্জ করে তার প্রমাণ  দিতে। নাস্তিকদের কাছে যুক্তির উপরে আর কিছু নেই, যে কোনো ঘটনা বা বস্তুর যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা উপস্থাপন না করা পর্যন্ত তারা জিনিসটাকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনা।

অন্যদিকে ধার্মিকরা মনে করে ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, তাঁর নির্দেশেই প্রতিটি সূক্ষাতিসূক্ষ ঘটনা ঘটে এবং তিনি চাইলেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন। এই ধারণা আসে ঈশ্বরের প্রতি আস্থা থেকে। আস্থা, যাকে Higher Level of Consciousness বলা হয়, সেখানে অনেক রকম অভাবনীয় ঘটনা ঘটে যা যুক্তিতর্ককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেয়।

তাহলে কারা ঠিক? এই তর্ক শাশ্বত। নাস্তিকদের মধ্যেও চরম জ্ঞানীগুণী পন্ডিতরা আছেন যারা পৃথিবীর সমস্ত ধর্মগ্রন্থকে বিশ্লেষণ করে নাকচ করে দিয়েছেন। আবার এমন অনেক ধার্মিক আছেন যারা আধ্যাত্মিক হওয়ার পাশাপাশি যুক্তি-তর্ক-বিজ্ঞান-দর্শনে অগাধ পান্ডিত্য থাকা স্বত্বেও ধর্মে আস্থা রাখেন।

আস্থা এমন একটি গভীর আবেগ যা যুক্তিতর্কের উপরে গিয়ে মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। ঠিক যেমন ভালোবাসা বা মায়ামমতার কোনো ব্যাখ্যা হয় না, অথচ মানুষ এর তাগিদে জীবনকেও তুচ্ছ করে দেয়। যখন আপনি মনে করবেন যে আল্লাহের প্রতি আপনার আস্থা আছে তখনই আপনি তাঁর কৃপাদৃষ্টির ইবাদত করতে পারবেন।

আবার কিছু ক্ষেত্রে ধার্মিকদের মধ্যেও পার্থক্য দেখা যায়। কেউ ধার্মিক হলেই যে আস্থাভাজন হবে সেরকম নয়, হতেই পারে সে ভিন্নমত পোষণ করে একজন আস্থাভাজনকারীর থেকে। তার মানে সে অবিশ্বাসী নয়, দুজন ব্যক্তিই বিশ্বাসী কিন্তু যার বিশ্বাসের সাথে আবেগের সমন্বয় ঘটেছে সে আস্থা খুঁজে পেয়েছে, অপরজন যে শুধু বিশ্বাসী তার কাছে এত উচ্চপর্যায়ের অনুভূতি তৈরি হয়নি।

তবে হ্যাঁ ঈশ্বরে আস্থার জন্য চাই সম্যক ধারণা এবং গভীর জ্ঞান। আপনার জীবন যাঁর ঈবাদত করে কাটাতে চান তাঁকে ভালোভাবে জানতে হবে, পড়াশোনা করতে হবে, আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে হবে। পরিষ্কার ধারণা (হতেই পারে তা আপনার ব্যক্তিগত অথবা অন্যদের থেকে আলাদা) থাকলে তবেই আল্লাহের প্রতি আস্থা খুঁছে পাবেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি আস্থা এবং যুক্তির একটি সুন্দর সহাবস্থান মানবজীবনকে সমৃদ্ধ করে তোলে। শুধুমাত্র যুক্তিতে বিশ্বাসীরা নিজেদের পরিসরকে ক্ষুদ্র করে তোলে, যতটুকু সে জানে ততটুকুই সে মানে, এর ফলে যান্ত্রিকতা তৈরি হয়। আবার গভীর আস্থা অন্ধত্ব বা গোঁড়ামি নিয়ে আসতে পারে যা সমাজের জন্য সমূহ ক্ষতিকর।

এখন আপনিই ঠিক করুন আপনার ধার্মিক হওয়ার কারণ কি আস্থা নাকি সিদ্ধান্ত।