ধার্মিক হোন, গোঁড়া নয়

Peristiwa solat © Leo Lintang | Dreamstime.com

একদিন একদল লোক মুহাম্মদ (সা:)-কে উপহাস করে আস্সালামো-আলায়কুম (আল্লাহ আপনার রক্ষা করুন) না বলে আসসামো-আলায়কুম (আপনার মৃত্যু আসুক) বলে। এই রকম কটুবাক্যের জন্য আইশা (রা:) রাগান্বিত হয়ে ওই ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য চিৎকার করতে শুরু করেন। এই সময় মুহাম্মদ (সা:) তাঁর স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন “আইশা শান্ত হও, প্রতিটা সুন্দর জিনিস তার সৌন্দর্য্যের জন্য খ্যাত আর প্রতিটি দৃষ্টিকটু, বাজে জিনিসের উৎস নোংরা থেকেই।”

মহানবী এই কথাগুলোই তাঁর প্রিয় স্ত্রীকে বলেন এবং এই কথাগুলোই বলেছেন জগতের উদ্দেশ্যে। মুহাম্মদ (সা:) ছিলেন শান্তির প্রতীক, তাঁর মহাসাগরের সমান গভীর হৃদয়ে প্রত্যেকের জন্যই সমান জায়গা ছিল। মা আইশার রাগান্বিত হৃদয়েও ক্ষোভ বা আক্রোশ ছিল না, তিনি শুধুই তাঁর স্বামীর অপমানের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন।

কিন্তু আজকের দিনে একটা দৃশ্য খুবই সাধারণ যেখানে ইমানদার মুসলমান শুধুমাত্র মতপার্থক্য বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সম্মুখীন হলেই একে অপরকে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপমান করতেও পিছপা হন না। গোঁড়া এবং অন্ধ ধর্মীয় শিক্ষা মানুষের অন্তরকে কলুসিত করে দিতে পারে, আমরা নিজেরাই দেখেছি এরকম অনেক মানুষকে যারা ইসলাম চর্চা শুরু করার পর চারিত্রিকভাবে কর্কশ হয়ে গেছেন, একে অপরের খুঁত ধরছেন। কিন্তু ইসলাম শেখায় না অপরকে ঘৃণা করতে, ইসলাম বলে না ভেদভাব করতে।

এই ধরনের মানুষরা যুক্তি দেয় যে তারা আল্লাহের পথে ইসলামকে রক্ষা করছেন, পাপী-নাপাক দুশ্চরিত্রদের থেকে। কিন্তু কে ঠিক করবে কে পাপী? সে কাজটা কার?

আর এর বিচার-বিশ্লেষণ করে কারা? যারা সরাসরি আল্লাহতাআলা ও মহান নবীর (সা:) কথার বিরুদ্ধে যায়। আমাদের সার্বিক যে সমস্যা- দারিদ্র, ঘরোয়া অশান্তি, ঘরছাড়া মানুষ, এদের কথা না ভেবে, এই সমস্যার সমাধান না করে, তারা দেখে কার পোশাক পায়ের গাঁটের উপরে আছে না নীচে, দাড়ি কার কতবড় বা কী রঙের। এই ধরনের গৌণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করে এবং নিজেকে বড় আলেম হিসেবে প্রমাণ করে লাভ কিছু হয় না। ইসলামের মূল কথা হলো- মহান আল্লাহতায়ালা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো শক্তিমান নেই। তাহলে কেন আমরা নিজেদেরকে জাহির করার চেষ্টা করছি!

এর সমাধান হিসেবে বলা যেতে পারে আল্লাহের প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পণ। আমাদের এই পবিত্র ধর্ম আমাদের আত্মভরীতা বা অহঙ্কারের থেকে অনেক উপরে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন ইবাদত করতে, নিজেদের ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব করতে নয়। যখন আমরা বলি আল্লাহুআকবর তখন বলা হয় ঈশ্বর সবচেয়ে মহান। অর্থাৎ মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের অহঙ্কার, আত্মভরিতা, আত্মমগ্নতা, হিংসা, বিদ্বেষ সমস্ত কিছুর থেকে শতশত গুণ উঁচু। সমস্ত কিছুই তাঁর ঈশারায় চলে, তিনিই ঠিক করেন মানবজীবনের গতিপ্রকৃতি। তাই এই ব্যক্তিগত ক্লেশ বা বিদ্বেষ শুধু অর্থহীনই নয় শিশুসুলভও।

অহংবোধের পথে গিয়ে যখন কেউ আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নিজেদের ইচ্ছের দাসত্ব করতে শুরু করে তখন সে নিজেকে ভুল বুঝিয়ে একটা মানসিকতা তৈরি করে নেয় যেখানে সে নিজেকে সঠিক বলে প্রমাণ করতে পারবে। এই পথে হাঁটলে তার ধর্মীয় বিশ্বাস অন্য পথে চলতে শুরু করে- যে পথে সে আল্লাহর অপার করুণা, অসামান্য জ্ঞান এবং অসীম মমতাকে নস্যাৎ করে দিয়ে নিজেকে ভালোবাসতে শুরু করে।

যখনই কেউ আত্মপ্রেমে মগ্ন হয় তখন সে শুধু আল্লাহকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে না, এ পৃথিবীর সমস্ত কিছুর থেকে নিজেকে বড় মনে করে। নিজের জ্ঞান, নিজের মতামত, নিজের বিশ্বাসকেই এরা প্রাধান্য দেয় তবে প্রকাশ্যে খুব সাধারণ হওয়ার ভান করে।

যখনই কোনো ধর্ম ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যায় তখনই সেটা আর ধর্ম থাকে না, একটা নিকৃষ্ট কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির খেলা হয়ে যায়। সেখানে শুধু সমালোচনা হয় কিছু অহঙ্কারী অবিশ্বাসীর। আমাদের সব অবস্থাতেই মাথায় রাখতে হবে যে আল্লাহই সর্বশক্তিমান এবং আমরা তাঁর ইবাদতকারী বান্দা মাত্র।