নবজাতকের কান পরীক্ষা, কীভাবে বুঝবেন শিশু বধির?

স্বাস্থ্য Contributor
মতামত
শিশু বধির
© Aquamila | Dreamstime.com

কানে কম শোনা বা বধিরতার সমস্যা আমাদের জীবনের অন্যতম বড় সমস্যা। আপনার শিশু বধির? সাধারণভাবে এই সমস্যা শৈশবে খুব কমই হয়ে থাকে। বয়স যত বাড়তে থাকে, ততই কানে শোনার সমস্যা দেখা যায়। আমেরিকার এক সমীক্ষার হিসেবে, সে দেশে প্রতিবছর ১০০০ জনে তিনজন শিশু জন্ম থেকেই বধিরতার সমস্যা জন্মায়। ২০১২ সালে ‘হু’ (ওয়র্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন)-এর করা এক সমীক্ষা অনুযায়ী, সারা বিশ্বের প্রায় ৩৬ কোটি মানুষ বধিরতার সমস্যায় ভোগেন। যা পৃথিবীর জনসংখ্যার ৫.৩%। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৩.২ কোটি শিশু। সাধারণভাবে দক্ষিণ এশিয়া, এশিয়া প্যাসিফিক এবং সাহারান আফ্রিকার শিশুদের এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।

শিশুদের বধিরতা

সাধারণভাবে ০-১৪ বছর বয়স্ক শিশুর যদি ৩০ ডেসিবেল বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার শব্দ শোনার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা যায়, তাহলে সেই শিশুকে বধির বলা চলে। এই বধিরতা জন্মের পরেই যেমন হতে পারে, তেমনই জন্মাবার কিছুদিনের মধ্যেও হতে পারে।

শিশু বধির বা নবজাতকের বধিরতা কেন হয়?

জন্মাবার পরে শিশুর নানারকম ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকে, যার মধ্যে অন্যতম হল কানের ইনফেকশন। জন্মের পরে কান ও নাক সংযোগকারী ইউস্টেশিয়ান টিউব অনেকসময় পুরোপুরি গঠিত হয় না। ফলে তরলপদার্থ কানের পরদার পিছনে জমা হতে থাকে। এবং ইনফেকশনের সৃষ্টি করে। একে ওটিটিস মিডিয়া বলে। এই তরল কানের পরদার পিছনে জমতে থাকলে তা শ্রবণক্ষমতাকে সাময়িকভাবে নষ্ট করে দেয়। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়েই ব্যথা হয় না। ফলে শিশুকে সেভাবে কাঁদেও না, তাই এই ইনফেকশন বুঝতে-বুঝতেই সময় চলে যায়। তাড়াতাড়ি বুঝতে না পারলে ওটিটিস মিডিয়া কিন্তু আপনার সন্তানকে সারাজীবনের মতো বধির করে দিতে পারে।

জিনগত কারণে জন্মানোর পর থেকেই নবজাতকের কানে শোনার সমস্যা হতে পারে। গর্ভাবস্থায় থাকাকালীন কোনও সমস্যা থাকলে বা মায়ের ডায়াবেটিসের মতো রোগ থাকলেও শিশু বধির বা নবজাতকের বধিরতার সম্ভাবনা তৈরি হয়। জন্মের সময় জটিলতা থাকলে এবং প্রিম্যাচিয়োর বাচ্চার ক্ষেত্রেও এই বিপদ থেকে থাকে।

এছাড়া জন্মানোর পরে আপনার সন্তান মেনিনজাইটিস, হাম, চিকেনপক্স, এনসেফালাইটিসের মতো রোগে আক্রান্ত হলে কানে শোনার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। আচমকা খুব জোরে আওয়াজ, মাথায় আঘাত এবং কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ খেলেও বাচ্চার বধিরতা দেখা যায়।

কীভাবে বুঝবেন আপনার শিশু বধির?

শিশু কথা বলতে পারে না, তার মনের ভাব প্রকাশের ভঙ্গিমাও আমরা অনেকসময় বুঝতে পারি না। ফলে তার কোনওরকম সমস্যা হচ্ছে কিনা, বা ব্যথা হচ্ছে কিনা, সেসব বোঝার জন্য মা-বাবাকে সবসময় সতর্ক থাকা উচিত। জন্মের পর সে যখন আশপাশ সম্পর্কে আবছা ধারণা করতে শুরু করে, তখন থেকেই বাইরের পরিবেশ সম্পর্কে তার অসীম কৌতূহল থাকে। জন্মের পর থেকে শুরু করে মোটামুটি মাসতিনেক বয়স পর্যন্ত গলার আওয়াজ বা কোনও

