নবজাতক শিশুকে স্বাগতম জানানোর পদ্ধতি

111241178 © Olga Gorchichko | Dreamstime.com

ইসলামে পিতামাতার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফরজ দায়িত্ব হল সন্তানদেরকে ভালোবাসা এবং সঠিকভাবে তাদেরকে লালনপালন করা। পূর্বের ২টি পর্বে আমরা সন্তান জন্মের পূর্বে পিতামাতার কি দায়িত্ব তা নিয়ে আলোচনা করেছি। এই পর্বে আমরা শিশুর জন্মের পর পিতামাতার দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা করব। 

একজন মুসলিমের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সকল কাজ কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক পরিচালিত হওয়া ঈমানের একান্ত দাবি। সে আলোকে একজন শিশুর জন্মের পর থেকেই কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক জীবন পরিচালনা করা একান্ত জরুরি। আর এ দায়িত্বটি শিশুর অভিভাবককেই পালন করতে হবে।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসংখ্য হাদিসে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর অভিভাবকদের করণীয় সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। সেগুলি সম্পর্কে নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলঃ

-সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে সর্বপ্রথম আল্লাহর প্রশংসা করা এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা এবং সন্তানের জন্য কল্যাণের দু’আ করা যেমটি হযরত ইবরাহিম(আঃ) করেছিলেন-
‘‘সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বৃদ্ধ বয়সে আমাকে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব দু’আ শ্রবণকারী। হে আমার রব, আমাকে সালাত কায়েমকারী বানান এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও। হে আমার রব, আর আমার দু‘আকে কবূল করুন।” (আল কুরআন-১৪:৩৯-৪০)

-সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে এর পরের কাজ হল নবজাতক শিশুর ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দেওয়া।

হজরত আবু রাফে(রাযিঃ) বলেন, “ফাতিমা(রাযিঃ) এর ঘরে হাসান(রাযিঃ) ভূমিষ্ঠ হলে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে তার কানে আজান দিতে দেখেছি।”

-সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রথম দিন বা সপ্তম দিন নবজাতক শিশুর সুন্দর, অর্থবোধক নাম রাখা সুন্নাত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নিজ নামে ও তোমাদের বাপ-দাদার নামে আহ্বান করা হবে, অতএব তোমরা তোমাদের সন্তানদের সুন্দর দেখে নাম রাখো।”

-নবজাতক শিশুর বয়স সাত দিন হলে আকিকা দেওয়া সুন্নাত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “প্রত্যেক সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে আকিকা করো, তার চুল মুণ্ডন করো এবং সুন্দর দেখে তার নাম রাখো।”

যদি কেউ সপ্তম দিনে পর আকিকা দিতে না পারে তবে সামর্থ্য অনুযায়ী পরে তা আদায় করে দিলেও হবে।

-নবজাতকের জন্মের সপ্তম দিন মাথা মুণ্ডন করে চুলের ওজন পরিমাণ রূপা বা সমপরিমাণ অর্থ দান করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সপ্তম দিন হাসান(রাযিঃ) ও হুসাইন(রাযিঃ) এর চুল কাটার নির্দেশ দেন এবং চুলের ওজন পরিমাণ রূপা সদকা করেন।

অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান(রাযিঃ) এর পক্ষ থেকে একটি বকরি আকিকা করেছেন এবং বলেছেন, “হে ফাতিমা, তার মাথা মুণ্ডন করো ও তার চুলের ওজন পরিমাণ রৌপ্য সদকা করো।”

-তাহনিক করা অর্থাৎ নবজাতক শিশুর মুখে খেঁজুর চিবিয়ে দেওয়া। ইমাম নববি(রহঃ) বলেছেন, সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে খেজুর দিয়ে তাহনিক করা সুন্নাত।

হযরত আনাস(রাযিঃ) বলেন, “আব্দুল্লাহ ইবনে আবু তালহা(রাযিঃ) ভূমিষ্ঠ হলে আমি তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি বললেন, তোমার কাছে কি খেজুর আছে? আমি বললাম, জ্বি হ্যাঁ। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম খেজুর চিবালেন, অতঃপর তা বের করে বাচ্চার মুখে দিলেন। বাচ্চাটি জিব্বা দিয়ে চুষে চুষে ও ঠোঁটে লেগে থাকা অংশ চেটে খেতে লাগল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দৃশ্য দেখে বললেন, দেখো! আনসারদের খেজুর কত প্রিয়!”

-নবজাতকের শিশু জন্মের ৭ দিন থেকে শুরু করে ৩ বছরের মধ্যে খৎনা করা উত্তম। আর ৭ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই খৎনা করে নেয়া ভালো। তবে সাবালক হওয়ার পূর্বে খৎনা করা জরুরি।

মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেক অভিভাবকের জন্য হাদিসের আলোকে নবজাতকের উল্লেখিত কাজগুলো যথাযথভাবে পালন করা জরুরি।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে উল্লেখিত কাজগুলো নিজেদের সন্তানের জন্য পালন করার তৌফিক দান করুন। কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে এ বিষয়গুলোর প্রতি যথাযথ আমল করার কোনো বিকল্প নেই।

পরিবার এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে নবজাতক শিশুকে স্বাগত জানানো যেন একটি উদযাপনের মত; শিশুদের প্রতি সম্পাদিত অধিকার এবং আচারগুলি ঈমানদেরকে এটা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ইসলামে শিশুদের অধিকারও প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। পিতা-মাতা জীবিত বা মৃত, উপস্থিত বা অনুপস্থিত, জ্ঞাত বা অজানা প্রত্যেকের অধিকারই ইসলামে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। তাই আমাদের উচিত প্রত্যেকের অধিকারগুলো জেনে তা যথাযথভাবে আদায় করা।