আওয়াজ শুনলে শিশু চমকে ওঠে, বাবা-মায়ের গলার আওয়াজ শুনে বুঝতে শেখে এবং তার সঙ্গে কেউ কথা বললে হাসে। চার থেকে ছ’মাস বয়সের মধ্যে সে গলার আওয়াজ বা কোনও শব্দ শুনলে সেদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। খেলনার আওয়াজ শুনে বুঝতে পারে। মোটামুটি সাত মাস থেকে একবছর বয়সে শিশু কিছু সাধারণ শব্দের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে এবং ‘মা’, ‘বাবা’-র মতো সহজ শব্দ বলতেও পারে। শিশু বধির হলে এরকম প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে না ।

কানে শোনা ও কথা বলা

যদি দেখেন আপনার সন্তান জোরে কোনও আওয়াজ শুনলে বা তার দিকে তাকিয়ে কথা বললেও কোনও প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে না বা কোনদিক থেকে আওয়াজ আসছে, ঘাড় ঘুরিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে না, তাহলে বুঝবেন শিশু বধির  বা তার কানে কোনও সমস্যা থেকে থাকতে পারে। হঠাৎ ব্যবহার বদলে যাওয়া, অসহিষ্ণু হয়ে ওঠা কখনও-কখনও বধিরতাকে ইঙ্গিত করে। এসময় শব্দ শুনে গলা দিয়ে নানারকম আওয়াজ করাও সে থামিয়ে দিতে পারে। শিশু সাধারণভাবে ছোট থেকে শব্দ শুনে সেগুলিকে নকল করে কথা বলতে শেখে। কানে শোনার সমস্যা থাকলে দেখবেন, বয়স বাড়ালেও সে কথা বলতে শিখছে না।

আপনার শিশু যদি কথা বলতে পারে, তাহলে তার কথা বলার ক্ষেত্রে দেরি দেখতে পারেন, কথার উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার দেরি হতে পারে। বাচ্চার কানে শোনার সমস্যা হলে কথা বলার ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়। সে জড়িয়ে কথা বলতে শুরু করে। বধিরতার সমস্যা থাকলে তাকে ডাকলে সেই ডাকে সে সাড়া নাও দিতে পারে। আর একটু বড় বয়সের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মনোনিবেশে সমস্যা, ক্লান্তি দেখা যায়। পড়াশোনার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। বারবার সে ‘কী’ ‘কী’ বলতে থাকে এবং টিভি দেখার সময় টিভির আওয়াজ বারবার বাড়িয়ে দিতে বলতে পারে।

এই বধিরতা যদি কানের কোনও ইনফেকশন, ওটিটিস মিডিয়া থেকে দেখা যায়, তাহলে দেখবেন আপনার শিশু ঘনঘন তার কান টানছে বা কান ঘষছে। কানে শোনার সমস্যার সঙ্গে-সঙ্গে ক্লান্তি, বিরক্তি, জ্বর, কানে ব্যথা ইত্যাদিও এক্ষেত্রে দেখা যায়।

কী করবেন

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় নবজাতকের জন্মের পরে তার নানারকম পরীক্ষা করা হয়। ফলে কানে শোনার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা থেকে থাকলে তখনই তা ধরা পড়ে যায়। যদি আপনার নবজাতকের ক্ষেত্রে এরকম কোনও পরীক্ষা না হয়ে থাকে, তাহলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। মোটামুটি জন্মের তিন সপ্তাহের মধ্যেই শিশুর হিয়ারিং স্ক্রিনিং করে ফেলা জরুরি। জন্মের সময় থেকে শিশুর শোনার ক্ষেত্রে সমস্যা থেকে থাকলে তা যদি সাধারণভাবে ৬ মাস বয়সের মধ্যে ধরা পড়ে এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়, তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা সারিয়ে তোলা সম্ভব হয়। মনে রাখবেন, শিশুর বিকাশ ঠিক হচ্ছে কিনা, তা দেখার দায়িত্ব কিন্তু তার আম্মি-আব্বুরই।

ফলে আপনার নবজাতকের দিকে বিশেষ নজর দিন। তার প্রতিটি আচরণ ভাল করে খেয়াল করুন। তার সঙ্গে কথা বলুন, তাকে সময় দিন। দেখুন আপনার কথায় বা আদরে সে কীভাবে সাড়া দিচ্ছে। সামান্যতম কোনও অসঙ্গতি বুঝলে সঙ্গে-সঙ্গে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। ওটিটিস মিডিয়ার মতো কানের ইনফেকশন কিন্তু অনেকসময়েই বাইরে থেকে বোঝা যায় না, এবং ব্যথা না থাকার কারণে শিশুর আচরণ বা কান্না থেকেও বোঝা যায় না। এক্ষেত্রে চিকিৎসায় দেরি হলে শিশু আজীবনের মতো বধির হয়ে যেতে পারে! ফলে এইধরনের ইনফেকশনের ক্ষেত্রে বিশেষ যত্নবান হন। এছাড়া শিশুর জ্বর, মেনিনজাইটিস, হাম,

চিকেনপক্স হলে বা সে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেলে ডাক্তার দেখান। মনে রাখবেন, নিয়ম করে প্রতিমাসে কান পরীক্ষা করা নবজাতকের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।